‘উৎপলেন্দুবাবু, খবর শুনেছেন।’
‘কী খবর?’ উৎপল অবাক হয়ে অধ্যাপককে দেখছিলেন। ভদ্রলোকের ঘর চারতলায়, দেবারতির ঘরের ঠিক পাশে। সেখান থেকে এই অদ্ভুত পোশাকেই নেমে এসেছেন উৎপলেন্দুর তিনতলার ঘরে!
‘পুলিশ এসে পড়েছে—’ ছাত্র পড়ানোর ভঙ্গিতে আঙুল উঁচিয়ে অধ্যাপক চৌধুরি বললেন, ‘ওরা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে দিয়েছে। একটু আগে একজন বেয়ারা এসে আমার ঘুম ভাঙিয়ে খবরটা দিয়ে গেল। বলল, দুশো আট নম্বর ঘর—মানে, ভাস্করবাবুর ঘরে যেতে। ম্যানেজারবাবু নাকি বলেছেন। তাই আপনাকে ডাকতে এলাম। আসার সময় দেখলাম ভাস্করবাবুর ঘরের দরজা বন্ধ।’
উৎপলেন্দুর পাশের ঘরটা অর্জুন দত্তের। আর তার পাশেরটাই দুশো আট নম্বর। গলা বাড়িয়ে সেদিকে একবার উঁকি দিয়ে অন্য কথা জিগ্যেস করলেন উৎপলেন্দু, ‘কাল আপনার ডেটা কালেকশন কেমন হল? কোনও সুত্র-টুত্র পেলেন?’
‘অনেক ডেটা জোগাড় করেছি। পুলিশ যদি হেল্প চায় তো ওদের দেব। তা না হলে ওগুলোই জোড়াতালি দিয়ে একটা উপন্যাস লিখে ”ছায়াময়” পত্রিকায় চালিয়ে দেব। অনির্বাণ ছেলেটি বড় ভালো।’
ভাবতে অবাক লাগে, এই লেখকও অর্ধেক সফলতা পেয়েছে। আর উৎপলেন্দুর রচনাবলীতে শুধুই ট্র্যাজেডি। গোলমালটা যে কোথায়, এত বছরেও উৎপল সেটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলেন না।
‘কী হল, চলুন! ভাস্করবাবুর ঘরে তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে—।’
‘আপনি কি এই পোশাকেই যাবেন না কি। যান, জামাটা অন্তত গায়ে দিয়ে আসুন…বাইরের লোকজন থাকবে…।’
‘কেন?’ নিজের গেঞ্জি আর লুঙ্গির দিকে দেখলেন অধ্যাপক : গেঞ্জি পরে আমাকে খারাপ দেখাচ্ছে?’
‘না, তা দেখাচ্ছে না। তবে লেখক মানুষ বলে কথা, এই পোশাক পরে ওখানে গেলে লোকে পালোয়ান বলে ঠাওরাতে পারে।’
অনিমেষ চৌধুরিকে দ্বিধাগ্রস্ত এবং বিব্রত বলে মনে হল।
এমন সময় একজন উর্দি পরা বেয়ারা দরজার কাছে এসে দাড়াল। বলল, ‘স্যার, ম্যানেজারসাহেব আপনাদের দুশো আট নম্বর ঘরে যেতে বলেছেন। ওখানে পুলিশের লোকজন সব এসেছে।’
জরুরি খবরটি দিয়ে বেয়ারাটি দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল বাকিদের তলব করতে।
অনিমেষ চৌধুরি ছটফট করছিলেন। কী করবেন ভেবে উঠতে পারছিলেন না। একটু ইতস্তত করে বললেন, ‘আমি তাহলে যাই, চটপট ড্রেস করে আসি। দেরি করে হাজির হলে আবার আমাকেই না সন্দেহ করে বসে। স্ট্রেটকাট সুইসাইড কেস। সেটাকে ওরা হয়তো তখন মার্ডার বলে চালিয়ে দেবে…।’
‘সুইসাইড নয়। সবাই বলছে এটা নাকি স্ট্রেট কাট মার্ডার কেস।’ অধৈর্যভাবে শেষ কথাটা যোগ করলেন উৎপলেন্দু, ‘এখন যান, জলদি জামাকাপড় পরে আসুন—।’
আর অপেক্ষা করলেন না উৎপল। ঘরে ঢুকে, বলতে গেলে অনিমেষ চৌধুরির মুখের ওপরেই, দরজা বন্ধ করে দিলেন।
হাতমুখ ধুয়ে জামাকাপড় পরে তৈরি হওয়ার সময় অবাক হয়ে তিনি লক্ষ করলেন, তাঁর হাত সামান্য কাঁপছে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ঘরের দরজা লক করে করিডর ধরে হাঁটা দিলেন উৎপলেন্দু। ভারি শরীর নিয়ে ধীরে-ধীরে পথ চলেন তিনি। অর্জুন দত্তের ঘরের দরজার কাছে পৌঁছোনো মাত্র দরজা খুলে বেরিয়ে এল অর্জুন, হাতে নস্যির কৌটো। আর তার ঠিক পিছনেই জ্যোতিষ্ক সান্যাল। ওঁরাও বোধহয় দুশো আট নম্বরের দিকে চলেছেন।
জ্যোতিষ্ক সান্যাল উৎপলেন্দুর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কোথায় চললেন, দুশো আট?’
