রঞ্জন দেবনাথ। পরনে কটসউলের হাওয়াই শার্ট আর জিনস।
‘কী ব্যাপার! এত রাতে!’
দেবারতি মানির বিস্ময়কে আমল দিল না রঞ্জন। হেসে বলল, ‘শুনলাম জনগণের ইন্টারভিউ নিয়ে বেড়াচ্ছ—তাই ভাবলাম ঘরে গিয়েই ইন্টারভিউটা দিয়ে আসি। নইলে আমার মতো খাপছাড়া খামখেয়ালি লেখক…কে আর পাত্তা দেয়…হয়তো বাদই পড়ে যাব।’
রঞ্জনটা ইয়ারকি মারতেও জানে! ভাবল দেবারতি! ও কি জানে না, ওকে দেখলেই দেবারতির বুকের ভেতরটা কেমন করে!
দেবারতি চোখের নমনীয় ইশারায় রঞ্জনকে ভেতরে ডাকল। অস্ফুটে বলল, ‘এসো—।’
রঞ্জন ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। চোখ নাচিয়ে মজা করে বলল, ‘কী দেবারতি মানি, বলো তোমার মিস্ট্রি রাইটারদের নামের লিস্টে অধমের শুভনাম আছে কি না। এগারো বছর লেখালেখি ছেড়ে দিয়ে ”সাধু” হয়ে গিয়েছিলাম বলে কেউ আর পাত্তা-টাত্তা দেয় না, বুঝলে।’
দেবারতি কোনওরকম ভূমিকা ছাড়াই রঞ্জনের খুব কাছে চলে এল। বিড়বিড় করে বলল, ‘বাংলা মিস্ট্রি রাইটারদের মধ্যে তুমিই একমাত্র পুরুষ লেখক। ইউ অলওয়েজ রাইট লাইক আ ম্যান। সত্যিকারের পুরুষের মতো লেখো—।’
রঞ্জন দেবারতিকে জাপটে ধরল দু-হাতে। বলল, ‘শুধু লেখা নয়, সত্যিকারের পুরুষের মতো আমি আরও অনেক কিছু করতে পারি।’
‘জানি।’ একটু থেমে : ‘আমার চেয়ে ভালো আর কে জানে!’
কানাঘুষোয় দেবারতি শুনেছে, রত্নাবলীর সেই শুরুর জীবন থেকেই রঞ্জনের সঙ্গে তাঁর একটা গাঢ় বন্ধুত্বের সম্পর্ক রয়েছে। ইদানিং দেবারতি মানির জন্যেই হয়তো সেই বন্ধুত্ব কিছুটা ফিকে হয়ে এসেছে। রঞ্জন আর রত্নাবলীর অসমবয়েসি বন্ধুত্ব নিয়ে লেখক মহলে, কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের আড্ডায় কম আলোচনা হয় না। কিন্তু আলোচনায় কী যায় আসে! রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় দেবারতির কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। অন্তত এখন।
দেবারতি রঞ্জনের আদর খেতে-খেতেই জিগ্যেস করল, ‘গল্প লেখার কদ্দূর?’
সম্মেলনের শেষ দিন সকালে একটা ওয়ার্কশপ আছে। তখন আমন্ত্রিত লেখকদের একটা করে লেখা পড়ে শোনাতে হবে। সেটা অসম্পূর্ণ লেখা হলেও চলবে। তারপর সেই লেখা নিয়ে চুলচেরা আলোচনা ও বিশ্লেষণ করা হবে।
রঞ্জন ততক্ষণে দেবারতির কানের কাছে মুখ ঘষছিল। ওর জড়ানো স্বর শোনা গেল, ‘টু হেল উইথ ওয়ার্কশপ…ফর গডস সেক, হোল্ড ইয়োর টাঙ অ্যান্ড লেট মি লাভ…।’
আবছায়া সবুজ আলোয় দুটো শরীর এক হয়ে এলোমেলো পা ফেলে এগিয়ে গেল বিছানার কাছে। আচমকা ধসে পড়া জীর্ণ বাড়ির মতোই ওরা পড়ে গেল বিছানায়।
অন্ধের মতো হাতড়ে হাতড়ে কোনওরকমে পোশাক-আশাকগুলো খুলে ফেলল ওরা। তারপর নগ্ন দেবারতিকে দেখে অনেকক্ষণ মুগ্ধ হয়ে রইল রঞ্জন। সবুজ আলোয় অদ্ভুত দেখাচ্ছে ওকে।
‘কী ভাবছ?’ রঞ্জনের গালে, দাড়িতে, আঙুল চালাল দেবারতি।
‘পথের পাঁচালি।’
‘পথের পাঁচালি!’ অবাক হল দেবারতি।
হ্যাঁ! বিভূতিভূষণের কলমে আঁকা সজীব প্রকৃতি। ভার্জিন নেচার। তুমি।’
খিলখিল করে হাসি : ‘আমি ভার্জিন নই—।’
‘ভার্জিনিটি কি শুধু শরীরে থাকে?’
