রতন বন্দ্যোপাধ্যায় ভাস্কর রাহাকে কী একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু ঠিক তখনই রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের গল্প পড়া শেষ হল। সারা হলে শোনা গেল ভদ্র করতালির শব্দ। ভাস্কর রাহা, উৎপলেন্দু, অধ্যাপক—সকলেই তাতে হাত মেলালেন।
রত্নাবলী হাসিমুখে মঞ্চ থেকে নেমে আসছিলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বিপর্যয়টা ঘটে গেল।
মোটামুটি নিস্তব্ধ হলে একটি মাত্র মানুষ উদ্ধত ভঙ্গিতে আচমকা উঠে দাঁড়িয়ে অশ্লীলভাবে হাততালি দিতে লাগল।
রত্নাবলী তার দিকে তাকালেন।
শুধু রত্নাবলী কেন, হলঘরের প্রায় প্রতিটি মানুষ চোখ ফেরাল সেই দুর্বিনীত তরুণীর দিকে। কে এই অসভ্য রমণী? উপস্থিত দর্শকদের কেউ কেউ তাকে চেনে হয়তো, কিন্তু সকলেই নয়।
মেয়েটির বয়েস ছাব্বিশ কি সাতাশ। গায়ে টকটকে হলদে ঢোলা-টি-শার্ট। টি-শার্টের বুকের ওপরে নীল হরফে লেখা : এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই। মেয়েটির চুল স্টেপ কাট করা। ছোট-ছোট ঢেউ তুলে ঘাড় ছাড়িয়ে পিঠের ওপরে নেমে গেছে। চুলের ফাঁক দিয়ে চোখে পড়ছে কানের শৌখিন দুল। গলায় আটোসাঁটো কালো পুঁতির মালা।
মেয়েটির গায়ের রং ময়লা হলেও নাক-চোখ ধারালো। বিশেষ করে দু-চোখে যেন দুটো হিরের কুচি বসানো। ফ্যাকাসে জিনসের প্যান্টের কোমরের কাছে এক হাত রেখে আর এক হাতের আঙুলে গলার মালা অনুভব করছিল।
ও হাততালি বন্ধ করলেও সেই বেপরোয়া শব্দস্রোত সকলের কানে বাজছিল।
রতন বন্দ্যোপাধ্যায় হঠাৎই যেন সাড় ফিরে পেয়ে ভাস্কর রাহাকে জিগ্যেস করলেন, ‘ভাস্করবাবু, মেয়েটা কে বলুন তো? চেনেন নাকি?’
ভাস্কর রাহা নীচু গলায় বললেন, ‘আমি ভালো করেই চিনি। দেবারতি মানি। ”সুপ্রভাত” পত্রিকার ক্রাইম জার্নালিস্ট।’
অনুষ্ঠানের কর্মকর্তাদের একজন মাইকে বললেন, ‘আপনার কিছু বলার থাকলে মঞ্চে এসে বলতে পারেন—।’
দেবারতি মাথা ঝাঁকাল। ওর চুল সাপের মতো নড়ে উঠল এপাশ-ওপাশ। তারপর বলল, ‘আমার বলার জন্যে মঞ্চ দরকার হয় না।’ একটু থেমে চারদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল : ‘আমার নাম দেবারতি মানি। ”সুপ্রভাত” পত্রিকার ক্রাইম জার্নালিস্ট। আমি রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস গোগ্রাসে গিলি। এখানে যেসব লেখক-লেখিকাকে নেমন্তন্ন করা হয়েছে তাঁদের অলমোস্ট সব লেখা আমি পড়েছি। তবে মিসেস রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের কোনও তুলনা নেই। ওঁর লেখার রহস্য একমাত্র ওঁর ডিটেকটিভ করঞ্জাক্ষ রুদ্র ছাড়া আর কেউ ধরতে পারে না। ওঁর লেখা আমার সবচেয়ে ফেভারিট। সুপার্ব! ওঁর এখনকার গল্পটাও আমার ফ্যানট্যাসটিক লেগেছে। ইউ আর সিম্পলি আনপ্যারালাল, মিসেস মুখার্জি—।’
পাশে বসা কেউ একজন দেবারতির হাত ধরে টান মেরে ওকে বসিয়ে দেবার চেষ্টা করল। আর তখনই দেবারতির সুঠাম দেহ সামান্য বেসামাল হয়ে টলে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে সকলে বুঝতে পারলেন দেবারতি দিনদুপুরে নেশা করেছে।
ভাস্কর রাহা দেবারতির কথাগুলোর মধ্যে অন্য কোনও মাত্রা খুঁজছিলেন। মেয়েটা তাহলে লাঞ্চের সময়েই মদ গিলেছে! মেয়েটার কিসের কষ্ট?