উৎপলেন্দু ঘাড় নেড়ে জানালেন, ‘হ্যাঁ। এখন সব রাস্তাই দুশো আট নম্বর ঘরের দিকে।’
একটু থমকে দাঁড়িয়ে জ্যোতিষ্ক চাপা গলায় বললেন, ‘বেয়ারাদের কাছ থেকে বেশ কিছু ইনফরমেশন পেয়েছি। গল্পের গোয়েন্দাকে তো বহুবার গাছে চড়িয়েছেন—এবার সে গাছ থেকে নেমে এসেছে—আমাদের টাইট দেবার জন্যে…’
অর্জুন দত্ত শব্দ করে নস্যি নিয়ে নস্যির ডিবে পকেটে ঢুকিয়ে রাখল। নাকে আঙুল ঘষল কয়েকবার। একটা হাঁচি ‘আসব আসব’ করায় সেটা সামলাতে কয়েক সেকেন্ড সময় নিল। তারপর হাঁটা দিল। বাকি দুজনও পা মেলালেন ওর সঙ্গে। কোনও মন্তব্য করলেন না।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দুশো আটের দরজায় এবং কলিংবেলের বোতামে আঙুল। দরজা খুলে দিল উর্দি পরা একজন কনস্টেবল। ওরা তিনজন ঢুকে পড়লেন ভাস্কর রাহার ঘরে।
এবং একটা ধাক্কা খেলেন তিনজনেই।
হোটেল ‘সিরাজ’-এর পশ্চিমদিকের সতেরোটা ঘরে রয়েছেন সম্মেলনে আমন্ত্রিত সতেরোজন অতিথি। তার মধ্যে দশজন রহস্য কাহিনীকার, দুজন সম্পাদক, দুজন প্রকাশক ও তিনজন সাংবাদিক। এছাড়া অনেকেই আমন্ত্রিত হয়েছেন শুধুমাত্র সম্মেলনের রোজকার অনুষ্ঠানে হাজির থাকার জন্য। তাঁদের জন্য আয়োজকরা চা ও লাঞ্চের ব্যবস্থা রেখেছেন। এর মধ্যে আবার বিশিষ্ট কয়েকজন অতিথিকে কর্তপক্ষ সামান্য সম্মান-দক্ষিণা দেওয়ারও বন্দোবস্ত করেছেন।
পশ্চিমমুখো সতেরোটা ঘর ভাগাভাগি হয়েছে এইভাবে :
পাঁচতলার পাশাপাশি চারটে ঘরে আছেন অনামিকা সেনগুপ্ত, রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়, জ্যোতিষ্ক সান্যাল ও রূপেন মজুমদার।
চারতলায় পরপর পাঁচটা ঘরে রয়েছেন অনিমেষ চৌধুরি, দেবারতি মানি, কল্পনা সেন, রতন বন্দ্যোপাধ্যায় ও রঞ্জন দেবনাথ।
তিনতলায় আছেন প্রেমময় চৌধুরি, ভাস্কর রাহা, অর্জুন দত্ত ও উৎপলেন্দু সেন।
আর দোতলায় পরপর চারটি ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন কৌশিক পাল, অনির্বাণ ঘোষ, সুজন সরকার ও প্রীতম নন্দী।
