দেবারতি হেসে বলল, ‘মুকুটহীন সম্রাট, আপনার সঙ্গে আমার গোপন মন্ত্রণা আছে। টপ সিক্রেট। ওদিকটায় চলুন—’
দেবারতি আঙুল তুলে হোটেলের খোলা বারান্দার দিকে দেখিয়েছে। আধখানা চাঁদের মতো গোল বারান্দা। তার রেলিঙে সুন্দর পোর্সিলেনের টবে বসানো নানান গাছ। একটা পাতাবাহার গাছে বিকেলের রোদ খেলা করছে। দুটো চড়ুই লাফাচ্ছে তার ডালে।
দেবারতিকে ভাস্কর রাহা চেনেন প্রায় চার বছর ধরে। মেয়েটাকে দেখলেই তাঁর মন ভালো হয়ে যায়। কিন্তু সব সময়েই ওর মধ্যে কিসের যেন একটা কষ্ট টের পান তিনি। সেটা কী সত্যি, না তাঁর কল্পনা—কে জানে!
‘উৎপল, আপনারা কফি খান, আমি ওর সঙ্গে একটু কথা বলে আসছি—।’
হলের লোকজনকে পাশ কাটিয়ে ভাস্কর রাহা এগিয়ে গেলেন বারান্দার দিকে। দেবারতি পিছন পিছন আসছে। পিঠে ওর হাত টের পেলেন রাহা।
বারান্দার টবের পাশে এসে দাঁড়ালেন দুজনে। ‘কী যেন নাম?’ ফুল ফুটে আছে টবের গাছে। সাদা আর গোলাপি।
নীচে তাকালেই চোখে পড়ে হোটেল চত্বর। সেখানে গাড়ির আনাগোনা। চত্বরের শেষে কয়েকটা পাম গাছ, তারপর বাহারি রেলিং, আর রেলিং পেরোলেই বড় রাস্তা। রাস্তায় সাঁ-সাঁ করে ছুটে যাচ্ছে গাড়ি, বাস, মিনিবাস। হর্ন বেজে উঠছে থেকে থেকেই। বোঝা যায় জনজীবন কত ব্যস্ত।
ভাস্কর রাহার খুব কাছে এসে দেবারতি বলল, ‘ভাস্করদা, সরি, লাঞ্চের সময় একটু খেয়েছি—’ দু-আঙুলে মাপ দেখাল দেবারতি।
‘চায়ের জন্যে গলা শুকিয়ে কাঠ। জলদি বলো, কী তোমার সিক্রেট।’
চুরুটের আগুন নিভে গিয়েছিল। সেটায় বারকয়েক ঘন-ঘন টান দিয়ে রাহা যখন বুঝলেন লাভ নেই, তখন দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ছাই ঝেড়ে চুরুটটা পকেটে রেখে দিলেন। পরে আবার চেষ্টা করা যাবে।
‘ভাস্করদা, আমি একটা টপ সিক্রেট জানতে পেরেছি। শুনলে আপনার বিশ্বাস হবে না।’
ভাস্কর রাহার প্রশস্ত কপালে ভাঁজ পড়ল। কী সিক্রেট জানতে পেরেছে মেয়েটা? নাকি ওর স্বভাব অনুযায়ী ইয়ারকি মারছে?
দেবারতি মানি থেকে থেকেই লাউঞ্জের দিকে দেখছিল। সেখানে চা-কফির কাপ হাতে নিয়ে অতিথিদের জটলা।
বাতাসে ভাস্কর রাহার লম্বা চুল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। নভেম্বরের মাঝামাঝি, তাই শীতের ব্যাপারটা একটা ঠান্ডা আমেজের বেশি কিছু নয়। তবে বাতাসে ঝরাপাতার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
দেবারতি ঘাড়ের কাছে আলতো আঙুল চালিয়ে চুল ঠিক করার চেষ্টা করল। তারপর একটু চিন্তার সুরে বলল, ‘এটা জানাজানি হলে কনফারেন্স একেবারে মাটি হয়ে যাবে। খবরের কাগজগুলোয় নির্ঘাত ফ্রন্টপেজ নিউজ—’
তার মানে! কী বলছে মেয়েটা! নেশার ঘোরে ভুল বকছে না তো?
