উত্তরটা পাওয়া গেল প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই। ছোট-ছোট পা ফেলে এসিজি ঘরের গোল টেবিলটার কাছে এগিয়ে গেলেন। টেবিলে পড়ে থাকা নানান কাগজপত্রের মধ্যে থেকে সাদা মলাটের একটা চওড়া ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে তার পাতা ওলটাতে লাগলেন : ‘বার্ষিক রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক সম্মেলন’-এর সুভেনির। অনুষ্ঠানের প্রথম দিনেই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেকের হাতে এক কপি করে তুলে দেওয়া হয়েছে। এই পুস্তিকায় প্রত্যেক লেখকের ছবি এবং সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেওয়া আছে। গতকাল মাঝরাত থেকে এটুকু সময়ের মধ্যে এসিজি তাঁর হোমওয়ার্ক বেশ ভালোভাবেই শেষ করেছেন।
ভাস্কর রাহা এতক্ষণ চুপচাপ বসে ছিলেন। জ্বলন্ত চুরুটে টান দিচ্ছিলেন আর কৌতুকভরা চোখে প্রায় সমবয়েসি এই গোয়েন্দাকে দেখছিলেন। গল্প-কাহিনির গোয়েন্দাদের সঙ্গে কত অমিল!
এমন সময় ঘরের টেলিফোন বেজে উঠল। ভাস্কর রাহা বিছানা থেকে উঠে এগিয়ে যাচ্ছিলেন বিছানার মাথার কাছে ছোট টেবিলে রাখা সবুজ টেলিফোনটার দিকে, কিন্তু তাঁকে বাধা দিল রঘুপতি যাদব। চট করে তাঁর পথ জুড়ে দাঁড়াল। বলল, ‘মাফ কিজিয়েগা, সাহাব। ইনভেস্টিগেশন চালু হয়ে গেছে। এখন থেকে আপনাদের সব চিঠি আর ফোন কল আমরা ইন্টারসেপ্ট করব। মানে, চেক করব।’
রাহার মুখে রক্তের উচ্ছ্বাস দেখা দিলেও রঘুপতি সেটাকে আমল দিল না।
অশোকচন্দ্র রঘুপতির পুরো কথা শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেননি। ছোট্ট করে ‘সরি, মিস্টার রাহা’ বলে ম্যাগাজিনটা টেবিলে আবার রেখে দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে পৌঁছে গেছেন টেলিফোনের কাছে। রিসিভার তুলে নিয়ে স্বাভাবিক ভারি স্বরে কথা বললেন। তারপর রিসিভার বাড়িয়ে দিলেন প্রশান্ত রায়ের দিকে : ‘আপনার ফোন—’
এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার কথা বললেন টেলিফোনে। তাঁর কথার শতকরা নিরানব্বই ভাগই শুধু ‘ইয়েস’ আর ‘ওকে’। কথা শেষ করে রিসিভার নামিয়ে রাখলেন। তারপর ঘরের সকলের মুখের ওপর একদফা চোখ বুলিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করলেন, ‘অনেকগুলো ইম্পরট্যান্ট খবর আছে। আপনাদের কনফারেন্স আজ সাড়ে দশটায় স্টার্ট হবে। অরগানাইজাররা জানিয়েছেন—’
‘ম্যানেজারসাহেব।’ ভাস্কর রাহার পথ ছেড়ে প্রশান্ত রায়ের দিকে তাকিয়েছে রঘুপতি : ‘আপনার সিলেবাসে কি সামারি বলে কিছু নেই? কাল রাত থেকে দেখছি চার লাইন ইনফরমেশন দিতে গিয়ে চল্লিস লাইন ইনট্রোডাকশন। আপনাদের বাংলায় একে কী বলে যেন, এসিজি? বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত কী যেন?’