আলো-আঁধারেই পুরুষ-লেখককে দেখল দেবারতি। কী সুন্দর করে কথা বলে রঞ্জন! দেবারতি জানে, শতকরা নিরানব্বইজন পুরুষই ওর শরীরের মধ্যে কৌমার্য খুঁজবে। তারা অনন্তকাল ধরে শুধু খুঁজেই যাবে, কিন্তু পাবে না।
রঞ্জনের আদরে দেবারতি আর গুছিয়ে চিন্তা করতে পারছিল না। নাঃ, লোকটা অন্যরকম করে আদর করতেও জানে!
‘রঞ্জন! রঞ্জন! আমাকে জড়িয়ে ধরো, আরও জোরে।’
আবছা আলোয় ওরা লড়াইয়ে মেতে ওঠে। ঠান্ডা বাতাস ওদের শরীরের তাপ শুষে নিতে পারে না। ওদের মসৃণ ত্বক ভিজে যায় ঘামে।
রঞ্জনকে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে দেবারতি। যেন ওকে ছেড়ে দিলেই ও ছিটকে পড়ে যাবে অতল খাদে। আর রঞ্জন যেন শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে দেবারতিকে। কিন্তু ওর প্রচণ্ড ঝটকাতেও দেবারতির হাতের বাঁধন শিথিল হয় না। ওর মুখ দিয়ে এক অদ্ভুত গোঙানি বেরিয়ে আসে। তুমুল ভূমিকম্পে সবকিছু দুলে যায়, মেঝে কেঁপে ওঠে, আলো ঝাপসা হয়ে যায়।
তারপর…একসময়…সবকিছু আবার সুস্থির হয়। দেবারতির চোখ আবার ফিরে পায় স্বাভাবিক দৃষ্টি। ওর শরীর হালকা লাগে। রঞ্জন পাশ থেকে ওকে জড়িয়ে ধরেছে।
‘দেবারতি, আই লাভ ইউ—।’
‘আই লাভ ইউ টু।’ নরম গলায় বলল দেবারতি, ‘তোমার লেখার মতোই শক্তিশালী তুমি।’
এরপর উঠে বসে ওরা। দেবারতির সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে ধরায় দুজনে। একে অপরের গা ঘেঁষে বসে সিগারেটে আকুল টান দেয়।
দেবারতির মাথা ধরা কোথায় উধাও হয়ে গেছে। এখন আর সহজে ঘুম আসবে না ওর।
রঞ্জনের খোলা পিঠে আলতো নখের আঁচড় কেটে দেবারতি বলল, ‘ইউ আর এ জিনিয়াস। এগারো বছর বনবাসে থাকা তোমার ঠিক হয়নি। তুমি জানো কী করে রহস্য গল্প লিখতে হয়।’
সিগারেটে গভীর টান দিয়ে বিছানায় আধশোয়া হয়ে শুয়ে পড়ল রঞ্জন দেবনাথ, বলল, ‘দেবী, তুমি জানো না একটা সময়ে আমাকে টাকার জন্যে কী লড়াই করতে হয়েছে! একগাদা ছোট ছোট ভাই বোন রেখে বাবা মারা গেলেন। আমি তখন সবে একটা ফার্টিলাইজার কোম্পানির মার্কেটিং-এ ঢুকেছি। তখন থেকেই লেখালিখির চেষ্টা করেছি। লেখা ছাপতে প্রাণ বেরিয়ে গেছে। তারপর… তারপর হঠাৎ করেই অভাবের গল্পটা ঘুরে গেছে…।’
