অনামিকা উৎপলেন্দুর শেষ মন্তব্যটা ভালো করে শুনতে পায়নি। ও গলা বাড়িয়ে জিগ্যেস করল, ‘কী বললেন, উৎপলদা?’
উৎপলেন্দু ভাস্কর রাহার দিকে এক পলক তাকালেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন, ‘না…ওই অধ্যাপকদের ব্যাপার আর কী…।’
মঞ্চে তখন রতন বন্দ্যোপাধ্যায় গল্প পড়ছেন। প্রায় সকলেই মনোযোগ দিয়ে শুনছেন সেই গল্প।
গত বিশ বছর ধরে রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্য চর্চা করলেও রতন বন্দ্যোপাধ্যায় খ্যাতির পুরস্কার পেয়েছেন মাত্র দশ বছর। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা চল্লিশেরও বেশি। তার মধ্যে ছোটদের জন্য লেখা কিছু গল্প-উপন্যাসও আছে।
লেখনী চর্চার বহু আগে থেকেই শরীর চর্চা করতেন রতন বন্দ্যোপাধ্যায়। দু-বার নাকি ইন্টার কলেজ বক্সিং চ্যাম্পিয়ানও হয়েছেন। বক্সিং নিয়ে ওঁর লেখা দুটো উপন্যাস বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। এ ছাড়া একটা বক্সিং শেখার বই লিখেছেন।
এইসব কারণেই ভাস্কর রাহা অনেক সময় ওঁকে ঠাট্টা করে বলেন, ‘দাদা, আপনি হলেন আমাদের লাইনের সবচেয়ে শক্তিশালী লেখক।’
উত্তরে রতন হাসেন। বলেন, ‘যে-অর্থেই বলুন, ভাস্করবাবু, কথাটা কি খুব মিথ্যে!’
এ-সম্পর্কে উৎপলেন্দুর চাপা মন্তব্য : ‘শক্তিশালী তো বটেই! নইলে কি আর ওই ফোলিও ব্যাগের মধ্যে হাফ ডজন নানান সাইজের রেডিমেড লেখা নিয়ে সম্পাদক আর প্রকাশকের দপ্তরে দপ্তরে ঘোরা যায়!’
ভাস্কর রাহা মনোযোগ দিয়ে রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্প শুনছিলেন। উৎপলেন্দু তাঁকে কনুইয়ের খোঁচা দিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘কী বুঝছেন? ওরিজিন্যাল?’
মঞ্চের দিকে চোখ রেখেই ভাস্কর বললেন, ‘জন কোলিয়ারের একটা গল্পের আবছা ছায়া আছে।’
‘আপনার কাছে ছায়াটা আবছা মনে হতে পারে, তবে আমার কাছে ছায়াটা বেশ স্পষ্ট এবং লম্বা। ইংরিজি গল্পটা আমারও পড়া।’
ভাস্কর রাহা গল্পটা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন, কারণ প্রথম সুযোগেই রতন বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর কাছে গল্প সম্পর্কে মতামত চাইবেন। ‘মুকুটহীন সম্রাট’ হওয়ার এই জ্বালা!
রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়। বাংলা সাহিত্যের আগাথা ক্রিস্টি। গত পনেরো বছর ধরে একের পর এক চমকে দেওয়া গল্প-উপন্যাস লিখে চলেছেন। অথচ ওঁর প্রথম দিককার লেখা নিয়ে সমালোচকরা খুব একটা উৎসাহী ছিলেন না। আবার ইদানিং কয়েকটা লেখাও বেশ হতাশ করেছে।
রত্নাবলী গৃহবধূ। ফরসা গোলগাল গিন্নিবান্নি চেহারা। কথাবার্তায় মেজাজে একটু সেকেলে। তবে লেখায় ভীষণ আধুনিক। গত পাঁচ বছরে ওঁর উপন্যাস নিয়ে তিনটে হিট ছবি তৈরি হয়েছে। এখন একটা ছবি হচ্ছে হিন্দিতে। ওঁর উপন্যাস ইংরিজিতে অনুবাদ হয়ে ‘পেঙ্গুইন’ থেকে বেরিয়েছে। ওঁর লেখায় রহস্য-রোমাঞ্চ উপাদানের পাশাপাশি জীবন-দর্শন এমনভাবে জড়িয়ে থাকে যে মুগ্ধ হতে হয়। ভাস্কর রাহা বাংলা গল্প-উপন্যাস খুব বেছে পড়েন। রত্নাবলীর লেখা ওঁর খুব পছন্দের। তা ছাড়া ভদ্রমহিলা সংসারের নানান দায়দায়িত্ব সামাল দিয়ে কী করে যে সময় বের করে নিয়ে লেখেন কে জানে!
