‘আমার কথা সবই তো তুমি জানো। নতুন আর কী বলব—।’
‘তবুও—।’
এমন সময় কোথা থেকে যেন প্রেমময় চৌধুরি এসে উদয় হলেন। কোনওরকম ভণিতা না করেই বেশ উঁচু গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘এই, দেবারতি, তুমি নাকি কী একটা টপ সিক্রেট জানতে পেরেছ?’
দেবারতি ঘুরে দাঁড়িয়ে বিরক্ত হয়ে তাকাল প্রেমময়ের দিকে। লোকটা ওকে হাটের মাঝে অপ্রস্তুত করতে চায়?
ভাস্কর রাহা ভয় পেলেন। মেয়েটা খেপে গিয়ে সাঙ্ঘাতিক কিছু না বলে বসে।
‘হ্যাঁ, জানতে পেরেছি। সো হোয়াট?’
‘না, মানে, আমরা সিক্রেটটা জানতে পারব না?’
‘সময় হলেই জানতে পারবেন। একটু ধৈর্য ধরুন।’ তারপরই কী ভেবে দুষ্টুমি চোখে মেয়েটা বলল, ‘একটু হিন্টস দিতে পারি—।’
সর্বনাশ। ভাস্কর রাহা প্রমাদ গুনলেন। মেয়েটা যে যা-হোক-একটা সিক্রেট জেনেছে, এ-কথা দেখছি একেবারেই সিক্রেট থাকবে না। তিনি দেবারতিকে বাধা দেবার জন্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই বেপরোয়া প্রগলভা মেয়েটা মুখ খুলল।
‘পাঁচকড়ি দে আর এডগার ওয়ালেস।’
তার মানে! ভাস্কর রাহা অবাক হলেন। সিক্রেটের হিন্টস পাঁচকড়ি দে আর এডগার ওয়ালেস! একজন উনিশ শতকের বাঙালি ডিটেকটিভ কাহিনী লেখক। কোনান ডয়েল-এর ‘দ্য সাইন অফ ফোর’ কাহিনী অনুবাদ করে প্রথম বাঙালি পাঠকের কাছে শার্লক হোমসকে হাজির করেন। আর দ্বিতীয়জন ১৮৭৫ সালে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ লেখক। দুজনের মধ্যে মিল আছে —দুজনেই ক্রাইম কাহিনীর লেখক এবং যথেষ্ট সফল ও জনপ্রিয় ছিলেন।
ভাস্কর রাহা খালি চায়ের কাপ নামিয়ে রাখলেন পাশের টেবিলে। বিস্মিত চোখে দেবারতি মানির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
প্রেমময় চৌধুরি কেমন আমতা-আমতা করে সরে গেলেন।
জ্যোতিষ্ক সান্যাল ভাস্কর রাহার স্নেহভাজন। বয়েস তাঁর পঞ্চাশ পেরোলেও ভাস্কর রাহার চোখে ‘ছোট ভাই’। প্রশ্রয় যেমন দেন, প্রয়োজন হলে বকুনিও ততটাই। জ্যোতিষ্ক খুব সৎ আর পরিশ্রমী। আজকের যুগে যে-দুটো গুণ মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজতে হয়। তাই রাহা ওকে পছন্দ করেন।
জ্যোতিষ্ক ভাস্কর রাহার কাছে এসে চাপা গলায় জিগ্যেস করলেন, ‘এই পাঁচকড়ি দে আর এডগার ওয়ালেস পাবলিক দুটো কে বলুন তো?’
ভাস্কর রাহার দু-চোখে তিরস্কারের অভিব্যক্তি। জ্যোতিষ্কের দিকে হতাশভাবে তাকিয়ে ঠোঁট থেকে চুরুট নামিয়ে নিলেন। বললেন, ‘তুই কি কোনও দিনই বইটইয়ের পাতা ওলটাবি না!’
অনামিকার কান বেশ প্রখর। ও সাততাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘ওমা, এঁদের নাম জানেন না! একজন তো…।’
মাইকে ঘোষণা করা হল, সিনেমা আবার শুরু হচ্ছে।
চুরুট নিভিয়ে দিয়ে রাহা সেদিকে এগোলেন। পিছনে অনামিকা আর জ্যোতিষ্কের কথাবার্তা অস্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে। দেবারতি আবার তাঁর পাশে এসে বলে গেল, ‘মুকুটহীন সম্রাট, ভুলবেন না যেন—লাঞ্চের সময়—।’
রাহা হেসে মাথা হেলিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, মনে আছে।
ঠিক তখনই রঞ্জন দেবনাথ এসে দেবারতিকে ইশারায় ডেকে নিয়ে চলে গেল এলিভেটরের দিকে। ওরা বোধহয় নির্জনতা খুঁজছে।
বলরুমে ঢুকে নির্দিষ্ট চেয়ারের দিকে যাবার সময় রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল ভাস্কর রাহার।
‘কী মিসেস মুখার্জি, এখন নতুন কী লিখছেন?’
