‘মিস্টার রাইটার—’ গর্জন করে উঠল ইন্সপেক্টর যাদব।
তার মুখ অপমানে লাল হয়ে গেছে। ক্রুদ্ধ ভঙ্গিতে চোখ ছোট করে সে কিছু একটা বলতে শুরু করেছিল, কিন্তু তাকে সময়মতো বাধা দিয়েছেন এসিজি।
‘রঘুপতি, তুমি কি আমাকে একটু শান্তিতে কথা বলতে দেবে না! প্লিজ, একটু চুপ করে থাকো—।’
রঘুপতি যাদব নিজেকে সামলে নিল।
ভাস্কর রাহা চুরুটে টান দিয়ে সামান্য শব্দ করে হাসলেন। হাতের চুরুটের দিকে নজর রেখেই স্পষ্ট স্বরে বললেন, ‘মিস্টার গুপ্ত গত বিশ-পঁচিশ বছরে এই ক্রাইম ফিকশন লেখালিখি নিয়ে অনেক লড়াই আমরা দেখেছি। আমরা বলতে, আমি, উৎপলেন্দু সেন, রূপেন মজুমদার, আর মিসেস মুখার্জি তো বটেই—’ ওঁদের তিনজনের দিকে ইশারা করে দেখালেন রাহা। মুখ তুলে আবার হাসলেন, বললেন, ‘কারও চোখ রাঙানিতে আমরা ভয় পাই না। তা সে সম্পাদকই হোক, প্রকাশকই হোক, কিংবা—’ রঘুপতি যাদবের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে : ‘পেটি কোনও পুলিশ অফিসারই হোক।’
রঘুপতি একটা চাপা উত্তেজনায় কাঁপছিল, কিন্তু সে চেতনা হারায়নি। কারণ সে জানে, সেরকম বেচাল কিছু করে ফেললেই পরদিন সেটা খবরের কাগজের নিউজ হবে। বিশেষ করে যেখানে ভাস্কর রাহা আর রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় হাজির রয়েছেন।
এসিজি প্রত্যেকের মুখের দিকে একবার করে তাকিয়ে বললেন, ‘আপনি ঠিক সময়েই প্রস্তাব দিয়েছেন, ভাস্করবাবু। কারণ আমরা মিস মানির ঘরে এখন একবার যাব। আপনি সঙ্গে এলে আমার বা রঘুপতির কোনও আপত্তিই নেই। ইউ আর মোস্ট ওয়েলকাম—’ হাসলেন এসিজি।
রঘুপতি যাদব তখন মনে-মনে ঈশ্বরকে ডাকছিল। স্যার যদি এই পাকাচুল রাইটারটাকে শেষ পর্যন্ত খুনি বলে ঠাওরান তা হলে দারুণ হবে। ওই যে সহবত-টহবত কী সব বলল, সেগুলো ওকে হাড়ে-হাড়ে শিখিয়ে দেওয়া যাবে।
‘চলুন, তাহলে আমরা ওপরে যাই—’ রঘুপতির হাত ধরে টান মারলেন অশোকচন্দ্র : ‘চলো, রঘুপতি—।’
‘আ-আমি সঙ্গে গেলে কি কোনও অসুবিধে হবে?’ ইতস্তত করে এই অনুরোধটি পেশ করেছেন রত্নাবলী। চশমার কাচের পিছনে ওঁর চোখ সামান্য ফোলা। নীল সরু পাড়, বুটির কাজ করা, একটা সাদা টাঙ্গাইল শাড়িতে ওঁকে প্রশান্ত দেখাচ্ছে। দেবারতির ব্যাপারটার জন্য আজ যে বাড়িতে যেতে পারবেন না সে-কথা স্বামীকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছেন। দেবারতি মেয়েটা বেশ হাসিখুশি ছিল। তা ছাড়া তাঁর লেখার ভক্ত ছিল। অকারণে একজন ভক্ত পাঠক কোন লেখক হারাতে চায়!
