রঞ্জন দেবনাথকে বারবার মাইকে ডেকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। যখন কর্মকর্তারা একেবারে হাল ছেড়ে দিয়েছেন তখনই হুট করে সে কোত্থেকে এসে হাজির হল। স্মার্ট ভঙ্গিতে মঞ্চে উঠে গিয়ে গল্প পড়তে শুরু করল।
রঞ্জন দেবনাথের চেহারা সুন্দর। লেখালিখির লাইনে না এসে অভিনয় জগতে গেলেও সে হয়তো ছাপ ফেলতে পারত। বয়েস বড়জোর চল্লিশ-বিয়াল্লিশ। চোখে এখনও চশমা ওঠেনি। গায়ের রং ফরসা, তবে সামান্য চাপা। মাথায় কোঁকড়া চুল। গালে চাপ দাড়ি, সঙ্গে মানানসই সরু গোঁফ। ধারালো নাক। উজ্জ্বল সপ্রতিভ চোখ। পরনে নীল-সবুজ স্ট্রাইপ দেওয়া ফুলহাতা শার্ট আর গাঢ় রঙের টেরিলিনের প্যান্ট।
রঞ্জনের গল্প পড়ার ভঙ্গিতে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাসের ছাপ ফুটে বেরোচ্ছে। ভাস্কর রাহা ওর গল্পের প্রতিটি শব্দ প্রতিটি লাইন গভীর মনোযোগে শুনছিলেন। গল্পের নাম ‘সংসারে পাপ আছে’। বেশ নতুন ধরনের নাম।
রঞ্জন দেবনাথের প্রথম উপন্যাস ‘অন্ধকারে বাঘবন্দী খেলা’ প্রকাশিত হয়েছিল কম করেও বারো-তেরো বছর আগে। তারপর ওর একটা গল্প সঙ্কলন বেরোয়, এবং তার বছরখানেকের মধ্যেই একটা গোয়েন্দা উপন্যাস ‘পায়ের শব্দ নেই’ প্রকাশিত হয়।
রঞ্জন পত্র-পত্রিকায় কম লিখলেও পাঠকেরা ওর লেখার দিকে মনোযোগ দিয়েছিল। কিন্তু তারপর একরকম আচমকাই ও লেখা ছেড়ে দেয়। বলতে গেলে, মঞ্চ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয় গ্রিনরুমে। সম্পাদক-প্রকাশকদের সঙ্গে ওর যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কিন্তু তারপর…।
তারপর, প্রায় এগারো বছর পর, রঞ্জন এ-বছর ‘মাসিক গোয়েন্দা’ পত্রিকার শারদীয় সংখ্যায় ‘খুনির নাম অজানা’ নামে একটা নভেলেট লেখে। ক্ষুরধার বুদ্ধি মেশানো স্মার্ট লেখা। পড়লেই বোঝা যায়, রঞ্জন এগারো বছর ধরে ওর লেখার তরোয়ালে শান দিতে ভোলেনি। এই লেখাটা বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই সম্পাদক ও প্রকাশকরা ওর বাড়িতে হানা দিয়ে বাকি কাজটুকু সেরে ফেলেন। তাঁরা রঞ্জন দেবনাথকে গ্রিনরুম থেকে আবার ঠেলে দেন মঞ্চের দিকে।
কিন্তু এগারো বছর বড় সুদীর্ঘ সময়। ভাবলেন ভাস্কর রাহা। এই লম্বা সময় নষ্ট করে ছেলেটা ভীষণ ভুল করেছে। নইলে এতদিনে ও প্রথম সারিতে নিজের জায়গা করে নিত।
রঞ্জন দেবনাথের গল্প পড়া শেষ। সেই সঙ্গে সম্মেলনের প্রথমদিনের কর্মসূচিতেও ইতি পড়ল। মাইকে ঘোষণা শোনা গেল, বাইরের লাউঞ্জে চা-কফির ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া পাশের হলে যে বইমেলার আয়োজন করা হয়েছে সেটা দেখতেও যেন কেউ না ভোলেন।
দর্শক-আসন থেকে সকলে উঠে পড়ে রওনা হলেন দরজার দিকে। ছাই রঙের উর্দি পরা হোটেলের কয়েকজন বেয়ারা দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অতিথিদের অনুরোধ করছে চা-কফির কাউন্টারের দিকে এগিয়ে যেতে।
ভিড় ঠেলে ভাস্কর রাহা এগোচ্ছিলেন। ওঁর পাশে উৎপলেন্দু সেন। আর পিছনে অর্জুন দত্ত আর রতন বন্দ্যোপাধ্যায়।
এয়ার কন্ডিশনড বলরুমে চুরুটের জন্য ভাস্কর রাহার আঙুল নিশপিশ করছিল, কিন্তু তিন তারা হোটেলের আদব-কায়দা লঙ্ঘন করতে পারেননি। এখন, দরজার বাইরে বেরোনো মাত্রই, তিনি তিনবারের চেষ্টায় একটা সস্তা চুরুট ধরালেন। উৎপলও পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরালেন। তারপর গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী ভাস্করবাবু, কেমন বুঝছেন?’
