‘ঠিক একইভাবে ”বাঁকাউল্লার দপ্তর” থেকে শুরু করে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়, ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, পাঁচকড়ি দে, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, নীহাররঞ্জন গুপ্তের বুড়ি ছুঁয়ে আজকের অনামিকা সেনগুপ্ত পর্যন্ত আমার পড়া।’ একটু দম নিলেন বৃদ্ধ। হাতে হাত ঘষলেন। তারপর শব্দ করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে যেন নিজেকেই প্রশ্ন করলেন, ‘কিন্তু আমি কে?’
কয়েক সেকেন্ড অপেক্ষা। ঘরের সবাই চুপ। আর ঠিক তখনই দরজার কলিংবেল আবার বেজে উঠল।
দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকলেন অনিমেষ চৌধুরি। ধুতি পাঞ্জাবি পরে একেবারে কেতাবী অধ্যাপকটি সেজে এসেছেন।
সুতরাং ষোলো কলা পূর্ণ হল, যেহেতু অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ষোলোজন বিশেষ অতিথিই এখন এই ঘরে হাজির।
শুভ্রকেশ বৃদ্ধ আপনমনেই হাসছিলেন মুখ টিপে, আর ছোট ছোট পা ফেলে ঘুরপাক খাচ্ছিলেন ঘরের মাঝখানে। হঠাৎই পায়চারি থামিয়ে মুখ তুলে তিনি ভরাট গলায় ঘোষণা করলেন, ‘আমি এক হুনুর—থিঙ্কিং মেশিন—এখানে হুনুরি করতে এসেছি।’
ঘর আবার নিস্তব্ধ।
‘হুনুর!’ প্রেমময় চৌধুরি অবাক হয়ে উচ্চারণ করেছেন।
সেদিকে ঘুরে তাকালেন বৃদ্ধ : ‘হ্যাঁ, হুনুর। ফারসী ভাষা থেকে বাংলায় এসেছে। যার অর্থ হল তীক্ষ্নবুদ্ধি, দক্ষ ব্যক্তি—অথবা, সহজ কথায় গোয়েন্দা।’
জ্যোতিষ্ক পাশে দাঁড়ানো অর্জুন দত্তকে চাপা গলায় বললেন, ‘বুঝলেন, এই সেই মাল—গাছ থেকে নেমে এসেছে।’
বৃদ্ধ তখনও বলছিলেন, ‘আমি এখানে হুনুরি করতে এসেছি। প্যারীচাঁদ মিত্রের ”আলালের ঘরের দুলাল” বইতে ”হুনুরি” শব্দটা আছে। সেখানে তার অর্থ ”শিল্পকর্ম” বা ”সূচিকর্ম”। হাসলেন বৃদ্ধ, চোখ বুলিয়ে নিলেন সকলের মুখের ওপরে : ‘আমি এখানে অনেকটা সেই কাজই করতে এসেছি। শিল্পকর্ম—মানে গোয়েন্দাগিরি।
‘আমার নাম অশোকচন্দ্র গুপ্ত। ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে এসিজি। কারণ বয়েসকালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করতাম। ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টে। চিন্তা করতে আমি ভালোবাসি বরাবরই। আর ভালোবাসি দেশি-বিদেশি ডিটেকটিভ ফিকশন বা ক্রাইম ফিকশন পড়তে। এছাড়া আর একটা আজব শখ আমার আছে—পাখি আর পাখির ডাক।’ রঘুপতি যাদবের দিকে আঙুল তুলে দেখালেন অশোকচন্দ্র : ‘রঘুপতি যাদব এক সময়ে আমার ছাত্র ছিল। তারপর কী করে যেন লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের ইন্সপেক্টর হয়ে গেছে। এই ছেলেটা খুন একদম পছন্দ করে না—আর আমার নেশার কথা জানে। সেইজন্যেই হোটেল ”সিরাজ” থেকে প্রশান্তবাবুর টেলিফোন পাওয়ার পর ও আমাকে ফোন করে। বলে, ”এসিজি, ইন্টেলেকচুয়ালদের কনফারেন্সে একটা ইয়াং মেয়ে মার্ডার হয়ে গেছে। ক্রাইম রাইটারদের কনফারেন্স। ফিল ইন্টারেস্টেড?”