অশোকচন্দ্র গুপ্ত চলার পথে থমকে দাঁড়িয়েছেন। ফিরে তাকিয়ে বলেছেন, ‘আসুন না, আপনারা সবাই আসুন। রঘুপতিদের ফোরেনসিক ডিপার্টমেন্ট আর ক্যামেরাম্যানরা কাল রাতেই তাদের সব কাজ সেরে ফেলেছে। এখন আর কোনও সূত্র খোওয়া যাওয়ার ভয় নেই।’
অতএব অশোকচন্দ্র এবং রঘুপতিকে অনুসরণ করে রওনা হলেন চারজন অভিজ্ঞ লেখক। এই প্রথম ওঁরা সরাসরি কোনও তদন্তে জড়িয়ে পড়েছেন।
ওঁরা ছ’-জন চলে যেতেই ভাস্কর রাহার ঘর খালি। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবলটিকে রঘুপতি ঘরের বাইরে পাহারা দেবার জন্য নির্দেশ দিল। তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে বাঁক নিয়ে সোজা সিঁড়ির দিকে।
ওপরে রওনা হওয়ার আগে ল্যান্ডিং-এর বারান্দা দিয়ে নীচের দিকে ঝুঁকে দেখলেন রূপেন মজুমদার। না, গত রাতের কোনও চিহ্নই চোখে পড়ছে না। ভাস্কর রাহার গাড়িটা নিয়ে যাওয়া হয়েছে থানায়। হয়তো শান বাঁধানো টেরাসে হুমড়ি খেয়ে আতসকাচ নিয়ে পরীক্ষা করলে তবেই খুঁজে পাওয়া যাবে এক তরুণীর শরীরের রক্তবিন্দুর সূক্ষ্ম চিহ্ন।
পাঁচতলায় ওঠার সিঁড়ির দিকে বাঁক নেবার সময় বাঁ দিকের খোলা বারান্দার দিকে তাকালেন ভাস্কর রাহা। সুন্দর ঝকঝকে সকাল। নীল আকাশে কোনও মলিনতা নেই। মনেই হয় না, গতকাল রাতে এই হোটেলেই ঘটে গেছে এক বিশ্রী মলিন ঘটনা।
সত্যি, দেবারতি মানি এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যেন গ্রহান্তরের বাসিন্দা হয়ে গেছে!
ছয়
তিনশো আট নম্বর ঘরে ঢুকতেই এক অশরীরী অনুভূতির তরঙ্গ যেন ঝাঁকুনি দিল ভাস্কর রাহাকে।
চেহারা অথবা বিলাসিতার দিক থেকে ভাস্কর রাহার ঘরের সঙ্গে কোনও তফাত এই ঘরের নেই। অথচ ঘরটার চরিত্র যেন অন্যরকম। একটু আগেই যাকে গ্রহান্তরের বাসিন্দা বলে মনে হচ্ছিল, এখন সে যেন দুরন্ত গতিবেগে মহাকাশের দুস্তর দূরত্ব চোখের পলকে অতিক্রম করে ধূমকেতুর মতো ছুটে এসে আছড়ে পড়েছে এই ঘরের মধ্যে। দেবারতির অশরীরী আত্মা যেন কাতর স্বরে বলছে, ‘মুকুটহীন সম্রাট, আপনাদের ছেড়ে আমি যেতে চাইনি। বাট সামওয়ান ফোর্সড মি টু লিভ ইউ অল। আপনাদেরই একজন আমাকে…।’
সে কে, দেবারতি? মনে-মনে প্রশ্ন করলেন রাহা।
দেবারতি মানির ঘরের দরজায় একজন কনস্টেবল পাহারায় মোতায়েন ছিল। রঘুপতি যাদবকে দেখে সে জোড়াতালি দেওয়া ভাঙা দরজা সতর্কভাবে ঠেলে খুলে দিয়েছে। ওঁরা ঘরে ঢুকেছেন একে-একে।
ভাস্কর রাহা শরীরের পাঁচটি ইন্দ্রিয় দিয়ে দেবারতিকে অনুভব করার চেষ্টা করছিলেন। পারফিউমের হালকা গন্ধ তাঁর নাকে আসছিল।
সোজাসুজি তাকালেই বড় মাপের জানলা। পশ্চিমদিকের এই জানলা দিয়েই পড়ে মারা গেছে দেবারতি।
রূপেন মজুমদার আর উৎপলেন্দু সেন এসিজির অনুমতি নিয়ে দেবারতির বিছানার এক কোণে বসে পড়লেন। গত পরশুর রাতের কথা উৎপলের মনে পড়ল। মেয়েটা তাঁকে যৌন প্রতিবন্ধী বলে অপমান করেছিল। একজন ব্যর্থ লেখক, একজন ব্যর্থ অভিনেতা বলেছে বলে কিছু মনে করেননি উৎপল। নাথিং সাকসিডস লাইক সাকসেস। সফলতার চেয়ে বড় সাফল্য আর কিছু হয় না। উৎপল সাফল্য পাননি। সুতরাং এই বাস্তবটুকু না মেনে তাঁর উপায় নেই। কিন্তু তিনি অসমর্থ নন—কোনও দিক থেকেই অসমর্থ নন।
