দরদ দেখাত বটে, কিন্তু সেটা মেকি দরদ নয়। নারী পরশুরাম দেবারতি সাহিত্যের এই শাখাটির উন্নতিই চেয়েছিল। তাই ফাঁকিবাজ ছদ্মবেশী লেখকদের ও সহ্য করতে পারত না। যেসব বুদ্ধিজীবী রহস্য সাহিত্যের নামে নাক সিটকান তাঁদের অনুকম্পাকে ঘেন্না করত দেবারতি। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় একবার একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, আগাথা ক্রিস্টি যে-সাহিত্য করে গেছেন, সেই সাহিত্য চর্চা করতে আমার এতটুকুও লজ্জা নেই।’ এই কথাটা বারবার সবাইকে শোনাত দেবারতি। ভাস্কর রাহাকে বলত, ‘মুকুটহীন সম্রাট, এই সাহিত্যকে ভালোবাসাটাই হচ্ছে আসল। ওয়ার্থলেস ফাঁকিবাজরাই এটার সর্বনাশ হয়ে দাঁড়াবে।’
না, দেবারতি মানির ভালোবাসায় কোনও ফাঁকি ছিল না। আজ লাঞ্চের সময় ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে ভাস্কর রাহা সেটা আর একবার অনুভব করেছেন। তখন কি ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া গিয়েছিল মেয়েটা এখন আর থাকবে না, ‘নেই’ হয়ে যাবে!
লিফটে লোকজন উঠছিল। প্রেমময় চৌধুরি লিফটে ওঠার আগে নেশা জড়ানো গলায় বললেন, ‘এ গ্রেট লস ফর ক্রাইম লিটারেচার অ্যান্ড জার্নালিজম। মেয়েটা এভাবে সুইসাইড করবে ভাবিনি।’
ভাস্কর রাহা কোনও জবাব দিলেন না। তাঁর শুধু মনে হল, সবাই যেন এটাকে আত্মহত্যা অথবা দুর্ঘটনা বলে চালাতে পারলেই বেঁচে যায়। কিন্তু কেন?
লিফট আবার খালি হয়ে নেমে আসার জন্য অপেক্ষা করছিলেন ওঁরা পাঁচজন : ভাস্কর রাহা, রঞ্জন দেবনাথ, অনামিকা সেনগুপ্ত, উৎপলেন্দু সেন আর কল্পনা সেন।
রঞ্জনের চোখ লাল, সামান্য ফোলা। মুখে একটা হাসি মাখিয়ে রাখার চেষ্টা করেও নিজের ঝোড়ো অবস্থাটা লুকোতে পারেনি। তা ছাড়া অল্পবিস্তর যাঁরা লেখালিখি করেন তাঁদের কাছে এটা লুকোনো মুশকিল। কারণ তাঁরা সাধারণ মানুষের তুলনায় একটু বেশি দেখতে পান।
ভাস্কর রাহা রঞ্জনের পিঠে হাত রাখলেন।
ছেলেটার শরীর সামান্য কেঁপে উঠল, কিন্তু ও ভেঙে পড়ল না। দেবারতির সঙ্গে ওর গোপন ভালোবাসার কথা গোপন রাখতে চায়। কিন্তু গোপন ভালোবাসাও তো ভালোবাসা! রঞ্জনের জন্য কষ্ট হল ভাস্কর রাহার।
‘দেবারতি সুইসাইড করেনি, ভাস্করদা—’একটু ধরা গলায় রঞ্জন বলল, ‘আর এটা অ্যাকসিডেন্টও নয়।’
এই প্রথম একজন স্পষ্ট করে ভাস্কর রাহার মতে মত দিল। দেবারতি মানির মতো মেয়েরা কখনও জীবনের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যায় না।
উৎপলেন্দু বললেন, ‘দেবারতি কী একটা সিক্রেট জানতে পেরেছিল। সেটার জন্যেই কি…’
রঞ্জন দেবনাথ তাকাল উৎপলেন্দুর দিকে, বলল, ‘হতে পারে। পুলিশ তদন্ত করে নিশ্চয়ই বের করতে পারবে।’
