এত হারামজাদী, ছেনাল, শয়তান ছিল দো-আঁশলা ওই মাগীটা! উৎপলেন্দুর মগজের ভিতরে কিলবিল করে উঠল এই নোংরা কথাগুলো। তাঁর মনে পড়ল গতকাল রাতের ইন্টারভিউর কথা। মরা মেয়েটার জন্য তাঁর খুব সামান্য খারাপ লাগছে। আর মনের বাকি অংশটায় গজগজ করছে অপমান আর জানোয়ারের মতো রাগ। কিন্তু উপায় কী! আমাদের মনের বেশিরভাগটাই জানোয়ার, আর অল্পটুকু মানুষ—ভাবলেন উৎপলেন্দু। মুখে বললেন, ‘হ্যাঁ, নীচে চলুন। একবার দেখে আসি।’
নীচে নামতেই অনিমেষ চৌধুরির সঙ্গে দেখা। রিসেপশন লাউঞ্জের এখানে ওখানে ভদ্রলোক ঘুরঘুর করছেন। এর মুখের দিকে তাকাচ্ছেন, ওর কথা শুনছেন। দেখে মনে হচ্ছে তথ্য সংগ্রহ করছেন।
‘উৎপলেন্দুবাবু, খবর শুনেছেন? দেবারতি মানি মারা গেছে—।’
উৎপলেন্দু গম্ভীরভাবে ভাস্কর রাহা আর অর্জুন দত্তের দিকে একবার দেখলেন। তারপর নীচু গলায় বললেন, ‘হুম শুনেছি।’ একটু থেমে : ‘কিন্তু আপনি এখানে কী করছেন!’
চোখেমুখে ঘুম জড়িয়ে থাকায় অধ্যাপকের গাল দুটো আরও বেশি ফুলে রয়েছে। তা ছাড়া তাঁর অন্যমনস্ক স্বভাবের প্রমাণ হিসেবে বাঁ-চোখের কোলে পিচুটিও দেখতে পেলেন উৎপলেন্দু।
উৎপলেন্দুর কানের কাছে মুখ এনে অধ্যাপক বললেন, ‘ডেটা কালেক্ট করছি। যদি তা থেকে কোনও সূত্র পাওয়া যায়।’
অধ্যাপকের যে শখের গোয়েন্দাগিরির শখ আছে তা কেউই জানতেন না। অর্জুন দত্ত জিগ্যেস করল, ‘সূত্র পেলে কী করবেন?’
‘পুলিশের তদন্তে সাহায্য করব। ক্রাইম রাইটার হিসেবে এটা আমাদের ডিউটি নয় কি? আমাদের এই কনফারেন্সে গেস্ট হয়ে এসেছেন আর যে-দুজন রিপোর্টার—প্রীতম নন্দী আর সুজন সরকার—ওঁদের বলেছি, ক্রাইম রাইটাররা যে এক্সপার্ট ওপিনিয়ন দিয়ে পুলিশকে সাহায্য করার চেষ্টা করছেন, সেকথা কাল ওঁদের কাগজের রিপোর্টে লিখতে।’
এতক্ষণে ব্যাপারটা স্পষ্ট হল ভাস্কর রাহার কাছে। সেলফ পাবলিসিটির চেষ্টা। রহস্য-রোমাঞ্চ দিয়ে শুরু করেছিলেন ভদ্রলোক। তারপর বেশিরভাগই ভৌতিক আর হরর গল্প লিখেছেন, মাঝে মাঝে কল্পবিজ্ঞান। লেখেন সাবেকী ভাষায়, তবে কলমের গতি বোধহয় অর্জুন দত্তকেও হার মানাবে। তা ছাড়া প্রকাশকের চাপে স্কুল-কলেজের ইতিহাস বইও কম লেখেননি। সেখানে লেখক হিসেবে নাম দেন এ. চৌধুরি। আর আয়কর বাঁচানোর জন্য প্রত্যেকটি বইতেই সহলেখক হিসেবে স্ত্রী অথবা ছেলের নাম জুড়ে দিয়েছেন।
ভাস্কর রাহা হাসলেন মনে-মনে। একেই বোধহয় বলে অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর!
