সম্মেলনের প্রথমদিনের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে নানান মন্তব্য করছিল কৌশিক। উৎপলেন্দু ওর চপলতার জবাবে ‘হুঁ’, ‘হাঁ’, শব্দ করছিলেন শুধু। আর প্রেমময় চৌধুরি গম্ভীরভাবে গ্লাসের তরলের দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর মনে হচ্ছিল, গ্লাসে হুইস্কি নয়—রয়েছে কারও চোখের জল।
রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের সবচেয়ে সফল পত্রিকা ‘ভয়ঙ্কর’। পত্রিকার বয়েস বাহান্ন বছর। তার মধ্যে প্রেমময় চৌধুরি সাঁইতিরিশটা বছর জুড়ে এর সম্পাদক হিসেবে। বলতে গেলে এই পত্রিকাতে লেখালিখি করেই রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় অধিষ্ঠিত আজকের জায়গায় পৌঁছেছেন। একটা সময়ে প্রেমময় ও রত্নাবলী যথেষ্ট কাছাকাছি ছিলেন। তখন রত্নাবলীর বয়েস ছিল—আজ নেই। তবে তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক এখনও অটুট। ‘ভয়ঙ্কর’-এর পুজো সংখ্যায় রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় বছরের সেরা এবং সুদীর্ঘ উপন্যাসটি লেখেন। ওঁর এবারের উপন্যাস ‘দু-নয়নে ভয় আছে’ পাঠক মহলে অন্যান্যবারের মতোই সাড়া ফেলেছে।
অনেকক্ষণ চুপ করে থাকার পর প্রেমময় হঠাৎই মুখ খুললেন।
‘উৎপলেন্দুবাবু, বিকেলে একটা ব্যাপার খেয়াল করেছেন?’
‘কী ব্যাপার?’
‘দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওই দো-আঁশলা ডবকা রিপোর্টারটা ভাস্করবাবুকে আড়ে-আড়ে কী যেন বলছিল—’
দেবারতির বাবা দক্ষিণ ভারতের বাসিন্দা ছিলেন। মদের ব্যবসায়ী। আর মা বাঙালি। পার্ক স্ট্রিটের এক রেস্তরাঁয় গান গাইতেন। কী করে যেন দুজনের দেখা হয়েছিল, ভালোবাসা হয়েছিল, এবং বিয়ে হয়েছিল। দেবারতি নিজেই সবিস্তারে সবাইকে এ-কথা বলে। মেয়েটার জিভ বড় আলগা। ছোটবেলায় একটা গাড়ি অ্যাকসিডেন্টে ওর বাবা মারা যান। ওর মা বিয়ের পর গান-টান ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর নিরুপায় হয়ে আবার ফিরে গেছেন পুরোনো পেশায়। সন্ধেবেলা ঝিমঝিমে আলোয় নেশাগ্রস্ত শ্রোতাদের সামনে ‘মেরি হোঁঠ ভি সেক্সি, মেরি আঁখে ভি সেক্সি…’।
দেবারতি গতবারের কনফারেন্সে একঘর লোকের সামনে চেঁচিয়ে বলেছিল, ‘আমার যা পেডিগ্রি তাতে আমার ক্যাবারে ডান্সার হওয়ার কথা। কিন্তু কী যে হল, লেখাপড়া-টড়া শিখে আই বিকেম আ রিপোর্টার। ক্রাইম জার্নালিস্ট।’
কৌশিক উৎসাহ দেখিয়ে বলল, ‘কী বলছিল, প্রেমদা? কিছু শুনতে পাননি?’