কল্পনা সেন এতক্ষণ চুপচাপ ছিলেন। এমনিতে তিনি কম কথা বলেন। তার ওপর চেহারা ভীষণ খাটো এবং রোগা হওয়ায় তাঁকে খুব একটা কেউ গুরুত্ব দেয় না। আবার ঠিক সেই কারণেই জ্যোতিষ্ক সান্যাল তাঁকে গুরুত্ব দেন। ইদানিং ভাস্কর রাহাকে তিনি প্রায়ই বলেন, ‘বুঝলেন ভাস্করদা, আমি ডিপ্লোম্যাসি শিখে গেছি!’ এটা তাঁর অহঙ্কার। চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে ভাস্কর রাহা অন্তরালে হাসেন। শিশু তার সরলতা হারালে সেটা কোনও কৃতিত্বের কথা নয়। কূটনীতি আর সততা বোধহয় দুই সতীন, একসঙ্গে ঘর করতে পারে না। তাই তিনি ‘ছোট ভাই’কে জবাব দেন, ‘তুই সত্যিকারের ডিপ্লোম্যাট হলে সে-কথা বোকার মতো জাহির করে বলতিস না।’ কূটনীতির সম্পর্ক ছাড়াই কল্পনা সেন জোতিষ্কের বই ছেপেছেন—হয়তো আরও ছাপবেন।
কল্পনার ফরসা মুখে আবছা কালো ছাপ। সরু সরু আঙুলে সরু ফ্রেমের চশমাটাকে নাকের ওপরে ঠিক করে বসিয়ে ধীরে-ধীরে বললেন, ‘এটা নিয়ে কাগজে খুব নোংরামি হবে।’
তা তো হবেই। ভাস্কর রাহা ভাবলেন। খুন যে ভীষণ নোংরা কাজ!
পাঁচ
দরজায় কেউ জোরে জোরে ধাক্কা দিতেই উৎপলেন্দুর ঘুম ভাঙল।
এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। দেবারতি মানিকে নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক স্বপ্ন। শরীরটা ঝিমঝিম করছে, ক্লান্ত লাগছে। চোখ খুলে ঝাপসাভাবে দেখতে পেলেন ডিসটেম্পার করা দেওয়ালে টাঙানো দেওয়াল-ঘড়ি। মনে হচ্ছে সাড়ে আটটা। বালিশের পাশ থেকে চশমাটা নিয়ে চোখে দিলেন। আবার দেখলেন : সাড়ে আটটাই বটে।
দরজায় আবার ধাক্কা পড়ল।
বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন উৎপলেন্দু। মাথা দপদপ করছে। মনে হচ্ছে টলে পড়ে যাবেন। কাল মাঝরাত পেরিয়ে ঘরে ফিরে এসে আর এক দফা বোতল নিয়ে বসেছিলেন। গ্লাসে চুমুক দিয়ে গত দু-দিনের জ্বালাটা অনেক কমে গিয়েছিল। তারপর একসময় ঘুমনোর চেষ্টা। কিন্তু ঘুম স্বল্পবসনা ক্যাবারে ডান্সারের মতো লীলায়িত ভঙ্গিতে ছলনা করেছে। ঘুম আসেনি ঠিকঠাক—কিন্তু দেবারতি এসেছে—রতি এসেছে।
লুঙ্গির কষি ঠিক করে গেঁট দিয়ে স্যান্ডো গেঞ্জির ওপরে একটা হাওয়াই শার্ট চাপিয়ে নিলেন উৎপলেন্দু। তারপর বেসামাল ক্লান্ত পায়ে দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুললেন।
অনিমেষ চৌধুরি। পরনে গেরুয়া রঙের একটা লুঙ্গি এবং বিচিত্র এক হাতাওয়ালা গেঞ্জি। গেঞ্জিটা বোধহয় প্রফেসরের ছেলেবেলার—কারণ সাঙ্ঘাতিকভাবে এঁটে বসেছে তাঁর শরীরে, এবং তাঁর স্ফীত মধ্যপ্রদেশকে স্বমহিমায় আংশিক প্রকাশিত করে রেখেছে।
অধ্যাপকের মনে যে শান্তি নেই সেটা তাঁর মুখচোখ দেখেই দিব্যি বোঝা যাচ্ছে।
