কিন্তু রাহার সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে কোনও ত্রুটি তো হয়নি—শুধু একটু আগের ওই শব্দটুকু ছাড়া!
‘এক্সট্রিমলি সরি, মিস্টার রাহা,’ ভাস্কর রাহাকে লক্ষ করে প্রশান্ত রায় বললেন, ‘আপনার গাড়ির নম্বর কি ডব্লিউ এন ডব্লিউ ওয়ান থ্রি ফাইভ নাইন?’
‘হ্যাঁ, কেন?’ নিভে যাওয়া চুরুটটাকে দু-আঙুলে ঘোরাতে লাগলেন রাহা।
‘খুব আনফরচুনেট।’ ইতস্তত করে প্রশান্ত রায় বললেন, ‘আপনার গাড়িটা একটা অ্যাকসিডেন্টে জখম হয়েছে।’
ভাস্কর রাহা হাসলেন : ‘ও, এই ব্যাপার! আপনার কোনও চিন্তা নেই। আমার অ্যামবাসাডর গাড়িটার নিয়মিত জখম হওয়া দিব্যি অভ্যেস আছে।’ একটু থেমে বললেন, ‘তা কোথায় চোট লাগল। সামনে, পেছনে, না পাশে?’
আবার ইতস্তত করলেন প্রশান্ত রায়। শুকনো মুখে বললেন, ‘সামনে, পেছনে, বা পাশে নয়। আপনার গাড়ির ছাদটা জখম হয়েছে।’
ভাস্কর রাহার হাসি মিলিয়ে গেল এই উত্তরে। উৎপলেন্দু সেনও বেশ অবাক হলেন। প্রশান্ত রায় কি এখন জল-পুলিশের আন্ডারে? ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে সেই চিহ্নই খুঁজলেন উৎপল।
ভাস্কর রাহা ঘরের সিলিংয়ের দিকে তাকালেন। তারপর ঠাট্টা করার চেষ্টা করে বললেন, ‘তাহলে কি বাজ পড়েছে?’
‘বিনা মেঘে বজ্রপাত—’ উৎপলেন্দু অস্ফুট স্বরে মন্তব্য করলেন।
প্রশান্ত রায় রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক দুই বুদ্ধিজীবীকে পর্যায়ক্রমে দেখলেন। তারপর ঠান্ডা গলায় উত্তর দিলেন, ‘না বাজ নয়। আমাদের হোটেলের চারতলা থেকে একজন মেয়ে পড়েছে। হোটেল রেজিস্টারের রেকর্ড অনুযায়ী মেয়েটির নাম দেবারতি মানি—আপনাদের কনফারেন্সের একজন গেস্ট। আমরা থানায় খবর দিয়েছি। পুলিশ এখুনি এসে পড়বে।’
কথা শেষ করে এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার আর দাঁড়াননি। ব্যস্ত পায়ে চলে গেছেন সিঁড়ির দিকে।
দেবারতি টপ সিক্রেট তাহলে সিক্রেটই থেকে গেল! ভাবলেন ভাস্কর রাহা। তারপর উৎপলেন্দুকে বললেন, ‘দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন।’
উৎপল বসলেন একটা সোফায়। ভাস্কর চুরুট ধরালেন। তারপর অ্যাশট্রেটা হাতে নিয়ে বসে পড়লেন বিছানায়। বিষণ্ণভাবে ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘দেবারতি কী একটা সিক্রেট জানতে পেরেছিল। বলেছিল, সেটা জানাজানি হলে নাকি এই কনফারেন্স পন্ড হয়ে যাবে। দেখুন, নিয়তির কী অদ্ভুত পরিহাস! মেয়েটা নিজে মারা গিয়ে কনফারেন্স পন্ড করল।’
নীচের কথাবার্তা, চাপা হইচই, ঘরে বসেই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তা ছাড়া করিডর ও সিঁড়িতে ব্যস্ত পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে ঘন ঘন।
‘মেয়েটা আত্মহত্যা করেনি তো?’ উৎপলেন্দু গলা নামিয়ে জিগ্যেস করলেন।
‘আত্মহত্যা! দেবারতি! অসম্ভব!’ তিনটে শব্দে নিজের মতামত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়ে চুরুটে গভীর টান দিলেন রাহা।
যে-মেয়েটার আর এক নাম জীবন, সে করবে আত্মহত্যা! তা ছাড়া ওর বেঁচে থাকার আরও একটা জোরালো কারণ ছিল : গোপন রহস্য ফাঁস। গল্প-উপন্যাসে বহু খুন এবং খুনের সমাধান নিয়ে লিখেছেন ভাস্কর। কিন্তু বাস্তবে কখনও খুনের এত কাছাকাছি আসেননি। গল্পের খুন হয় লেখকের ইচ্ছেয়, খুনিও চলে লেখকের মরজি মতো। কিন্তু বাস্তবে?
