‘কাল দুপুরটা ফ্রি আছ?’
‘হ্যাঁ, কেন?’
‘মানে, তোমাকে দিয়ে আগামী পুজোয় আমি একটা বড় গল্প লেখাতে চাই। তোমার ফিচারগুলো আমি খুঁটিয়ে পড়েছি—ওর মধ্যে ফিকশনাল কোয়ালিটি আছে। কাল দুপুরে তোমার বাড়ি গিয়ে সেই লেখাটার ব্যাপারে ডিটেইলসে ডিসকাস করতে পারলে ভালো হত।’ একটু থেমে আবার বলেছেন, ‘তোমার মা কি তখন বাড়িতে থাকবেন?’
দেবারতি জানে, ‘ভয়ঙ্কর’ পত্রিকায় পুজোয় বড়গল্প লিখলে চারহাজার টাকা পাওয়া যায়। ও পাঁচ সেকেন্ড সময় নিয়ে পোড় খাওয়া সম্পাদকটিকে জরিপ করল। তারপর খুব সহজ গলায় বলল, ‘আপনার কাগজে পুজোয় বড়গল্প লিখতে গেলে শুতে হয়?’
প্রেমময় হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন। কান দুটো কেমন গরম লাগছিল। দেবারতির দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন।
কিন্তু দেবারতি মানির বক্তব্য তখনও শেষ হয়নি। ও হাসতে হাসতেই বলেছে, ‘শোওয়া নিয়ে আমার কোনও শুচিবায়ু নেই। তবে যার-তার সঙ্গে শুতে আপত্তি আছে। আপনার মতো বুড়ো কোলাব্যাঙের সঙ্গে শোওয়া মানে তো আমি ঘেন্নায় ”বলো হরি, হরি বোল” হয়ে যাব—।’
উঠে দাঁড়িয়েছিল দেবারতি। ঠান্ডা গলায় বলেছিল, জানি আপনার কাগজে আমার লেখা আর ছাপা হবে না। কিন্তু কী করব প্রেমময়দা, বিশ্বাস করুন, আপনার সঙ্গে শুতে আমার আপত্তি আছে।’
মেয়েটা চলে গিয়েছিল কাচের ঘর থেকে। কিন্তু প্রেমময় চৌধুরি মাথা গরম করেননি। মাথা গরম করলে কখনও কাগজ চালানো যায় না, আর কাজও হাসিল হয় না। শিকার করতে গেলে ধৈর্য ধরতে হয়।
তিনি দেবারতির কাছে দুঃখপ্রকাশ করে সম্পর্কটা ওপর-ওপর ঠিক করে নিয়েছিলেন। তারপর দেবারতির লেখাও ছেপেছেন নিয়মিত। আর দেবারতিও ওর কাগজে প্রেমময় চৌধুরিকে নিয়ে টুকটাক নিউজ ছাপিয়ে গেছে, পাবলিসিটি দিয়েছে।
কিন্তু প্রেমময় ভোলেননি। দেবারতি মানিকে একটা চরম শাস্তি দেবার জন্য শুধু লাগসই সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছেন।
দেবারতি বসবার পর প্রেমময় এক চুমুকে গ্লাসের তরলটুকু শেষ করে জিভ বুলিয়ে নিলেন ঠোঁটে। তারপর বললেন, ‘বলো, কী ব্যাপার?’
দেবারতি আঙুল তুলে উৎপলেন্দু সেনকে দেখাল। বলল, ‘ওঁর একটা ইন্টারভিউ নেব।’
উৎপলেন্দুর চোখে মুখে প্রথমে দেখা দিল বিস্ময়, তারপরই সন্দেহ।
সেটা লক্ষ করেই দেবারতি হাসল। টান মেরে পোশাকের কয়েকটা ভাঁজ ঠিক করে নিয়ে বলল, ‘এবারের এই কনফারেন্স নিয়ে আমি একটা বড় স্টোরি করব। সন্ধেবেলা ফোন করে এডিটরের সঙ্গে কথা বলে গ্রিন সিগনাল নিয়ে নিয়েছি। অনিমেষ চৌধুরির ইন্টারভিউ দিয়ে শুরু করেছি। সেকেন্ড ক্যান্ডিডেট উৎপলেন্দু সেন। কী উৎপলবাবু, ইন্টারভিউ দেবেন তো?’