‘আপনার পাজামার দড়ির গেঁট খুলেছে?’ একটু হেসে জিগ্যেস করলেন উৎপলেন্দু।
‘অ্যাঁ!…ওহ, হ্যাঁ—হ্যাঁ। শেষ পর্যন্ত কোনওরকমে খুলেছি।’ থতমত খেয়ে জবাব দিলেন অনিমেষ চৌধুরি।
অর্জুন, অনির্বাণ ও ভাস্কর রাহা অবাক হয়ে তাকালেন উৎপলেন্দু সেনের দিকে। অর্থাৎ, কী ব্যাপার!
উৎপল হেসে জবাব দিলেন চাপা গলায়, ‘ও কিছু নয়, তদন্তের একটা সূত্র আর কি—!’
অধ্যাপককে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ তদন্তে ব্যস্ত রেখে ওঁরা চারজন হোটেলের বাইরের চত্বরে এলেন।
বাইরের সবক’টা আলো জ্বেলে দেওয়া হয়েছে। চত্বরের নানা জায়গায় ভিড় এবং জটলা। দেখে মনেই হয় না, রাত বারোটা বেশ কিছুক্ষণ হল পেরিয়ে গেছে।
ভিড় ঠেলে দেবারতির মৃতদেহের কাছে গেলেন ওঁরা। এক পলক দেখেই চোখ সরিয়ে নিলেন। মৃতদেহ সব সময়েই অসুন্দর।
এমন সময় একটা গুঞ্জন শোনা গেল : পুলিশ এসে গেছে।
প্রশান্ত রায় কোথা থেকে এসে হাজির হলেন ভাস্কর রাহার সামনে। হাত-মুখ নেড়ে বললেন, ‘মিস্টার রাহা, আপনারা কাইন্ডলি যে যাঁর ঘরে চলে যান। বুঝতেই পারছেন, একে এই কনফারেন্স তার ওপরে ‘সুপ্রভাত’ কানেক্টেড। লোকাল থানা ছাড়াও ডিসি-সাউথ আর ডিসি-ডিডি-ওয়ান এসে হাজির হয়েছেন। এছাড়া এসেছেন লালবাজারের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের একজন ইন্সপেক্টর। সঙ্গে আরও লোকজন। এখন নাকি ফোরেনসিক ডিপার্টমেন্টের লোকজন কাজ করবে, ক্যামেরাম্যানরা ছবি তুলবে। ওঁরা বলছেন, কাল সকাল থেকে আপনাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হবে। এখন তাহলে ঘরে চলে যান। প্লিজ—।’
কোনও কথা না বলে ওঁরা চারজন ফিরে চললেন লিফটের দিকে।
উৎপলেন্দু লক্ষ করলেন, খুব তাড়াতাড়ি ভিড় ফিকে হতে শুরু করেছে।
লিফটের কাছে অনেকের সঙ্গে দেখা হল। প্রেমময় চৌধুরি, রঞ্জন দেবনাথ, সুজন সরকার, অনামিকা সেনগুপ্ত, কল্পনা সেন। রঞ্জন ছাড়া বাকি সকলেই নিজেদের মধ্যে উত্তেজিত আলোচনা করছিলেন। শুধু রঞ্জন চুপচাপ।
ভাস্কর রাহাকে দেখেই কল্পনা সেন জিগ্যেস করলেন, ‘ভাস্করবাবু, কাল থেকে সেমিনারের কী হবে?’
রাহা বিষণ্ণভাবে জবাব দিলেন, ‘কী জানি। কাল সকালেই হয়তো অরগানাইজাররা জানিয়ে দেবে। এমন একটা বিশ্রী ব্যাপার—।’
‘মেয়েটা কিন্তু বড্ড বেড়েছিল—।’
অনামিকার আকস্মিক মন্তব্যে চমকে ওর দিকে তাকালেন রাহা। কই, এই মেয়েটার মধ্যে এরকম আবেগ লুকিয়ে আছে এটা তো আগে টের পাওয়া যায়নি!
তিনি শান্ত স্বরে জানতে চাইলেন, ‘বেড়েছিল মানে?’
অনামিকা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল। বোধহয় বুঝতে পারল, এখন এই মন্তব্য করাটা ঠিক হয়নি। কিন্তু তীর হাত থেকে বেরিয়ে গেছে।
‘না, মানে, ক্রাইম ফিকশনের জন্যে মেয়েটা বড্ড বেশি দরদ দেখাত।’
