অনিমেষ চৌধুরি রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে পাশে হাঁটছিলেন। বললেন, ‘আমার সকাল আটটায় ব্রেকফাস্ট খাওয়া অভ্যেস। আজ ভীষণ দেরি হয়ে গেল।’
রতন বন্দ্যোপাধ্যায় অধ্যাপকের বপু নিরীক্ষণ করে হাসতে-হাসতে বললেন, ‘বুঝতে পারছি আপনার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু খুনের তদন্ত বলে কথা—।’
‘খেয়াল করেছেন, ওই গোয়েন্দা ভদ্রলোকের নামের মধ্যে কেমন একটা ইতিহাসের গন্ধ রয়েছে।’
রতন বন্দ্যোপাধ্যায় কিছু বলে ওঠার আগেই কথা বলল কৌশিক পাল, ‘হ্যাঁ—অশোক আর চন্দ্রগুপ্ত। তবে বুদ্ধি বোধহয় চাণক্যের মতো।’
ভাস্কর রাহা ওঁদের চলে যাওয়া দেখছিলেন। ওঁদের সকলের মনে ভয় আছে, আশঙ্কা আছে। কিন্তু দেবারতি মানির জন্য কতটুকু শোক-দুঃখ-তাপ রয়েছে? মেয়েটা মরেছে বারো ঘণ্টাও হয়নি—অথচ এরই মধ্যে জীবনযাত্রা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে! হাসি-ঠাট্টা করা যাচ্ছে অনায়াসে! যেন দেবারতির মৃত্যু এক আচমকা টান মেরেছিল জীবনযাত্রার তারে, তারটা কাঁপতে শুরু করেছিল অনুপ্রস্থ তরঙ্গ গঠন করে। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তরঙ্গের বিস্তার কমতে-কমতে এই ন’-দশ ঘণ্টায় সেই কম্পন একেবারে থেমে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে না দেবারতি মানি নেই—কোনওদিন ছিল।
অথচ রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের প্রতি কী দারুণ ভালোবাসা ছিল মেয়েটার!
আজ থেকে পঁচিশ তিরিশ বছর আগে এইরকম এক ভালোবাসা থেকেই এই সাহিত্যের টানে গা ভাসিয়েছিলেন ভাস্কর রাহা। এমনি গল্প-উপন্যাস যে লিখতে পারতেন না তা নয়। বেশ কয়েকটা লেখা তো ছাপাও হয়েছিল। কিন্তু অ্যালান পো, মপাসাঁ, মম, কোনান ডয়েল, ব্র্যাম স্টোকার, অ্যামব্রোজ বিয়ার্স, ব্র্যাডবেরি, রোল্ড ড্যাল এবং আরও অনেকের লেখা পড়তে-পড়তে মনের ভেতরে কী সব যেন হয়ে গেল। পথ বাঁক নিল। এক অদ্ভুত আচ্ছন্ন ভালোবাসা নিয়ে এই ‘অপরাধী’ সাহিত্যে পা রাখলেন ভাস্কর রাহা। সেই ভালোবাসা নিয়ে দুর্দিনে পথ হেঁটেছেন, ক্রমাগত লড়াইয়ে পৌঁছে গেছেন সফলতার সোনার দিনে। কিন্তু অদ্ভুত সেই ভালোবাসা—এত বছরেও এক বিন্দু কমেনি।
এরকম কম-বেশি ভালোবাসা নিয়ে আরও অনেক লেখক এসে যোগ দিয়েছেন সাহিত্যের এই বিশেষ শাখায়। তাঁরা একনিষ্ঠভাবে এই সাহিত্যের চর্চা করে গেছেন। সে-সময়ে নামি পত্রপত্রিকায় রহস্য গল্প-উপন্যাস ছাপা হত না। কিন্তু তা সত্ত্বেও এইসব ‘প্রেমিক’ লেখকরা ভিক্ষার পাত্র নিয়ে গিয়ে সেইসব নামী পত্রিকার দরজায় কড়া নাড়েননি। বরং ছোট পত্রিকায় লিখেছেন নিয়মিত। ‘মাসিক রহস্য পত্রিকা’, ‘মাসিক রোমাঞ্চ’, ‘মাসিক গোয়েন্দা’, ‘মাসিক ক্রিমিনাল’, ‘ভয়ংকর’, ‘ক্রাইম’, ‘অপরাধ’—এইসবই ছিল তাঁদের প্রিয় পত্রিকা। স্বর্গের দাসত্ব করার চেয়ে নরকের রাজত্ব তাঁদের পছন্দ ছিল।
