‘জানো, নাইনটি ওয়ান আর নাইনটি টু-তে রবীন্দ্র পুরস্কারের লিস্টে ফাইনাল রাউন্ডে রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের ”জীবন যখন ফুরিয়ে যায়” উপন্যাসটা ছিল! তোমার ইচ্ছে করে না, তোমার একটা উপন্যাস ওই পুরস্কারের ফাইনাল লিস্টে যাক—কিংবা পুরস্কার-টুরস্কার পেয়ে যাক?’
চাপা গলায় হেসে উঠল রঞ্জন দেবনাথ : ‘এই ইচ্ছেটা আমার গতবছর থেকে হয়েছে—আগে ছিল না। ওই এগারোটা বছর ধরে টাকার জন্যে আমি পাগলা কুকুরের মতো ঘুরে বেড়িয়েছি।’
‘তোমার লেখাগুলো খুব ইন্টেলিজেন্ট। কিন্তু তাহলেও তার মধ্যে সরলতা আছে, হৃদয়ের ব্যাপারটা আছে। পুরোপুরি সেরিব্রাল নয়, একটু-আধটু কার্ডিয়াক কোয়ালিটিও হ্যাজ—’ খিলখিল করে হাসল দেবারতি।
সিগারেট অ্যাশটেতে ফেলে দিয়ে দেবারতিকে আবার জাপটে ধরল রঞ্জন। বলল, ‘এই মুহূর্তে কিন্তু সেরিব্রাল ব্যাপার একটুও নেই। সবটাই কার্ডিয়াক।’ আচমকা পাগলের মতো চুমু আঁকতে লাগল দেবারতির শরীরে।
‘তুমি আমার বুদ্ধিজীবী শিশু—।’
শিশু তখন দেবারতিতে প্রায় ডুবে গেছে। আজকের সুযোগ সে হারাতে রাজি নয়। অনেক অনেক দিন পর দেবারতি মানিকে সে এইভাবে কাছে পেয়েছে। এই সম্মেলনের দিনগুলোর জন্য কীভাবে যে ওরা উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করে ছিল তা শুধু ওরাই জানে!
সবুজ আলোয় শুরু হয়ে গেল দেবারতি আর রঞ্জনের ব্যস্ত দ্বিতীয় সম্মিলন।
সাড়ে দশটা বাজতেই চায়ের জন্য দশ মিনিটের বিরতি।
সকালের সেশানে ভাস্কর রাহার বক্তৃতা ছিল। তিনি শুনিয়েছেন তাঁর যৌবনকালের নানা ঘটনার কথা। কী কষ্ট করে দিন কাটিয়েছে রহস্য-রোমাঞ্চ পত্রিকাগুলো! লাল নিউজপ্রিন্টে ভাঙা টাইপ আর কাঠের বা জিঙ্কের ব্লক ব্যবহার করে ছেপে এক হাজার কি দু-হাজার কপি কোনওরকমে বিক্রি হত। দারিদ্র্যরেখায় পা ফেলে তারা পথ হাঁটত।
ষাটের দশকের শেষে আর সত্তরের দশকের শুরুতে বাজার ছেয়ে গিয়েছিল পিন আঁটা যৌন পত্রিকায়। সে-সব পত্রিকা বিক্রিও হত রমরম করে। নামী লেখকদের দু-একজন ছাড়া আর প্রায় সবাই লিখেছেন পিন আঁটা ওইসব পত্রিকায়।
তারপর একসময় হোম ডিপার্টমেন্টের নির্দেশে শুরু হয়ে গেল ধরপাকড়। তখন নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বেশিরভাগ মালিক-সম্পাদক চালু করেন রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা পত্রিকা। সেটা ছিল ওঁদের কাছে বেঁচে থাকার লড়াই। আর নড়বড়ে জমিতে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষগুলোকে আঁকড়ে ধরে আশ্রয় খুঁজেছিল তখনকার রহস্য-রোমাঞ্চ লেখকরা। তখনকার অবস্থা, আর এখনকার অবস্থা! এ-যেন বস্তি থেকে মালটি-স্টোরিড বিল্ডিংয়ে রূপান্তর।