গ্লাসটা নাচিয়ে তরলে ঢেউ তুললেন প্রেমময়। ঝাপসা চোখে দেখছিলেন দেবারতির শরীর নাচছে। অনেক কিছু দুলছে। বয়েস প্রায় সত্তর হতে চলল, তবুও শরীরের জ্বালা কমে না। ভেবেছিলেন ষাট পেরোলেই এই জ্বালা-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবেন, কিন্তু…।
বিড়বিড় করে তিনি কৌশিকের কথার জবাব দিলেন, ‘হ্যাঁ, শুনেছি। ও নাকি কী একটা টপ সিক্রেট জেনে ফেলেছে। সেটা ফাঁস করে দিলে নাকি একটা এক্সপ্লোশন হবে।’
‘কী সিক্রেট?’ উৎপলেন্দু জিগ্যেস করলেন।
দেবারতিকে তিনি এড়িয়ে চলেন। একবার তাঁর একটা রেডিও ইন্টারভিউর সময় মেয়েটা এমনভাবে অ্যাটাক করেছিল যে, ইন্টারভিউটাই শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায়। কিন্তু গতবারের সম্মেলনের সময় ফাজিল মেয়েছেলেটা তাঁকে একান্তে ডেকে নিয়ে গিয়ে বাতিল ইন্টারভিউর ক্যাসেটটা বাজিয়ে শুনিয়ে দিয়েছিল। বলেছিল, ‘উৎপলেন্দুবাবু, এই ক্যাসেটটা আমার পার্সোনাল কালেকশনে থাকবে। দ্য গ্রেট মিস্ট্রি রাইটার উৎ-প-লেন্দু সেন—।’
‘লেন্দু’ শব্দটার ওপরে অহেতুক অশ্লীলভাবে জোর দিয়েছিল মেয়েটা।
রাগে অপমানে উৎপলেন্দুর ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে গিয়েছিল। কিন্তু কিছুই করতে পারেননি। একে তো ‘সুপ্রভাত’ খুব নামী পত্রিকা, তার ওপর দেবারতির নিজস্ব কানেকশনও কিছু কম নেই।
উৎপলেন্দু সেন একরকম হেরেই গিয়েছিলেন দো-আঁশলা মেয়েটার কাছে।
উৎপলের প্রশ্নে প্রেমময় বললেন, ‘সেটা শুনতে পাইনি।’
ঠিক তখনই ঘরের কলিংবেল বেজে উঠল।
উৎপল কৌশিককে ইশারা করতেই ও উঠে গেল দরজা খুলতে।
প্রেমময় বা উৎপল গ্লাস বোতল ইত্যাদি আড়াল করার কোনওরকম চেষ্টাই করলেন না।
কৌশিক দরজা খুলতেই দেবারতি মানিকে দেখা গেল। অদ্ভুত আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে দরজায় মেয়েটা দাঁড়িয়ে। পরনে কালো-সাদা নকশার সালোয়ার কামিজ। কাঁধে ঝোলানো লেডিজ ব্যাগ।
প্রেমময় শরীরের জ্বালাটা আবার টের পেলেন। যৌবনে রত্নাবলী কি এতটা লোভনীয় ছিল?
কৌশিক ফিরে এসে আবার ওর জায়গায় বসে পড়ল।
‘ভেতরে আসতে পারি?’ ঠোঁঠের কোণে সামান্য হেসে জানতে চাইল দেবারতি।
প্রেমময় চৌধুরি উঠে দাঁড়িয়ে দু-হাত সামনে বাড়িয়ে এক গাল হেসে বললেন, ‘এসো, এসো। এ আবার জিগ্যেস করার কী আছে!’
দেবারতি ঘরে ঢুকে খুব সপ্রতিভ ভাবে উৎপলেন্দুর পরিপাটি বিছানায় বসে পড়ল। ‘সিরাজ’ হোটেলের তারার সংখ্যা তিন হলেও ঘরদোর বেশ ঝকমকে সুন্দর। আর দুটো তারা যোগ করে ফেলতে পারলেই অনায়াসে পাঁচ তারা হয়ে যেতে পারে।
প্রেমময় চৌধুরির ‘ভয়ঙ্কর’ কাগজে দেবারতি বেশ কয়েকবার কটা ফিচার লিখেছে। সবগুলোই সত্যঘটনার অন্তর্তদন্ত। লেখাগুলো তখন বেশ সাড়া ফেলেছিল। প্রেমময়ের মনে পড়ল, একবার নিজের দপ্তরে কাচের ঘরে মেয়েটাকে লেখালিখি সম্পর্কে নানান উপদেশ দেবার পর জিগ্যেস করেছিলেন, ‘তোমার কবে যেন অফ ডে?’
দেবারতি নিষ্পাপ মুখে জবাব দিয়েছিল, ‘কাল—মঙ্গলবার।’
