‘যোগাযোগ’ শব্দটার ওপরে বেশ জোর দিলেন উৎপলেন্দু।
ব্যাগ থেকে প্যাড আর পেন বের করল দেবারতি। সরলভাবে জিগ্যেস করল, ‘আপনার কি ধারণা আপনি ভালো লেখেন—তাও আপনার লেখা ছাপা হয় না?’
উৎপলেন্দুর পুরোনো ইন্টারভিউটার কথা মনে পড়ল। মেয়েটা কি আবার সেই শয়তানি পথ নিয়েছে? মাথাটা সামান্য ঝিমঝিম করছে, কিন্তু তাও গ্লাস তুলে নিলেন উৎপল। হতাশার ক্ষতের জ্বালা বড় ভয়ঙ্কর। মেয়েটা কি তার মধ্যে নুনের ছিটে দিতে এসেছে?
ঠকাস করে টেবিলে গ্লাস নামিয়ে রাখলেন উৎপলেন্দু। একটা পঁচিশ-ছাব্বিশের মেয়েকে ভয় পাওয়ার কোনও মানে হয় না। আক্রমণের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আক্রমণই করতে হবে।
সুতরাং অকুতোভয়ে মনের কথা বললেন, ‘ধারণা নয়, আমি ভালো করেই জানি যে আমি অনেকের চেয়ে ভালো লিখি। কিন্তু পত্রিকাগুলো কখনও ভালো লেখা ছাপবে না। ছাপলে ওদের মাইনে করা জনপ্রিয় লেখকগুলোর নাম-ডাকে টান পড়বে।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘জানেন, সেই চৌদ্দ বছর বয়েস থেকে আমার লেখা ছাপা হচ্ছে!’
‘জানি। কিন্তু তাও দেখুন, এই কনফারেন্সে আপনাকে মাঝারি লেখক হিসেবে ডাকা হয়েছে। আপনাকে গল্পপাঠের লিস্টে রাখা হয়নি।’
উৎপলেন্দুর কান গরম হল। মেয়েটা আহত মর্যাদায় ঘা দিয়েছে। তাঁকে এইভাবে হেনস্থা করার পিছনে অনুষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের নিশ্চিত হাত রয়েছে। উৎপলকে ওঁরা কিছুতেই প্রথম সারিতে আসতে দেবে না। কিন্তু তাও তিনি অনুষ্ঠানে এসেছেন। নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো।
সেই চোদ্দো বছর বয়েস থেকে তেতাল্লিশ বছর ধরে লেখালিখি! কী কষ্টের সব দিন, কী অপমানের সব দিন! চুনোপুঁটি, ক-অক্ষর-গোমাংস সব সম্পাদক-প্রকাশকরা কী হেনস্থাটাই না করেছে! ভাস্কর রাহার সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়। যখনই উৎপল তাঁর প্রথম ছাপা লেখার কথা বলেন, তখনই রাহা মন্তব্য করেন, ‘কী আর করবেন, উৎপল। জ্যেষ্ঠ হলেই শ্রেষ্ঠ হয় না।’
তার মানে! জ্যেষ্ঠ হলেই কি তাহলে নিকৃষ্ট হতে হবে?
উৎপলেন্দুর কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে দেবারতি হাসল। সুন্দর দাঁতে পেনটাকে আলতোভাবে কামড়ে ধরল। সামনের বড় আয়নায় উৎপলেন্দু সেনের বাঁ দিকের প্রোফাইল দেখা যাচ্ছিল। ফরসা মুখে লালচে আভা। চওড়া কপাল। যাত্রাদলের নায়কের মতো বাবরি চুল। তবে বয়েসের জন্য কাঁচাপাকা এবং পাতলা হয়ে গেছে। গোটা মুখে কেমন যেন ক্লান্ত, আহত, পরাজিত সৈনিকের ছাপ। তবে আত্মমর্যাদা ও অহঙ্কারের ইশারাও স্পষ্ট।
মাথা নেড়ে এক ঝটকায় চুল সরাল দেবারতি। ওর বুক নড়ে উঠল। হাতের পেনটা বিছানায় রেখে টেবিল থেকে গ্লাস তুলে চুমুক দিল। তারপর জিভ দিয়ে ‘চুকচুক’ শব্দ করে জিগ্যেস করল, ‘রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্য তাহলে আপনাকে কিছু দেয়নি?’