রাহা বেশ উৎসাহ নিয়ে খুশি-খুশি মুখে বললেন, ‘ভালোই তো! কে ভেবেছিল, পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলা ক্রাইম ফিকশন এরকম একটা জায়গায় চলে আসবে! যাই বলুন উৎপল, এই সম্মেলনে এসে আমার বেশ লাগছে। ধরুন পশ্চিমে মডার্ন ক্রাইম স্টোরি শুরু হয়েছে ভলতেয়ারের হাতে—প্রায় আড়াইশো বছর আগে। তার প্রায় একশো বছর পর এডগার অ্যালান পো নিয়ে এলেন গোয়েন্দা দ্যুপাঁকে। আর আমাদের এখানে ক্রাইম কাহিনির পত্তন একশো বছরের কিছু বেশি। মানে ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর”, গিরিশচন্দ্র বসুর ”সেকালের দারোগার কাহিনি” এইসব বইগুলো ধরলে। তার মানে, আমরা পশ্চিমের চেয়ে প্রায় দেড়শো বছর পিছিয়ে থেকে দৌড় শুরু করেছি। সে হিসেবে এখনকার অবস্থাকে তো রীতিমতো রমরমা ব্যাপার বলা যায়—’
উৎপলেন্দু ‘হুম’ করে ছোট্ট একটা শব্দ করলেন। তারপর বললেন, ‘চলুন, কফি নিই—।’
ভিড় ঠেলে ওঁরা এগোতে যাবেন, পিছন থেকে কেউ ভাস্কর রাহার জামা ধরে টানল।
রাহা একটু অবাক হয়েই পিছন ফিরে তাকালেন।
দেবারতি মানি। চোখ সামান্য কুঁচকে হাসছে।
কী সুন্দর দেখাচ্ছে! যদি বয়েসটাকে চোখের পলকে চল্লিশটা বছর কমানো যেত, তাহলে খুব ভালো হত। ভাস্কর রাহা ভাবলেন। না, দেবারতির শরীর ভাস্কর রাহাকে লোভাতুর করেনি। মেয়েটার জীবনীশক্তি, টগবগে চনমনে ব্যাপার, উচ্ছল হাসি কেমন যেন হাতছানি দেয়। বলে, কাম অন, হানি, তোমাকে দেখাব জীবন কাকে বলে! আর তখনই বয়েসটা কেমন যেন কমাতে ইচ্ছে করে।
ভাস্কর রাহা দেবারতির বুকের লেখাটা পড়লেন। বললেন, ‘এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই। এখন চায়ের সময়।’ তারপর হেসে জিগ্যেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, কিছু বলবে?’
দেবারতিকে এখন দেখে নেশা করেছে বলে বোঝা যাচ্ছে না। ওকে দেখে উৎপলেন্দু কেমন যেন একটু সিঁটিয়ে গেছেন। অর্জুন দত্ত আর রতন বন্দ্যোপাধ্যায় কৌতূহল নিয়ে দেবারতিকে দেখছেন।
