এই সতেরোজনের মধ্যে একজন অতিথি ‘আছেন’ থেকে ‘ছিলেন’ হয়ে গেছেন।
বড় রাস্তা থেকে দেখলে সতেরোটা ঘরের মধ্যে ষোলোটা ঘরের জানলা একটা চার বাই চার দাবার ছক তৈরি করেছে বলে মনে হবে। শুধু চারতলায় রঞ্জন দেবনাথের ঘরটাই ডান দিকে বাড়তি একটা চৌখুপি। অবশ্য আমন্ত্রিত ‘অতিথি ছাড়াও হোটেলে অন্যান্য বোর্ডার রয়েছে।
তিনতারা হোটেলের ঘর যেমন হওয়া উচিত ঘরগুলো সেরকমই। তবে সতেরোটা সিঙ্গল রুম পাওয়া যায়নি বলে আয়োজকরা নটা ডাবল রুম ভাড়া নিয়েছেন। কিন্তু কোনও অতিথির গোপনীয়তায় যেন আঁচড় না পড়ে তার জন্য ডাবল রুমগুলোকেও সিঙ্গল রুমের মতো ব্যবহার করা হয়েছে।
ভাস্কর রাহার ঘরটা ডাবল রুম। ঠিক তার নীচের ডাবল রুমটা পেয়েছেন অনির্বাণ ঘোষ। রাহার ওপরের ডাবল রুম ছিল দেবারতির। আর তার ঠিক ওপরের ডাবল রুমেই আছেন রত্নাবলী।
ঠিক একইরকম ডাবল রুম পেয়েছেন রুপেন মজুমদার, রতন বন্দ্যোপাধ্যায়, রঞ্জন দেবনাথ, উৎপলেন্দু সেন ও প্রীতম নন্দী।
তবে রুম সিঙ্গল হোক আর ডাবলই হোক, তাদের চেহারা ও চরিত্রে কোনও তফাত নেই—শুধু আয়তনের সামান্য ফারাকটুকু ছাড়া। সুতরাং তিনতারা হোটেলের একটি অভিজাত ঘরের চরিত্র যদি হঠাৎ করে লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের কোনও ঘরের মতো হয়ে যায়, তা হলে ধাক্কা খাওয়ারই কথা।
জ্যোতিষ্ক সান্যাল, অর্জুন দত্ত এবং উৎপলেন্দু সেন ভাস্কর রাহার ঘরে ঢুকে ঠিক সেই ধাক্কাটাই খেলেন।
ঘরে এত লোকজন যে, ঘরের অক্সিজেন বোধহয় নাভিশ্বাস তুলছে।
বিছানায় বসে আছেন কয়েকজন। তিনজন টেবিলের কাছে। এ ছাড়া ঘরের এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেউ কেউ। আর পশ্চিমের খোলা জানলার কাছে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন মানুষ। তার মধ্যে একজনের মাথার চুল ধবধবে সাদা। রোগা ছিপছিপে চেহারা। গায়ের রং শ্যামলা। চোখে সরু ফ্রেমের চশমা। পরনে খদ্দরের ঢোলা পাঞ্জাবি আর পাজামা। ডান হাতের লম্বা আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত সিগারেট।
আর দ্বিতীয়জন বেশ লম্বা, শক্ত পোক্ত। বয়স চল্লিশের এপিঠেই। ছোট করে ছাঁটা চুল। কাঁচাপাকা চওড়া গোঁফ। ফরসা মুখে সামান্য বসন্তের দাগ। পরনে ছাই রঙের ফুলপ্যান্ট, আর সাদা নীল চেক কাটা হাওয়াই শার্ট। হাতের শিরা এবং পেশি—দুই-ই প্রকট। আর তার চোয়ালের উদ্ধত রেখা যেন সবাইকে সাবধান করে দিচ্ছে : হুঁশিয়ার!