‘ভাস্করবাবু, ব্যাপারটা অ্যাকসিডেন্ট নয় তো?’ উৎপলেন্দু মনে-মনে বুঝতে পারছেন সবই, কিন্তু তা সত্ত্বেও ভাবের ঘরে চুরি করছেন দীর্ঘদিনের অভ্যাসবশে।
দেবারতিকে ঘিরে এই দু-দিনের ঘটনাগুলো ভাবছিলেন ভাস্কর রাহা। মাত্র দুটো দিন। তবু মনে হয় যেন কত দিন!
উৎপলের প্রশ্নের উত্তর দিলেন একটু দেরি করে। বললেন, ‘অ্যাকসিডেন্ট কেমন করে হবে?’
ঠিক তখনই দরজায় কেউ নক করল।
পুলিশ কি এরই মধ্যে এসে পড়ল? ভাস্কর রাহা গলা তুলে বললেন, ‘দরজা খোলা আছে। ভেতরে আসুন।’
নব ঘুরিয়ে দরজা খুলে ঘরে ঢুকল অর্জুন দত্ত আর অনির্বাণ ঘোষ। অর্জুনের চোখেমুখে ভয় ও আশঙ্কা। আর অনির্বাণের মুখে চাপা উত্তেজনা।
অনির্বাণ ঘোষের বয়স পঁয়তিরিশ-ছত্রিশ। পরনে আধুনিক কাটের শার্ট-প্যান্ট। ও ‘ছায়াময়’ পত্রিকার সম্পাদক। সম্পাদক হিসেবে যত না সুনাম, তার চেয়ে বেশি সুনাম ভদ্রলোক হিসেবে। সম্ভাবনাময় শক্তিমান লেখকদের উৎসাহ দিতে ওর জুড়ি নেই। বিক্রির হিসেবে ‘ছায়াময়’-এর জায়গা ‘ভয়ংকর’-এর পরেই। তাতে অনির্বাণের কোনও আক্ষেপ নেই। কারণ প্রেমময় চৌধুরিকে ও ভীষণ শ্রদ্ধা করে।
অর্জুন দত্তের হাতে সিগারেট ছিল। সেটায় শেষ টান দিয়ে সে ভাস্কর রাহার পাশে গিয়ে বসে পড়ল। সিগারেটের টুকরোটা ঝুঁকে পড়ে ফেলে দিল অ্যাশট্রেতে। তারপর বিপদে পড়া মানুষের আর্ত গলায় বলল, ‘ভাস্করদা, দেবারতি মানি বোধহয় আত্মহত্যা করেছে।’
ভাস্কর রাহা ও উৎপলেন্দু সেন অবাক হয়ে তাকালেন অর্জুনের দিকে।
অর্জুন একটু দম নিয়ে বলল, ‘বিশ্বাস করুন, সত্যি বলছি। আমি তো ঘুমোচ্ছিলাম। হঠাৎ ঘুম ভেঙে শুনি দরজায় কেউ কলিংবেল বাজাচ্ছে। দরজা খুলেই দেখি অনির্বাণ। ও-ই আমাকে দেবারতি মানির ইয়ের…খবরটা…দিল। তারপর চলে গেল নীচে।’ একটু থামল অর্জুন। তারপর : মিনিট কুড়ি পরে ও ঘোরাঘুরি করে সব খবর এনে আমাকে দিল। কী হয়েছে জিগ্যেস করুন ওকে—’ অনির্বাণের দিকে আঙুল দেখাল অর্জুন।
‘ছায়াময়’ পত্রিকার নিয়মিত লেখক অর্জুন দত্ত। পত্রিকার বয়েস প্রায় ষোলো, কিন্তু এই ষোলো বছরে কোনও সংখ্যাতেই অর্জুনের লেখা বাদ পড়েনি। কফি হাউসের আড্ডায় শোনা যায় অর্জুন নাকি ‘ছায়াময়’-এর মালিক ভবতারণ পোদ্দারের মেয়েকে পড়াত। সেই সূত্রেই নাকি ষোলো বছর আগে পত্রিকার সূচিপত্রে নাম ঢুকেছে। তারপর ফরমায়েশি লেখা যোগান দেবার গুণে তার নামটা সূচিপত্রে স্থায়ী হয়ে গেছে।
