কিছুক্ষণ সময় নিয়ে উৎপলেন্দু সেন হয়তো ধৈর্য ও সংযম ফিরিয়ে নিয়ে এলেন। তারপর ব্যঙ্গের হাসি হেসে পালটা জবাব দিলেন, ‘কী করে জানলেন হয়নি?’
দেবারতি মানি উৎপলের কথায় একটুও আমল না দিয়ে বলল, ‘এ-বছরটা কিসের বছর বলুন তো?’
উৎপলেন্দু খানিকটা বিস্মিত হলেন। চুপ করে থেকে বুঝতে চাইলেন, এর পরের আঘাতটা কোন দিক থেকে আসবে।
ওঁকে চুপ করে থাকতে দেখে আবার খিলখিল করে হেসে উঠল দেবারতি। হাসতে-হাসতেই বলল, ‘ও মা! তাও জানেন না! প্রতিবন্ধী বর্ষ।’
‘তাতে কী হয়েছে?’
গ্লাসে চুমুক এবং উচ্ছৃঙ্খল হাসির পর : ‘আই থিঙ্ক ইউ আর ওয়ান, মিস্টার সেন। যৌন প্রতিবন্ধী—।’
উৎপলেন্দু আর সইতে পারেননি। তাঁর ওপরের ভদ্রতার পোশাক খসে পড়ল। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে অভিনেতার ঢঙে শব্দ করে হেসে বলেছেন, ‘যদি সাহস থাকে তাহলে পরীক্ষা প্রার্থনীয়, মিস মানি।’ মাথার ভেতরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। অপমানের আগুন। দাঁতে দাঁত চেপে বাঁকা হেসে তিনি আরও যোগ করলেন, ‘গ্যারান্টি দিচ্ছি, আনন্দ পাবেন।’
আশ্চর্য! দো-আঁশলা মেয়েটা এ-কথায় এতটুকু বিব্রত হল না। বরং বিদ্রোহের হাসি হেসে বলল, ‘আপনাদের মতো হিপোক্রিটদের কথার কী দাম আছে! পরীক্ষার সময়ে হয়তো ভয়ে পিছিয়ে যাবেন—।’
উৎপলেন্দু কিছু বলে ওঠার আগেই দরজায় কলিংবেলের শব্দ।
দেবারতি চট করে উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে।
খানিকটা বেসামাল পায়ে দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন উৎপলেন্দু সেন।
অধ্যাপক অনিমেষ চৌধুরি।
পরনে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর পাজামা। ভুঁড়ির ওপরে গেঞ্জিটা খানিকটা তুলে পাজামার দড়িটা টেনে ধরে আছেন ভদ্রলোক। উৎপলেন্দুর দিকে কাঁচুমাচু মুখে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘উৎপলেন্দুবাবু, আপনার কাছে একটা কাঁচি হবে?’
‘কাঁচি! কাঁচি দিয়ে কী করবেন?’
‘দেখুন না, পাজামার দড়িটায় একটা গেঁট পড়ে গেছে।’
ঠিক সেই মুহূর্তে উৎপলেন্দুকে পাশ কাটিয়ে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এল দেবারতি মানি।
অনিমেষ চৌধুরি ওকে দেখে যেন বোবা হয়ে গেলেন। একবার উৎপলের দিকে, আর একবার দেবারতির দিকে দেখতে লাগলেন। তারপর উৎপলের দশাসই শরীরের পাশ দিয়ে ঘরের ভেতরটায় একবার উঁকি মারার চেষ্টা করলেন।
দেবারতি অধ্যাপকের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে হাত নাড়ল। বলল, ‘হাই, প্রফেসর—!’