দেবারতির মুখ থেকে হালকা হুইস্কির গন্ধ পাচ্ছিলেন রাহা। তিনি জরিপ নজরে দেখতে লাগলেন মেয়েটাকে।
ভাস্কর রাহা কী ভেবে বললেন, ‘দেবারতি, আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবে?’
‘কী বলুন—।’
‘এসব সিক্রেট ব্যাপারগুলো এখন সিক্রেটই থাক। আর চারদিন পরেই এই কনফারেন্স শেষ—তখন যা হয় কোরো—।’
দেবারতি দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়াল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আপনি যখন বলছেন, তখন তাই হবে। ইউ আর দ্য বস—।’
প্রসঙ্গ পালটানোর জন্য রাহা জিগ্যেস করলেন, ‘আজকের গল্প তোমার কেমন লাগল?’
‘ওঃ, মিসেস মুখার্জি ওয়াজ গ্রেট। আমি ছোটবেলা থেকেই ওঁর লেখার ফ্যান। তবে রঞ্জন দেবনাথের লেখাও আমার ভালো লাগে। ভদ্রলোকের লেখায় শুধু একটাই গোলমাল—রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়ের অসম্ভব প্রভাব। এটা কেউ যদি ওঁকে স্ট্রেটকাট বলতে পারে তবে ওঁর পক্ষ ভালো হবে। কিন্তু জানেন তো, নাম-টাম হয়ে গেলে এই লেখকগুলো কেমন স্নব হয়ে যায়।’
‘দেবারতি মানি, তুমি কিন্তু আমাকে স্নব বললে—।’
‘ওঃ নো, ভাস্করদা। আপনি এসবের বাইরে। আপনি তো জানেন, এ আমার সাজানো কথা নয়। নাইনটি টু-তে আপনার টিভি ইন্টারভিউ নেওয়ার সময় আমি পাবলিকলি এ-কথা বলেছি।’ একটু থেমে দেবারতি ভাস্কর রাহার হাত চেপে ধরল। বলল, ‘ডিয়ার ওল্ড ম্যান, আই লাভ ইউ সো মাচ—।’
তারপর জোর পায়ে হেঁটে চলে গেল অতিথিদের ভিড়ের দিকে। ভাস্কর রাহা প্রাণবন্ত এই মেয়েটার চলে যাওয়া দেখলেন।
কী সিক্রেট জেনে ফেলেছে দেবারতি? এমন সিক্রেট যা জানাজানি হলে কনফারেন্স পণ্ড হয়ে যাবে, খবরের কাগজের হেডলাইন হয়ে যাবে!
ভাস্কর রাহা পকেট থেকে আধপোড়া চুরুটটা বের করে আবার ধরালেন। বিকেলের রোদ মরে গিয়ে সন্ধ্যা নামছে। রাস্তার ওপারের বাড়িগুলো ছায়া-ছায়া হয়ে গেছে।
মাথার লম্বা-লম্বা সাদা চুলে হাত বুলিয়ে তিনি ভাবলেন, দেবারতি মানি হয়তো তাঁর অনুরোধ রাখবে। কিন্তু চারদিন পরে ও যদি সেই ‘গোপন’ খবরটা ফাঁস করে তা হলেও কী বিপদ কম হবে!
ষাটের দশক থেকে বহু ঝড়ঝাপটা সহ্য করে রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্য আজকের এই অভিজাত জায়গায় উঠে এসেছে। গত তিরিশ বছরে লড়াই কম হয়নি। সমালোচক, সম্পাদক আর প্রকাশকদের অবজ্ঞা-উপেক্ষা ছিল নিয়মিত ব্যাপার। তাঁদের প্রায় সকলেরই বক্তব্য, ১৯৭০ সালে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় প্রয়াত হওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা সাহিত্যের শাখাটিরও অপমৃত্যু ঘটেছে। সাহিত্যের কোনও একটি শাখা যদি মাত্র একজন লেখকের ওপরে নির্ভরশীল হয়, তা হলে সেই শাখার অপমৃত্যু হওয়াই ভালো। সাহিত্যের এই শাখাটি সম্পর্কে যাঁরা ভাবেন, সেইসব সম্পাদক-প্রকাশকরা তো পরে অন্যান্য লেখককে সুযোগ দেননি, প্রশ্রয় দেননি, আশকারা দেননি! নামি পত্র-পত্রিকার সূচিপত্রে তো কোনওদিনই রহস্য-গোয়েন্দা গল্পের কোনও জায়গা ছিল না!