শেষ প্রশ্নটা উৎপলের দিকেই। অতএব উৎপলেন্দু সেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তারপর প্রেমময় চৌধুরি আর কৌশিক পালের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিক আছে, তা হলে ডাইনিং হলে দেখা হবে। সওয়া দশটা সাড়ে দশটার মধ্যে যাচ্ছি।’
ওঁরা দুজনে চলে গেলেন। যাবার আগে প্রেমময় দেবারতিকে একবার দেখলেন। ইন্টারভিউ নেবার ছল করে মেয়েটা উৎপলেন্দুর সঙ্গে শুতে আসেনি তো! মনে হয় না। কারণ বাজারে ওকে আর রঞ্জন দেবনাথকে নিয়েই যত গুজব শোনা যায়।
ঘরের দরজা বন্ধ হতেই দেবারতি একটা খালি গ্লাস টেনে নিয়ে তাতে হুইস্কি ঢালল। তারপর তাতে খানিকটা জল মিশিয়ে নিল ঢকঢক করে। চোখের ওপর থেকে চুল সরিয়ে বলল, ‘এটা কি আপনি খাওয়াচ্ছেন, না কনফারেন্সের স্পনসররা খাওয়াচ্ছে?’
উৎপলেন্দু সবজান্তা হাসি হেসে খানিকটা সহজ হতে চাইলেন। বললেন, ‘আমি খাওয়াচ্ছি। জানেন না, কনফারেন্সের এই পাঁচ দিন স্পনসররা শুধু ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ আর ডিনার খাওয়াচ্ছে। অবশ্য পাঁচদিন বিনিপয়সায় থাকার ব্যবস্থাও করে দিয়েছে এই আরামের হোটেলে—।’
দেবারতি বাঁকা চোখে তাকাল উৎপলেন্দুর দিকে। তারপর নোংরা সুরে বলল, ‘বিখ্যাত সম্পাদক আর প্রকাশককে হুইস্কি খাইয়ে লাইন করছিলেন?’
উৎপলেন্দু আক্ষেপের হাসি হাসলেন। মেয়েটা সাহসী, বেপরোয়া—তবে অভিজ্ঞতা কম। জানে না, প্রেমময় চৌধুরির মতো সম্পাদকরা সহজে গলে না। নইলে এত খাওয়ানো সত্ত্বেও পুজো সংখ্যা ‘ভয়ঙ্কর’-এ প্রতিবারে উৎপলেন্দু সেনের ছোট গল্প! একটা বড় গল্প বা উপন্যাসের জন্য উৎপল প্রেমময়কে ঠারেঠোরে কম বলেছেন! কিন্তু হা হতোস্মি! প্রেমময় চৌধুরি নির্বিবাদে উৎপলেন্দুর আতিথ্য গ্রহণ করেন—যেন সেটা তাঁর চৌদ্দ পুরুষের অধিকার। অথচ উৎপলেন্দুর ইশারাগুলো দিব্যি ন্যাকা সেজে না বোঝার ভান করেন।
আর কৌশিক! প্রকাশক হিসেবে সেদিনের ছোকরা—সে-ও কিনা সেয়ানা হয়ে গেছে! ভাস্কর রাহা, রতন বন্দ্যোপাধ্যায়, রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়, রূপেন মজুমদার, এঁদের একটার পর একটা উপন্যাস ছেপে যাচ্ছে, অথচ উৎপলেন্দুর বেলায় ‘সম্পাদিত বই’। এ যেন ছোটবেলার সান্ত্বনা পুরস্কার। কিন্তু তবুও উৎপল নিরাসক্ত হতে পারছেন কোথায়! একটা ক্ষীণ লোভাতুর আশা ওঁকে এখনও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। কৌশিক আর প্রেমময়ের সঙ্গে যথাসাধ্য সম্পর্ক ঠিক রাখার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওঁরা যেন খুড়োর কল তৈরি করে উৎপলকে তাতে জুতে দিয়ে দৌড় করাচ্ছে।
উৎপলেন্দু সামান্য শব্দ করে হাসলেন, বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনার তো জানা উচিত, এখনকার যুগে শুধু ভালো লিখলেই লেখা ছাপা যায় না, তার জন্যে যোগাযোগ দরকার, যোগাযোগ—।’