তারপর হোটেলের করিডর ধরে হাঁটা দিল। সালোয়ার কামিজ পরার ফলে ওর শরীরের রেখাগুলো জোরালো আলোয় বড় চোখে লাগছিল। অধ্যাপক সেদিকে হাঁ করে চেয়ে রইলেন।
উৎপলেন্দু তাঁকে বললেন, ‘পাজামার গেঁট আর খুলে কাজ নেই। যান, ঘরে যান। শুয়ে পড়ুন গিয়ে।’
করিডরের দেওয়ালে লাগানো ঘড়িতে সাড়ে দশটার ইলেকট্রনিক মিউজিক বেজে উঠল।
তিন
ক্লান্ত শরীর বিছানায় এলিয়ে দিয়ে দেবারতি মানি এলোমেলো চিন্তা করছিল। ঘরে হালকা সবুজ রঙের নাইট ল্যাম্প জ্বলছে। রহস্যময় আলোয় ঘরের ছায়া ছায়া আনাচ-কানাচগুলো কেমন যেন ভয় দেখাচ্ছে। কোথাও কোনও শব্দ নেই। শুধু হঠাৎ কখনও ছুটে যাওয়া গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে বড় রাস্তা থেকে।
লেসের কাজ করা গোলাপি নাইটি পরে বিছানায় শুয়েছিল দেবারতি। মাথাটা ভীষণ ধরেছে। একটা ডিসপ্রিন ট্যাবলেট খেয়ে নিলে হয়। রাত কত এখন? বারোটা?
মাত্র তিনজনের ইন্টারভিউ নেওয়া শেষ হয়েছে ওর। অনিমেষ চৌধুরি-উৎপলেন্দু সেন আর রতন বন্দ্যোপাধ্যায়। কাল কনফারেন্সের ফাঁক-ফোকরে বাকি ইন্টারভিউগুলো সেরে নেবার চেষ্টা করবে। এগুলো মিলিয়ে সত্যি সত্যিই একটা স্টোরি লিখবে দেবারতি। কিন্তু অন্য একটা মতলবও আছে ওর। টপ সিক্রেট বোমাটি ফাটানো। কনফারেন্সের শেষ দিনে ভ্যালিডিক্টরি ফাংশানের সময় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সভার মাঝখানে ও ডিনামাইটের পলতেয় আগুন দেবে। তারপর যা হয় হোক।
রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যকে ছোটবেলা থেকে ভালোবাসে বলেই এ-নিয়ে নোংরা কাজ দেবারতি সহ্য করতে পারে না। তাই পরশুরামের কুঠার হাতে ও লড়াইয়ে নেমে পড়েছে। জালিয়াত অক্ষম ভন্ড লেখকগুলোকে ও চুরমার করে দেবে। এইসব লেখকদের জন্যই রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্য দীর্ঘদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটেছে। এখন এ-লাইনের অনেক লেখক সফল। তাই এখনই সবচেয়ে বেশি নিষ্ঠুর হতে হবে। আর সেই কারণেই ইন্টারভিউ নেবার ছল করে ওর টপ সিক্রেট খবর সম্পর্কে আরও কিছু জেনে নিতে চায় দেবারতি।
আমন্ত্রিত অতিথিদের সকলেই হোটেলে রয়েছেন। উদ্যোক্তারা তাঁদের জন্য মাথাপিছু একটা করে ঘর যেমন বরাদ্দ করেছেন, তেমনই দিয়েছেন রোজকার ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনারের কুপন। এছাড়া আজ সকালে কনফারেন্সের রেজিস্ট্রেশনের সময় পাওয়া গেছে সুদৃশ্য ব্যাগ, পেন, প্যাড, আর একটা ব্যাজ। দেবারতি ব্যাজটা ব্যাগেই রেখে দিয়েছিল—বুকে লাগায়নি। লাগানোর দরকারও নেই, কারণ উদ্যোক্তাদের প্রায় সকলেই ওকে চেনেন। তা ছাড়া ওর দৈনিক পত্রিকা ‘সুপ্রভাত’ এই সম্মেলনের অন্যতম স্পনসর।
কলিংবেল বেজে উঠল টুং-টাং।
অবাক হল দেবারতি। ওর ঘরে কে এল এত রাতে?
বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা খুলতে গেল। অত সহজে কাউকে ভয় পায় না দেবারতি। আর তিন তারা এই হোটেলে ডাকাত পড়ার ভয় নিশ্চয়ই নেই!
কিন্তু দরজা খুলতেই ডাকাতের মুখোমুখি হল।