হলঘরের গুঞ্জনের ডেসিবেল মাত্রা ক্রমে চড়তে লাগল।
দেবারতি মানি জড়িয়ে-জড়িয়ে অস্পষ্টভাবে আরও কীসব কথা বলছিল। তারই মধ্যে ওকে টেনে বসিয়ে দিল কেউ। রত্নাবলী মুখোপাধ্যায় কিছুক্ষণের জন্যে বিমূঢ় হয়ে পড়েছিলেন, কিন্তু এখন আবার নিজের মর্যাদা ফিরিয়ে এনেছেন। ঠোঁটে সম্রাজ্ঞীর স্মিত হাসি ফুটিয়ে তুলে ছোট-ছোট পায়ে নেমে এলেন মঞ্চ থেকে। তাঁর কাঁচাপাকা চুল, রিমলেস আধুনিক ছাঁদের চশমা, পরনের হালকা গোলাপি-কালোয় কাজ করা জামদানি শাড়ি, মাথা সামান্য হেলিয়ে হাঁটার ভঙ্গি এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছে। বোঝা যায়, তাঁকে বাংলা সাহিত্যের আগাথা ক্রিস্টি বলার সঙ্গত কারণ আছে।
সম্মেলনের তাল কেটে গেল।
এরপর গল্প পড়ার কথা রূপেন মজুমদার আর রঞ্জন দেবনাথের। সেইমতো ঘোষণাও করা হল মাইকে। কিছুক্ষণ চাপা গুঞ্জনের পর রূপেন মজুমদার মঞ্চে গেলেন। খানিকটা কল্পবিজ্ঞান মেশানো একটা ক্রাইম গল্প পড়ে শোনালেন। তারপর কেমন-লাগল-গোছের ভঙ্গিতে হাসলেন। শ্রোতাদের কেউ যখন গল্প নিয়ে কোনও প্রশ্ন তুললেন না, তখন নেমে এলেন মঞ্চ থেকে।
রূপেন মজুমদারের বয়েস প্রায় পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন। পনেরো-ষোলো বছর বয়েস থেকেই তাঁর লেখা ছাপা হচ্ছে। পয়সাওয়ালা ঘরের ছেলে, তাই বাইশ বছর বয়েসেই নিজের টাকায় পরপর দুটো উপন্যাস ছেপে বের করেছিলেন। সেই বই দুটোর ভূমিকায় স্পষ্ট করে লেখা ছিল, উপন্যাস-যুগল সম্পূর্ণভাবে তাঁর মৌলিক চিন্তার ফসল। অবশ্য যে-কোনও পাঠক বই দুটো পড়ে তাঁর সঙ্গে একমত হবেন। কারণ, লেখা দুটোর প্লট যেমন দুর্বল, তেমনই সেকেলে তার ভাষা। পড়লেই মনে হয়, লেখক বঙ্কিমচন্দ্রের ছাতার নীচ থেকে এখনও বেরোতে পারেননি।
কিন্তু এসব ব্যাপার রূপেন মজুমদারকে এতটুকু দমিয়ে রাখতে পারেনি। ভদ্রলোক একের পর এক বই লিখে গেছেন। সেগুলো যে-করে-হোক ছাপাও হয়েছে। শত্রুরা বলে সম্পাদক-প্রকাশককে তোয়াজের বন্যায় ভাসিয়ে দিতে তাঁর জুড়ি নেই। তবে গত তিরিশ-চল্লিশ বছর ধরে রূপেন মজুমদারের একটাই স্লোগান : তিনিই রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের একমাত্র মৌলিক লেখক। দুষ্টজনে ফিসফিসিয়ে বলে, রূপেন মজুমদারের ইংরেজি পড়ার অভ্যেস নেই, তাই এখনও ‘সতী’ রয়ে গেছেন। আর উৎপলেন্দু সেন ওঁকে বলেন, বাংলা রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের একমাত্র ভার্জিন রাইটার। এখনও ওঁর ধর্ম নষ্ট হয়নি।