‘তারপর, রাইটারদের নামের সূচিপত্র শুনে, আই বিকেম ইন্টারেস্টেড। যাঁদের লেখা সবসময় পড়ি তাঁদের দশ-দশজনের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হবে! ভাবাই যায় না। সুতরাং কাল রাত থেকেই রঘুপতি যাদবের সঙ্গে আমি এখানে হাজির। রঘুপতির খালি এক কথা : ”পাখি যেন পালাতে না পারে—।” ‘
অশোকচন্দ্র গুপ্ত—সংক্ষেপে এসিজি—হাসলেন, বললেন, ‘বুঝতেই পারছেন, ও আমার পাখির নেশার কথা জানে। জানে, অনেকরকম পাখির ডাকই আমার চেনা। দ্যাটস অল।’
এসিজির কথা বলার ঢং দেখেই বুঝতে অসুবিধে হয় না, বক্তৃতা দেবার অভ্যেস তাঁর আছে। কথা শেষ করে দুটো হাত একজোট করে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। সকলের উদ্দেশেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘কারও কোনও প্রশ্ন আছে?’
কয়েক সেকেন্ড সবাই চুপচাপ। তারপর অনামিকা ফস করে বলে বসল, ‘আপনাকে দেখে ডিটেকটিভ বলে মনেই হয় না—।’
অস্বাভাবিক ক্ষিপ্র গতিতে পঁয়ষট্টি পেরোনো বৃদ্ধ ঘুরে তাকালেন অনামিকার দিকে। তাঁর চোয়ালের রেখা পলকের জন্য শক্ত হল। তারপর সুন্দর করে হেসে বললেন, ‘ওটা আমার ছদ্মবেশ, মা-মণি। আদর করে ”মা-মণি” বললাম বলে রাগ কোরো না, অনামিকা। তুমি আমার মেয়ে ঊর্মিলার মতো। ঊর্মিলা কিছুতেই মানতে চায় না আমি ডিটেকটিভ। আসলে কী জানো? চেহারা আমার শার্লক হোমসের মতো নয়, সেরকম করে পাইপ টানতেও পারি না। এরকুল পোয়ারোর মতো মোমের পালিশ দেওয়া ছুঁচলো গোঁফ আমার নেই। দেবেন্দ্রবিজয়, হুকাকাশি, রবার্ট ব্লেক বা ব্যোমকেশের মতো প্রতিভা আমার নেই। এমনকি রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের বুদ্ধিমান গোয়েন্দা করঞ্জাক্ষ রুদ্র কিংবা ভাস্কর রাহার স্মার্ট ক্ষুরধার বুদ্ধি গোয়েন্দা সুরজিৎ সেনের সঙ্গেও কোনও তুলনা আমার চলে না। কারণ আমি ছাপোষা মানুষ। কোনও করিশমা আমার নেই।’ বাঁ-হাতটা মাথার পিছনদিকে ঘোরালেন তিনি : ‘দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি, আমার মাথার পেছন থেকে কোনও জ্যোতি বেরোয় না।
তবে—’ একটু বিরতি দিলেন এসিজি। রূপেন মজুমদার, রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় আর ভাস্কর রাহার দিকে একবার দেখলেন। তারপর : ‘তবে আমরা, মানে, বাস্তব জীবনের গোয়েন্দারা মোটামুটিভাবে জোড়াতালি দিয়ে কাজ চালিয়ে নিই। যা হোক করে শেষ পর্যন্ত খুনিকে ধরে ফেলতে পারি। তদন্ত করার সময়ে আমার ব্যবহারে যদি কোনও ভুল-ত্রুটি হয়ে যায় তাহলে আপনারা দয়া করে সেটা নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন।’
এসিজি এমন সহজভাবে সকলের সঙ্গে কথা বলছিলেন যে, মনে হচ্ছিল সকলকেই তিনি চেনেন। অনামিকা ‘মা-মণি’ সম্বোধনে বেশ অপমানিত এবং আহত হয়েছিল। কিন্তু ও খানিকটা খুশি হয়েছিল অশোকচন্দ্র ওর লেখা পড়েছেন বলে। নতুন লেখকদের পক্ষে পাঠক পাওয়া যে কী শক্ত! কিন্তু ভদ্রলোক সকলকে অনায়াসে চিনে ফেলেছেন কেমন করে? এ কি ওর হুনুরির নমুনা, না কি…।