উৎপলেন্দু মুখ তুলে মেয়েটাকে দেখলেন কিছুক্ষণ। তারপর : ‘বিশেষ কিছু দেয়নি।’
‘আচ্ছা, এটা না হয় গেল। তিরিশ বছর তো মাঝারি এক নাটকের দলে অভিনয় করলেন। যদ্দূর জানি, খুব একটা কিছু করে উঠতে পারেননি। নাটকের মেজর রোল সেরকমভাবে পাননি। সিনেমা বা টিভিতেও কোনও চান্স পাননি। এরকমটা হল কেন?’
ভেতরে-ভেতরে একটা অদ্ভুত রাগ হচ্ছিল উৎপলেন্দুর। তিনি জড়ানো গলায় বললেন, ‘ম্যাডাম, নাটক হোক আর লেখালিখি হোক, ব্যাপারটা আসলে একই। সম্পাদক বলুন, প্রকাশক বলুন আর নাটকের দলের চিফ বলুন—কালচারাল লাইনের লোকগুলো বেসিক্যালি একরকম। ওরা কাউকে সহজে উঠতে দেয় না।’
দেবারতি পেন নিয়ে প্যাডে কিছুক্ষণ কী সব লিখল। তারপর ছোট্ট করে মন্তব্য করল, ‘তা হলে আপনাকে মোটামুটিভাবে ব্যর্থ বলা যায়?’
‘হ্যাঁ, ব্যর্থ—কিন্তু সমর্থ। আমাকে ক্ষমতা প্রমাণ করার কেউ সুযোগই দিল না।’
‘সমর্থ?’ ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসল দেবারতি। তারপর চাপা গলায় বলল, ‘তাহলে বিয়ে করেননি কেন?’
উৎপলেন্দু হাসবার চেষ্টা করে বললেন, ‘এমনিই—।’
‘প্রথম প্রেমের ন্যাকামি—না আর কিছু?’ অর্থপূর্ণ নজরে উৎপলকে দেখল দেবারতি।
‘না, না, প্রথম প্রেম-টেম কিছু না।’
‘তাহলে?’
বড় অবাধ্য এই যুবতী। ভাবলেন উৎপলেন্দু। তাঁর বিয়ে না করার পিছনে কারণ একটা নিশ্চয়ই আছে। সেটা সবাইকে বলার নয়। কাউকে বলার নয়। যারা জানে তারা জানে। আর কারও জানার দরকার নেই।
উত্তর না পেয়ে দেবারতি বলল, ‘নাটকের দলে তো মেয়ে আছে। সেখানে মজা লুটছেন?’
উৎপলেন্দুর চোখে মুখে রক্তকণিকার দল হইহই করে ভিড় করল। কথা বলতে গিয়ে উত্তেজনায় জিভ জড়িয়ে যাচ্ছিল। একবার তাঁর মাইল্ড স্ট্রোক হয়ে গেছে। উত্তেজিত হওয়াটা ডাক্তারের বারণ।
অতি কষ্টে নিজেকে সংযত করে উৎপলেন্দু উত্তর দিয়েছেন, ‘ম্যাডাম, এটুকু আপনাকে বলি, আমি কনফার্মড ব্যাচেলার। আর মজা লুটতে গেলে নাটকের দল কেন, অন্য ঢের জায়গা আছে।’
চোখ নাচাল দেবারতি : ‘আছে জানি, কিন্তু আপনার যাওয়ার সাহস নেই।’ গ্লাসে শব্দ করে একবার চুমুক দিয়ে : ‘সে-সাহস থাকলে অ্যাদ্দিনে আপনার মুখেভাত হয়ে যেত।’ খিলখিল করে হেসে উঠল দুর্বিনীত নারী।
কান আরও বেশি গরম হল। ঘরটা যেন দুলে উঠল চোখের সামনে। সেই অবস্থাতেই বোতল থেকে গ্লাসে হুইস্কি ঢাললেন। জল মেশাতে ভুলে গেলেন বোধ হয়। গ্লাসে চুমুক দিতেই জ্বলন্ত কাঠকয়লা গলা বেয়ে নেমে গেল পাকস্থলীতে।
