ততক্ষণে গোলাপ কলোনীর গল্প আবার শুরু হয়ে গেছে পরদায়।
চার
দুর্ঘটনাটা ঘটে গেল রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ।
হোটেল ‘সিরাজ’-এর রেস্তরাঁর জগঝম্প মিউজিক ছাপিয়েও শোনা গেল শব্দটা। বিশেষ করে হোটেলের বাইরের দিকে পশ্চিমমুখো ঘরে যাঁরা ছিলেন তাঁরা প্রায় সকলেই শুনতে পেলেন। যাঁরা এই অল্প রাতেই ঘুমে ঢলে পড়েছেন, তাঁরা দুর্ঘটনার মাহেন্দ্রক্ষণটি জানতে পারলেন না। তাঁরা জানতে পারলেন না, সংঘর্ষের শব্দ কী বিশ্রী শোনায়।
প্রচণ্ড তীব্র অথচ ভোঁতা শব্দটা তিনতলার ঘরে বসেই শুনতে পেলেন ভাস্কর রাহা। ওয়ার্কশপের জন্য একটা গল্প লিখতে বসেছিলেন। গোটা চারেক পৃষ্ঠা কাটাছেঁড়া করে কোনওরকমে একটা গল্পের শুরুটা খাড়া করেছেন। সেটা পড়ে মন্দ লাগছে না। লেখালিখির ব্যাপারে ভীষণ খুঁতখুঁতে তিনি। এটাই বোধহয় তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি।
সম্মেলনের জন্য একটা বিমূর্ত গল্প লিখছেন তিনি। কখনও কখনও সাদামাঠা গোয়েন্দা বা রহস্য কাহিনী লেখেন বটে, তবে লিখে তৃপ্তি পান দুর্বোধ্য, জটিল, বিমূর্ত রহস্য গল্প। এ যেন পাঠকের সঙ্গে তাঁর লুকোচুরি খেলা, বুদ্ধির খেলা। তাঁর গল্প পড়াটা এখন পাঠক সমাজে এক ফ্যাশান।
লিখতে বসলেই তাঁর মনে পড়ে যায় ছোট ছেলে লালটুর কথা। লালটু প্রায় দশবছর হল চাকরি নিয়ে আমেদাবাদে। বছর তিরিশ আগে, তাঁর লেখালিখির শিক্ষানবিশীর সময় ভাস্কর রাহা নিয়মিতভাবে বিদেশি গল্প অনুবাদ যেমন করেছেন, তেমনি সেগুলো অবলম্বন করে, সেগুলোর বিষয় ও ভঙ্গিতে অনুপ্রাণিত হয়ে ‘নিজস্ব’ গল্পও কম লেখেননি। এতে তাঁর কোনও লজ্জা নেই। কারণ, পাঁচকড়ি দে-র প্রথম লেখা ‘সতী-শোভনা’-ও বিদেশি গল্প অবলম্বনে লেখা। তা ছাড়া, রাহার বরাবরের লক্ষ্য ছিল ভালো লেখা। শুধু প্লট আত্মসাৎ করেই ভালো লেখা যায় না।
যখন তিনি বাঁ দিকে বিদেশি বই রেখে মনোযোগ দিয়ে লিখতেন, তখন ‘লেখক’ পিতার একান্ত অনুগত পুত্র লালটু এসে চুপটি করে বসে থাকত তাঁর কাছে। হঠাৎই একদিন সেই বালক তাঁকে প্রশ্ন করেছিল, ‘বাবা তুমি সবসময় বই দেখে দেখে লেখো কেন?’