‘আমার আর লেখালিখি! ওই ওয়ার্কশপের গল্পটাই এখন লেখার চেষ্টা করছি। বয়েস হয়ে গেছে, এত ধকল আর সয় না।’
কী সুন্দর করে কথা বলেন রত্নাবলী! এত যশ আর খ্যাতি—অথচ তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে অহঙ্কার সেভাবে বাড়তে পারেনি। ওঁর ব্যবহার এত নরম আর মিষ্টি! অথচ লেখেন যখন তখন ঝকঝকে স্মার্ট গদ্য। লেখায় বলতে গেলে কোনও বাড়তি শব্দ থাকে না। অবশ্য দেড়-দু-বছর ধরে ওঁর লেখার ধার কিছুটা শিথিল হয়ে এসেছে। সেটা হয়তো বয়েসের জন্য।
‘দেবারতির ইন্টারভিউ দিয়েছেন?’
একটু গম্ভীর হয়ে গেলেন রত্নাবলী। বললেন, ”সুপ্রভাত”-এর ওই জার্নালিস্ট মেয়েটি তো! হ্যাঁ, একটু আগে আমাকে বলেছে। ওকে বলেছি, সাতটার সময় আমার ঘরে আসতে। ও তো ঠিক আমার নীচের ঘরটাতেই থাকে।’ একটু থেমে বললেন, ‘মেয়েটা বেশ স্মার্ট। ওর একটা ফিচার পড়েছিলাম—মন্দ লেখেনি। ‘আপনি ইন্টারভিউ দিয়েছেন?’
‘না। বলেছি লাঞ্চ আওয়ারে কথা বলব।’
‘সারাদিন কনফারেন্সের এই ধকলের পর সন্ধেবেলাটা একটু বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে করে। কাল ভাবছি একবার বাড়ি থেকে ঘুরে আসব। একজন টেলিফিল্ম প্রোডিউসারের আসার কথা আছে। তা ছাড়া আমার বৃদ্ধ কর্তাটি একা একা কী করছে সেটাও একবার দেখে আসা দরকার।’ হেসে কথা শেষ করলেন রত্মাবলী।
বলরুমের আলো নিভে গেল। শুধু ঝাড়লন্ঠনের আলো টিমটিম করে জ্বলছে।
রত্নাবলী নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে পড়লেন।
জ্যোতিষ্ক সান্যাল ভাস্কর রাহার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ‘ম্যাডাম ঠিকই বলেছে। পুরুষ মানুষ—চিতায় না ওঠা পর্যন্ত বিশ্বাস নেই।’
অনামিকার কান আবার তার দক্ষতার পরিচয় দিল। ও নীচু গলায় জ্যোতিষ্ককে বলল, ‘সেইজন্যেই তো কোনও পুরুষকে আমি বিশ্বাস করি না।’
জ্যোতিষ্ক ঘাড় ফিরিয়ে তাকালেন অনামিকার দিকে, বললেন, ‘সকালে যে দেখলাম রঞ্জন দেবনাথের সঙ্গে খুব হেসে হেসে গল্প করছিলে!’
‘ওই গল্প পর্যন্তই। আমি সবসময় কেয়ারফুল থাকি।’
আধো-আঁধারিতে অনামিকার মন্তব্যটা ভাস্কর রাহার কানে গেল। তিনি আপনমনেই হাসলেন। রূপেন মজুমদারের মতো অনামিকা সেনগুপ্তও তাহলে ভার্জিন রাইটার হতে চলেছে! সবাই কেন যে বিশেষ্যকে উপেক্ষা করে বিশেষণের ওপরে জোর দেয় কে জানে! কী করে তিনি অনামিকা বা রূপেন মজুমদারকে বোঝাবেন, ভার্জিন থাকার চেয়ে রাইটার হওয়াটা অনেক বেশি জরুরি—অন্তত বাংলা সাহিত্যের পক্ষে।