ভাস্কর রাহার বক্তৃতার পর শুরু হয়েছে চলচ্চিত্র। সত্যজিৎ রায়ের ‘চিড়িয়াখানা’। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী আর উত্তমকুমারের অভিনয়। তারই মাঝখানে এই-চা পানের বিরতি।
অনামিকা সেনগুপ্তের সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভাস্কর রাহা। চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে ছিলেন আর এক আমন্ত্রিত রহস্য লেখক জ্যোতিষ্ক সান্যাল। অফিসের মিটিংয়ে বাইরে ছিলেন বলে কাল আসতে পারেননি। আজ এসে রেজিস্ট্রেশন করিয়েছেন। জ্যোতিষ্ক নীচু গলায় গল্প করছিলেন ‘কুয়াশা’ প্রকাশনা সংস্থার কর্ণধার কল্পনা সেনের সঙ্গে। সম্প্রতি ‘কুয়াশা’ থেকে জ্যোতিষ্কর একটি অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। জন গ্রিশ্যাম এর ‘টার্মিনেশন’।
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাস্কর রাহা বললেন, ‘শোনো অনামিকা, তোমাকে একটা মজার ঘটনা বলি—।’
অনামিকা চা খায় না। সম্ভবত ফরসা রং ময়লা হয়ে যাবে বলে। ও আগ্রহ নিয়ে তাকাল ভাস্কর রাহার দিকে।
রাহা একটা আধপোড়া চুরুট পকেট থেকে বের করে ধরালেন। তারপর তাতে টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘অনেক আগের কথা। তুমি তখন বোধহয় জন্মাওনি। কবিরঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ”সচিত্র তোমার জীবন” পত্রিকার একটা সংখ্যায় একবার মপাসাঁর একটা গল্প অনুবাদ করেছি। ম্যাগাজিন বেরোনোর পর দপ্তরে গেছি কপি নিতে। কবিরঞ্জনবাবু ছিলেন না। ছিল তাঁর হেড কম্পোজিটার বলাইবাবু। তাঁকে সবিনয়ে বললাম যে, এই সংখ্যায় আমার একটা লেখা আছে—কপি নিতে এসেছি। তিনি জিগ্যেস করলেন, কী লেখা? বললাম, মপাসাঁর একটা গল্প আছে…।’
আবার চায়ের কাপে চুমুক এবং চুরুটে গভীর টান।
‘…তাতে বলাইবাবু কী বলেছিলেন জানো?’
ততক্ষণে জ্যোতিষ্ক সান্যাল আর কল্পনা সেন ভাস্কর রাহার কাছাকাছি এসে গল্প শোনায় মন দিয়েছেন।
‘কী বলেছিলেন?’ আগ্রহের সুরে অনামিকা জানতে চাইল।
ভাস্কর রাহা গম্ভীর স্বরে জবাব দিলেন, ‘বলাইবাবু আমাকে জিগ্যেস করেছিলেন, আপনিই কি মপাসাঁ?’
এ-কথা শুনে সবাই হাসিতে একেবারে ফেটে পড়ল।
হইচই শুনে কখন যেন ওঁদের কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়েছিল দেবারতি মানি। চোখ সামান্য লাল। চোখের কোল বসা। কিন্তু সেজেছে খুব সুন্দর করে। হালকা নীলের ওপরে কালো ফুল বসানো একটা সালোয়ার কামিজ পরেছে। কানে নতুন একজোড়া দুল। কপালে নীল টিপ। ঠোঁটে হালকা লিপগ্লস। চোখে সূক্ষ্ম কাজলরেখা।
ভাস্কর রাহা ওর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কী, আমার রিকোয়েস্ট মনে আছে তো?’
ও হেসে মাথা ঝাঁকাল। হ্যাঁ, মনে আছে। তারপর বলল, ‘আজ লাঞ্চের ফাঁকে আপনার একটা ইন্টারভিউ নেব, ভাস্করদা।’