মঞ্চের দিকে রওনা হওয়ার আগে রত্নাবলী স্মিত হেসে পরিচিতজনদের দিকে এক ঝলক চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, ‘নতুন গল্প পড়ব—।’
রত্নাবলী চলে যেতেই অনামিকা পিছনের সারির দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘এই বয়েসেও প্রচুর লিখতে পারেন। হিংসে করার মতো।’
রতন বন্দ্যোপাধ্যায় তখন পরিতৃপ্ত মুখে ফিরে আসছেন নিজের চেয়ারে। ভাস্কর রাহার দিকে একবার উৎসুক চোখে তাকালেন। অর্থাৎ, গল্প কেমন লাগল। ভাস্কর রাহা ইশারায় জানালেন, পরে এ নিয়ে আলোচনা করবেন।
উৎপলেন্দু তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বললেন, ‘ওঁর গল্পটা নিয়ে কী আলোচনা করবেন? বলবেন, কোলিয়ারের লেখা থেকে ঝেড়েছে?’
রাহা হেসে ঘাড় নাড়লেন। বললেন, ‘উঁহু—প্রশংসা করব। বলব, খুব ভালো লেখা হয়েছে।’
উৎপলেন্দু ব্যঙ্গভরে বললেন, ‘বাঃ!’
রাহা এতটুকু বিচলিত না হয়ে বললেন, ‘এ ছাড়া কোনও উপায় নেই, উৎপল। আপনি কি চান, আমি ওঁকে বলি এখন থেকে ওরিজিন্যাল লেখা শুরু করতে! ওঁর লেখকজীবনের আর কতটুকু বাকি আছে! অনামিকা হলে সত্যি কথাটা বলতাম। বাংলা রহস্য সাহিত্যকে ওর এখনও অনেক কিছু দেবার আছে।’
অনামিকা গলা লম্বা করে জানতে চাইল, ‘কী বলছেন, ভাস্করদা?’
‘না, না—কিছু না। তুমি রত্মাবলীর গল্প শোনো।’
এমন সময় দেখা গেল অনিমেষ চৌধুরি ফিরে এসেছেন।
মানুষটা চেহারায় খাটো। বেশ গোলগাল চেহারা। মাথায় কোঁকড়ানো চুল। পরনে গেরুয়া রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবি আর ধুতি। কচমচ করে পান চিবোচ্ছেন। ঘামে তামাটে মুখ চকচক করছে। ইতি-উতি তাকিয়ে বোধহয় অনামিকাকে খুঁজছেন।
দু-সারি চেয়ারের ফাঁক দিয়ে অধ্যাপক চৌধুরি কোনওরকমে নিজের স্থূলকায় চেহারাটিকে টেনে নিয়ে আসছিলেন, উৎপলেন্দু তড়িঘড়ি তাঁকে কাছাকাছি একটা খালি চেয়ার দেখিয়ে দিলেন। অধ্যাপক অনামিকার কাছে আসতে চাইছিলেন। কিন্তু উৎপলেন্দু খালি চেয়ার দেখিয়ে দেওয়ায় ফাঁপরে পড়ে গেলেন। অনামিকাও চট করে দাঁড়িয়ে উঠে পেটমোটা চামড়ার ব্যাগটা বাড়িয়ে দিল অনিমেষ চৌধুরির দিকে।
‘অনিমেষদা, আপনার ব্যাগ—।’
অসহায়ভাবে ব্যাগটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা ‘হুম’ শব্দ করে ব্যাগটা ধরলেন অধ্যাপক। তারপর ব্যাগসমেত ধপাস করে খালি চেয়ারটায় বসে পড়লেন। একই সঙ্গে ‘ফোঁস’ করে একটা শব্দ করলেন।
