সদাগরী অফিসে চাকরি করলেও যৌবন বয়েসে অর্জুন দত্ত প্রচুর টিউশানি করত। হয়তো টাকার খুব দরকার ছিল। পরে চাকরি করা এক মহিলার সঙ্গে ওর বিয়ে হয়। বিয়েতে ভাস্কর রাহা আর উৎপলেন্দু সেন গিয়েছিলেন। বোধহয় বিয়ের পরে পরেই অর্জুন টিউশানি করা ছেড়ে দেয়। কিন্তু তারপর থেকেই ওর লেখার পরিমাণ অন্তত তেরোগুণ বেড়ে যায়। সেটা লক্ষ করে একদিনের আড্ডায় ভাস্কর রাহা, জ্যোতিষ্ক সান্যাল, রূপেন মজুমদার ইত্যাদিকে উৎপলেন্দু বলেছিলেন, ‘আসুন মাইরি, আমরা মাসে মাসে চাঁদা তুলে অর্জুন দত্তকে ওর টিউশানির টাকাটা দিয়ে দিই। দিয়ে বলি, তুই আর লিখিস না, বাপ। আমরা যে তোর লেখার বানে ভেসে গেলাম।’
যে যাই বলুক, অর্জুন দত্ত থামেনি। অনুবাদ, ফিচার, গল্প, উপন্যাস, পাজল, কুইজ—যখন যে-ফরমায়েশ এসেছে লিখে গেছে। সে জানে, লিখে খ্যাতি আসেনি। না আসুক—লেখার তৃপ্তি তো আছে। লেখা ছেড়ে দিলে অর্জুন আর কী নিয়ে থাকবে! সবাইকে তো আর নিজের দুঃখের কথা বলা যায় না। বলা যায় না ব্যক্তিগত সমস্যার কথা। ওর স্ত্রী মনিকা চাকরি আর ঠাকুর-দেবতা নিয়ে আছে। আর অর্জুনের আছে চাকরি আর লেখা। ওদের দুজনের মাঝে ভয়ঙ্কর এক ফাঁক। অর্জুন জানে, সেই ফাঁক আর ভরাট হবে না।
অনির্বাণের চোখমুখ দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছিল যে, ও কিছু বলার জন্য ছটফট করছে। অর্জুন দত্তকে ও মানুষ হিসেবে পছন্দ করে। তবে লেখক হিসেবে মোটেই সম্ভাবনাময় বলে ভাবে না। পত্রিকার বহু আসন্ন মুহূর্তে অর্জুন দত্ত প্রায় যে-কোনও বিষয়ে যে-কোনও ধরনের লেখা যোগান দিয়েছে। সেই সার্ভিসটাকে অনির্বাণ কখনও অস্বীকার করে না। তাই ভেতরে-ভেতরে অনেক কিছু বলার জন্য ছটফট করলেও অর্জুনকে ও প্রথমে কথা বলতে দিয়েছে। এবার ওর পালা। তিনজনেই ওর দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করছে।
‘আগামীকাল সেমিনারে আমার বলার কথা আছে সে তো জানেন। বিষয় হল, আধুনিক রহস্য সাহিত্য। ব্যাপারটা আমার কাছে বেশ ঝামেলার বলে মনে হচ্ছিল। তাই ঘরে বসে বক্তৃতার পয়েন্টসগুলো ঠিকঠাক করে নিচ্ছিলাম। তখনই শব্দটা শুনতে পেলাম। তো জানলা দিয়ে একবার উঁকি মেরেই ছুটে নীচে গেলাম। গিয়ে দেখি ভাস্করদার গাড়ির ছাদের একপাশটা তুবড়ে গেছে। গাড়ির গায়ে রক্ত। আর তার পাশেই বাঁধানো চত্বরে পড়ে আছে দেবারতি মানি। মুখটা একেবারে থেঁতলে গুঁড়িয়ে গেছে। চেনা যাচ্ছে না।’
‘তুমি তাহলে বুঝলে কী করে যে, ইয়ে…মানে…ওটাই দেবারতি?’ উৎপলেন্দু যুক্তি চেয়ে নিঃসন্দেহ হতে চাইলেন। যতটা দুঃখ পাওয়া উচিত ঠিক ততটা দুঃখ কি উৎপলেন্দু অনুভব করতে পারছেন?