‘ওঃ রঘুপতি!’ হাত তুলে ইন্সপেক্টর যাদবকে ক্ষান্ত করতে চাইলেন এসিজি : ‘তোমার এখনও সেই স্টুডেন্ট লাইফের মতো মাথা গরম।’ প্রশান্ত রায়ের দিকে ঘুরে তাকালেন তিনি, বললেন, ‘মিস্টার রায়, যা বলার সংক্ষেপে সারুন।’
প্রশান্ত রায় সুট পরে ছিলেন। কোটের পকেটের কাছটায় দুটো হাত ঘষলেন কয়েকবার। তার গোলগাল ফরসা মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এইমাত্র কেউ তাঁর গালে রুজ মাখিয়ে দিয়েছে। কাল রাত থেকে এই অভদ্র ইন্সপেক্টরটা তাকে কম অপমান করেনি। যেমন গাধার মতো খাটিয়েছে তেমনই শাসন করেছে। শুধু হোটেলের রেপুটেশনের কথা মনে রেখে তিনি সব সহ্য করেছেন। তা ছাড়া ম্যানেজমেন্টও তাঁকে অর্ডার দিয়েছে পুলিশের সঙ্গে টু হান্ড্রেড পারসেন্ট কোঅপারেট করতে। অগত্যা…।
প্রশান্ত রায় একেবারে টেলিগ্রামের ভাষায় বলতে শুরু করলেন, ‘আজ থেকে কনফারেন্স শুরু হবে রোজ সাড়ে দশটায়। পুলিশকে না জানিয়ে আপনারা কেউ হোটেল ছেড়ে যাবেন না। আর পুলিশের ইনভেস্টিগেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আপনারা বাইরের কোনও লোকের কাছে এ-বিষয়ে মুখ খুলবেন না। কোনও পত্রপত্রিকায় কিছু লিখবেন না। ব্রেকফাস্ট রেডি। সাড়ে দশটা পর্যন্ত পাওয়া যাবে।’
‘ব্রেকফাস্ট’ শব্দটা শোনার পর বোধহয় সকলের খেয়াল হল খিদে পেয়েছে।
রঘুপতি অশোকচন্দ্রের দিকে তাকিয়ে ইশারা করে চোখ নাচাল। অর্থাৎ, এবার কী হবে?
অশোকচন্দ্র গুপ্ত হাত তুলে গলা উঁচিয়ে বললেন, ‘উপস্থিত রহস্য ভদ্রমন্ডলী, আপনাদেরই একজন, মিস দেবারতি মানি, গতকাল রাতে তাঁর চারতলার ঘরের জানলা থেকে নীচে লাফ দিয়েছে। আপনারা অনেকেই হয়তো ভেবেছেন, ব্যাপারটা আত্মহত্যা—কিন্তু আসলে তা নয়। কেউ তাকে নীচে লাফিয়ে পড়তে সাহায্য করেছে। সম্ভবত আপনাদেরই কেউ।’ একটু থেমে অশোকচন্দ্র আনমনাভাবেই তাঁর মাথার একগোছা চুল টানলেন। তারপর বললেন, ‘ব্যাপারটা যে খুন—আত্মহত্যা নয়—তার ডেফিনিট প্রমাণ আমরা পেয়েছি। ফলে এখন একটা কাজই বাকি : খুনি পাকড়াও করা। আমি আর রঘুপতি মিলে এর মধ্যেই আপনাদের ষোলোজন সম্পর্কে ছোটখাটো একটা ডোসিয়ার তৈরি করে ফেলেছি। আপনারা তো জানেন, খুনের ব্যাপারে ডিটেকটিভ বা পুলিশের একটা জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপার থাকে। সেইজন্যেই আপনাদের প্রত্যেকের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলা দরকার। আপনারা এখন ব্রেকফাস্ট, কনফারেন্স, এইসব সেরে নিতে পারেন। আমি লাঞ্চের সময় যতটা পারি কাজ সেরে নেব। তারপর সন্ধে থেকে আবার বিরক্ত করব। অতএব, আপাতত আপনারা যেতে পারেন।’
এসিজির কথা শেষ হতেই ঘরে শুরু হল গুঞ্জন।
অতিথিরা কথা বলতে-বলতে রওনা হলেন ঘরের দরজার দিকে। রঘুপতি যাদব বাজপাখির চোখে তাঁদের লক্ষ করছিল।