ভাস্কর রাহা কোনও উত্তর দিতেও পারেননি।
লিখতে-লিখতে এসব কথাই ভাবছিলেন, আর তখনই শুনতে পেলেন শব্দটা।
প্রথমটা সামান্য চমকে উঠেছিলেন। কাগজের ওপরে কলম কেঁপে উঠেছিল। কারণ ভেবেছিলেন, ঘটনা হয়তো অসামান্য। কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ উৎকর্ণ হয়ে থেকেও তখন স্বাভাবিক কিংবা অস্বাভাবিক আর কোনও শব্দ কানে এল না, তখন আবার মন দিয়েছেন লেখায়। খেয়াল করেননি, হাতের চুরুট কখন নিভে গেছে।
একটু পরেই নীচ থেকে কয়েকজনের কথাবার্তার শব্দ শোনা গেল। তারপর, ক্রমে-ক্রমে, সেটা ছোটখাটো হইচইয়ে দাঁড়াল।
কলম থামালেন ভাস্কর রাহা। মোটা ফ্রেমের চশমাটা চোখ থেকে নামালেন। বিস্তৃত কপালে হাত ঘষলেন একবার। তারপর হাত চালালেন মাথার চুলে। লম্বা ধবধবে সাদা অথবা রুপোলি চুল। সিলভার ব্লন্ড যাকে বলা যায়। কিছুদিন আগেও তাঁর চুলে জাতীয় পতাকার মতো তিন-তিনটে রং খেলা করত : সাদা, লাল আর কালো। এর মধ্যে দুটো রঙের কারণ তাঁর জানা ছিল। সাদা : বয়েসের জন্য। কালো : কলপের জন্য। কিন্তু লাল? সে কি বয়েস আর কলপের দ্বৈত প্রভাব? জীবনের সাদা-কালো রং—সুখ-দুঃখ—সকলেই সহজে বুঝতে পারে। কিন্তু এমন কিছু রং জীবনে থেকে যায়—এমন কিছু অনুভূতি—যা ঠিকঠাক ব্যাখ্যা করা যায় না। তাঁর চুলের ওই লাল রঙের মতো।
এখন তাঁর শুধু সাদামাঠা জীবন। তাতে আর কোনও রং নেই।
নীচ থেকে ভেসে আসা হইচইটা যেহেতু বাড়ছিল সেহেতু লেখার টেবিল ছেড়ে উঠে পড়লেন ভাস্কর রাহা। পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলেন পশ্চিমের জানলার কাছে। বড় মাপের ফ্রেঞ্চ উইন্ডো। নক্ষত্রখচিত হোটেলে যেমন হয়। জানলার পাল্লা খোলাই ছিল। তিনি ঝুঁকে পড়ে দেখার চেষ্টা করলেন। কিন্তু পাঁচ-সাতজন মানুষের জটলা ছাড়া অস্বাভাবিক আর কিছু দেখতে পেলেন না। কারণ কার্নিশে তাঁর নজর কিছুটা বাধা পাচ্ছিল।
হোটেলের বাইরের রাস্তা নির্জন, হোটেলের শান বাঁধানো টেরাস নির্জন, আর পাম গাছগুলোকেও বড় নিঃসঙ্গ নির্জন বলে মনে হল। তাহলে শব্দটা কিসের?
এমন সময় তাঁর ঘরের কলিংবেল বেজে উঠল।
তাড়াতাড়ি গিয়ে দরজা খুললেন তিনি।
দরজায় দাঁড়িয়ে উৎপলেন্দু সেন। ফরসা মুখ সামান্য লালচে। পরনে পাজামা আর হাওয়াই শার্ট। চশমার পুরু কাচের মধ্যে দিয়ে চোখ দুটো বেশ ছোট দেখাচ্ছে।
‘কী ব্যাপার, উৎপল? এত রাতে?’ ওঁকে ভেতরে ডাকলেন রাহা, ‘আসুন, ভেতরে আসুন—’
উৎপলেন্দু ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়ালেন। চাপা গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘নীচে কী একটা গোলমাল হয়েছে শুনেছেন?’
ভাস্কর রাহা উৎপলেন্দুকে ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলেন। এখন রাত প্রায় পৌনে বারোটা। সুতরাং উৎপলেন্দু এখন পুরোপুরি স্থলপথের বাসিন্দা নন। কিন্তু রঙিন জলপথে তিনি কতটা ডুবে আছেন সেটাই আঁচ করতে চেষ্টা করলেন রাহা।
‘হ্যাঁ, খানিক আগে একটা শব্দ শুনলাম মনে হল।’ রাহা বললেন।
‘আমি একটা পুরোনো লেখা নতুন করে মকশো করছিলাম, হঠাৎই যেন—।’
ঘরের খোলা দরজায় এসে দাঁড়ালেন ‘সিরাজ’-এর এক্সিকিউটিভ ম্যানেজার প্রশান্ত রায়। সম্মেলনের শুরুতেই তাঁর সঙ্গে আমন্ত্রিত অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, সতেরো জন অতিথির সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কোনওরকম অসুবিধে হলে তাঁরা যেন তৎক্ষণাৎ প্রশান্ত রায়কে খবর দেন।