দিনের পরে দিন কেটে গেল। সময়ও তার রং বদলাতে লাগল ধীরে-ধীরে। বেশ কয়েকটি রহস্য-রোমাঞ্চ পত্রিকা বন্ধ হয়ে গেল লড়াইয়ে হেরে গিয়ে। কিন্তু জন্ম নিল কয়েকটি নতুন পত্রিকা : ‘ছায়াময়’, ‘রহস্য-রোমাঞ্চ’, ‘ভৌতিক’। আবার নতুন করে শুরু হল লড়াই।
ইতিমধ্যে কয়েকটি নামি পত্রিকা রহস্য গল্প-উপন্যাস প্রকাশ করে পাঠকের সাড়া পেয়েছে। টিভিতে প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়েছে রহস্য-কাহিনি। ফলে রহস্য-রোমাঞ্চ জাতীয় পত্রিকাগুলোর প্রচার সংখ্যা বাড়তে লাগল। প্রকাশকরা এ-জাতীয় বই প্রকাশে মন দিলেন। লেখকরা যেন নতুন করে কোরামিন ইনজেকশান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তাঁদের কলম নিয়ে।
তারপর…গত পাঁচ-সাত বছরে ছবিটা একেবারে বদলে গেল। সফলতার স্বাদ এখন রহস্য-সাহিত্যিকদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।
কিন্তু সেই ভালোবাসা? সেটা কি সকলের মধ্যে রয়েছে? সহজে সফলতা পাওয়ার লোভে কেউ কেউ কি এসে যোগ দেননি এই স্রোতে? আর পুরোনো লেখকরা এখনও কি ভাস্কর রাহার মতো বুকে হাত রেখে বলতে পারেন, ‘রহস্য-সাহিত্য, তোমাকে আমি প্রাণের চেয়েও ভালোবাসি।’ বোধহয় না। তবে দেবারতি মানি পারত।
আর সেইজন্যেই কি খুন হয়ে গেল মেয়েটা!
‘মিস্টার গুপ্ত,’ ভাস্কর রাহা শান্ত গলায় বললেন, ‘দেবারতির ঘরটা আমি একবার দেখতে পারি?’
ভুরু বাঁকিয়ে আড়চোখে রাহার দিকে তাকাল রঘুপতি যাদব : ‘মতলব?’
ভাস্কর রাহা রঘুপতির দিকে ফিরেও তাকালেন না। অশোকচন্দ্রের দিকে তাকিয়েই কথা বললেন আবার, ‘যদি অবশ্য আপনাদের তদন্তের কোনও অসুবিধে না হয়।’ একটু থেমে যেন স্বগত মন্তব্য করলেন, ‘মেয়েটাকে আমি বড় ভালোবাসতাম…’
রঘুপতি এবার ভাস্কর রাহার কাছাকাছি এগিয়ে এল। ঘরের মেঝেতে কার্পেট থাকা সত্ত্বেও ওর ভারি বুটের শব্দ শোনা গেল। চোয়াল শক্ত করে ঠোঁটের কোণ বাঁকিয়ে রঘুপতি চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল, ‘মোহাব্বত! ইন্টারেস্টিং।’
উৎপলেন্দু সেন রত্নবলী মুখোপাধ্যায়ের দিকে তাকালেন। চাপা গলায় মন্তব্য করলেন, ‘একেবারে আনকালচারড।’ রূপেন মজুমদার ইশারায় উৎপলকে থামতে বললেন।
রত্নাবলী অনেকক্ষণ ধরেই অস্বস্তি পাচ্ছিলেন। তাই গলা তুলে রঘুপতি যাদবকে লক্ষ করে কিছু একটা বলতে গেলেন। কিন্তু ভাস্কর রাহা ইশারায় তাঁকে থামালেন। ধীরেসুস্থে পকেট থেকে চুরুট বের করে তাতে অগ্নিসংযোগ করে আরামের ভঙ্গিতে ধোঁয়া ছাড়লেন। তারপর এসিজিকে লক্ষ করে বললেন, ‘মিস্টার যাদবের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যাপারটা আপনিই ভালো বলতে পারবেন—আপনি ওর মাস্টারমশাই ছিলেন। তা ছাড়া এখানে আমি সহবত শেখানোর ইস্কুল খুলিনি—ওটা বাড়ি থেকেই শিখে আসতে হবে।’