টেবিলের কাছাকাছি একটা সোফায় বসে ছিলেন ‘সিরাজ’-এর এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার। জ্যোতিষ্কদের ঘরে ঢুকতে দেখেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন। সূত্রধারের ঢঙে বলতে শুরু করলেন,
‘আপনারা তো সকলেই জানেন যে, কাল রাত সাড়ে এগোরোটা নাগাদ মিস দেবারতি মানি—আমাদের হোটেলের তিনশো আট নম্বর রুমের বোর্ডার—তাঁর ঘরের জানলা থেকে লাফ দিয়ে সুইসাইড করেছেন। যেহেতু তিনি এই কনফারেন্সের পার্টিসিপ্যান্ট ছিলেন সেহেতু এই দুর্ঘটনা—মানে, মিসহ্যাপের সঙ্গে আপনাদের ইনভলভমেন্টটাই বেশি।’ একটু দম নিলেন ম্যানেজারসাহেব তারপর : ‘আমাদের হোটেলের একটা রেপুটেশন আছে। মানে, সুনাম আছে। তাই আমরা চাই খুব একটা শোরগোল না তুলে পুলিশের ইনভেস্টিগেশন শেষ হোক—’
‘লম্বা অফসানা জলদি খতম করুন, ম্যানেজারসাহেব।’ জানলার কাছ থেকে দ্বিতীয়জন আকস্মিকভাবে রুক্ষ মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছে। তার কপালে বিরক্তির ভাঁজ। হাতে কয়েকটা কাগজ, আর খোলা বলপয়েন্ট পেন।
প্রশান্ত রায় থতমত খেয়ে চুপ করে গেলেন।
জানলার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা শুভ্রকেশ ভদ্রলোক জ্বলন্ত সিগারেটসমেত ডান হাতটা ওপরে তুলে মাস্টারি ভঙ্গিতে বললেন, ‘আঃ, রঘুপতি। টেক ইট ইজি। এত অল্পেতে অধৈর্য হয়ে পড়ো কেন।’
রঘুপতি অবাক চোখে তাকাল বৃদ্ধের দিকে : ‘একটা ইয়াং মেয়ে কথা নেই বার্তা নেই একজন আননোন কাতিলের হাতে কোতল হয়ে গেল—আর আপনি সেটাকে বলছেন অল্প! অল্প মাই ফুট, গুপ্তাসাব। আমি খুনিকে চাই, ব্যস।’
বৃদ্ধ সিগারেটে টান দিলেন। বাঁ হাতে রঘুপতির পিঠ চাপড়ে দিলেন দু-বার। তারপর সামান্য হেসে বললেন, ‘রঘুপতি যাদব, আমার গায়ের জোর নেই মানছি, কিন্তু আমার বুদ্ধির জোরের ওপরেও তোমার ভরসা নেই! তুমি আমার কাছে সিম্পলি খুনিকে চাইছ, এই তো! কোনও চিন্তা নেই, পাবে। শুধু এক-দু’ দিন সময়ের ব্যাপার।’
ঘরের দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল, দরজা খুলল।
ঘরে ঢুকলেন রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়—সঙ্গে অনামিকা।
রত্নাবলী ঘরে ঢুকেই ইতস্তত করে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, একটু দেরি হয়ে গেল। রাতে ঘুমের ট্যাবলেট খেয়ে শোওয়া অভ্যেস। অনামিকা দরজায় ধাক্কা না দিলে হয়তো ঘুম এখনও ভাঙত না—’ চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসলেন তিনি।
অনামিকা এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে সোজা এগিয়ে গেল বিছানায় বসে থাকা ভাস্কর রাহার দিকে।
হাতের সিগারেট অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে অপরিচিত সাদা-চুল বৃদ্ধ হাসি মুখে দু-হাত নেড়ে স্বাগত জানালেন রত্নাবলীকে।
‘আসুন, ম্যাডাম—বসুন।’
সাংবাদিক প্রীতম নন্দী নিজের সোফাটা ছেড়ে দিল রত্নাবলীকে।
রত্নাবলী জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন বৃদ্ধের দিকে। সেই জিজ্ঞাসার অর্থ বুঝতে পেরে বৃদ্ধ স্মিত হেসে বললেন, ‘ম্যাডাম, আমি আপনার লেখার একান্ত ভক্ত। এই সম্মেলনে আপনারা যে দশজন লেখক এসেছেন তাঁদের প্রত্যেকের লেখাই আমি পড়েছি। উইলিয়াম উইলকি কলিন্সের ”দ্য ওম্যান ইন হোয়াইট” থেকে শুরু করে এডগার অ্যালান পো, আর্থার কোনান ডয়েল, রিচার্ড অস্টিন ফ্রিম্যান, জি. কে. চেস্টারটন, আগাথা ক্রিটি, জর্জ সিমেনন, নিকোলাস ব্লেক, জন ডিকসন কার, পি. ডি. জেমস ছুঁয়ে আজকের রুথ রেন্ডেল পর্যন্ত সকলের লেখা আমি পড়েছি। গোয়েন্দা কাহিনি আমার পড়তে ভালো লাগে। ভালো লাগে খুনির সঙ্গে গোয়েন্দার বুদ্ধির লড়াই।