‘বুঝতে পারলাম ওর সেই হলদে টি-শার্টটা দেখে। কাল কনফারেন্সে যেটা পরে ছিল। ওই যে বুকের কাছটায় লেখা, এক কাপ…।’
অনির্বাণকে বাধা দিয়ে ভাস্কর রাহা বললেন, ‘বুঝেছি। আজ সন্ধেবেলা এই টি-শার্টটা পরেই ওকে হোটেলের লবিতে ঘুরতে দেখেছি।’
‘তারপর কী হল?’
‘সেখানে তখন ম্যানেজার প্রশান্তবাবু সমেত বেয়ারা বাবুর্চি অনেকেরই ভিড় জমে গেছে। ডেডবডিটা ওরা প্রথমটায় চিনতে পারেনি। তখন আমিই দেবারতির কথা বললাম। প্রশান্তবাবু তাড়াতাড়ি রিসেপশন কাউন্টারে গিয়ে খাতা-টাতা কী সব দেখে এলেন। তারপর তিনজন লোককে ডেকে নিয়ে লিফটের দিকে এগোলেন। কী ভেবে আমিও ওঁদের সঙ্গে গেলাম। ওঁরা চারতলায় উঠে দেবারতির ঘরের কাছে গেলেন। তারপর প্রশান্তবাবু কলিংবেল বাজালেন বারবার। কোনও সাড়া নেই। তখন দরজায় ধাক্কা দিলেন। তারপর দরজার নব ঘুরিয়ে চাপ দিয়ে দরজা খোলার অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু লাভ হল না। নিজেরা কিছুক্ষণ আলোচনা করে তারপর ধাক্কা মেরে দরজা ভেঙে ফেললেন। আমাদের সবাইকে বাইরে দাঁড়াতে বলে একজন লোককে সঙ্গে করে প্রশান্তবাবু ঘরে ঢুকে তন্নতন্ন করে সব জায়গা খুঁজলেন। খাটের নীচ, আলমারির পেছন, বাথরুম—কোনও জায়গা বাদ দিলেন না। কিন্তু ঘরে কেউ নেই। শুধু পশ্চিম দিকের জানলাটা হাট করে খোলা। আর জানলার কাছেই একটা গোল টেবিল—টেবিলে কাগজপত্র, বই, পেন এইসব…
‘ঘর থেকে বেরিয়ে প্রশান্ত রায় বললেন, ”যা ভেবেছি তাই—সুইসাইড। ঘরে কেউ নেই। আর ঘরের দরজা ভেতর থেকে লক করা ছিল। স্যাড বিজনেস।” ঘরের ভাঙা দরজার কাছে দুজন লোককে মাতায়েন করে প্রশান্তবাবু তখন নীচে চলে আসেন। রিসেপশন থেকে থানায় ফোন করে খবর দেন। তারপর ভাস্করদাকে খবর দিতে যান। আমি আবার নীচে গিয়েছিলাম দেবারতির ডেড বডি দেখতে। সত্যিই খুব স্যাড ব্যাপার। আমি ওপরে এসে অর্জুনদাকে সব বললাম। তারপর আপনাকে খবর দেবার জন্যে এসেছি।’
একদমে অনেকক্ষণ কথা বলে অনির্বাণ থামল। এপাশ-ওপাশ তাকিয়ে একটা খালি সোফায় অবসন্নের মতো বসে পড়ল।
ভাস্কর রাহা চুরুটে শেষ টান দিলেন। ধোঁয়ার স্বাদটা কেমন তেতো হয়ে গেছে। ‘সিরাজ’-এর এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার তাহলে ব্যাপারটা সুইসাইড ভাবছেন! কিন্তু তিনি তো নিশ্চিত যে, দেবারতি আত্মহত্যা করেনি—করতে পারে না। গম্ভীর চাপা স্বরে তিনি বললেন, ‘উৎপল, চলুন, হতভাগা মেয়েটাকে একবার দেখে আসি।’ তাঁর বুকের ভেতরে কেমন এক কষ্ট হচ্ছিল : ‘এত হাসিখুশি, প্রাণবন্ত উচ্ছল ছিল মেয়েটা…’
