ভাস্কর রাহার কথায় তিনি প্রতিবাদ করে উঠলেন। বললেন, ‘আপনি হয়তো গল্পের আইডিয়া লোন নেন, ভাস্করবাবু, কিন্তু সবাই নেয় না। আপনি তো আমার বহু গল্প পড়েছেন। বলতে পারবেন, তার একটাও আমি বিদেশি গল্প থেকে আইডিয়া নিয়ে লিখেছি!’
রাহা হাসলেন। বললেন, ‘রতনদা, বয়েস কত হল?’
একটু থতিয়ে গিয়ে রতন বললেন, ‘সাতষট্টি—আপনার চেয়ে দু-বছরের বড়। কেন?’
ভাস্কর রাহা হেসে বললেন, ‘এখনও সেই বিতর্ক! পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে, না সূর্য পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে! আরে দাদা, আমার কাছে ”ঘুরছে” এটাই বড় কথা। সুতরাং আইডিয়া যেখান থেকেই আসুক, শেষ পর্যন্ত সাহিত্য হল কিনা সেটাই বড় কথা।’
উৎপলেন্দু চশমাটা নাকের ওপরে ঠিক করে বসালেন। তারপর ভাস্কর রাহার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে চাপা ঠাট্টার গলায় বললেন, ‘সে কী! আপনি অ্যাদ্দিন ধরে এ-লাইনে রয়েছেন, জানেন না রতন বাঁড়ুজ্জের সব গপ্পো-উপন্যাসই সেন্ট-পারসেন্ট ওরিজিন্যাল। সাহেবরা পর্যন্ত এ-কথা একবাক্যে স্বীকার করেছে।’
ভাস্কর রাহা ছোট্ট করে হাসলেন। উৎপলেন্দু বেশ মজা করে কথা বলতে পারেন। এর একটা কারণ বোধহয়, তিনি প্রায় তিরিশ বছর ধরে ‘রূপান্তর’ নাটকের দলের সঙ্গে অভিনেতা হিসেবে যুক্ত। লেখালিখি আর অভিনয়, এই নিয়েই আছেন। কিন্তু ষাটের দোরগোড়ায় এসে স্পষ্ট বুঝতে পারেন, দুটোর কোনওটাই তাকে কিছু দেয়নি। বরং আলেয়া হয়ে তিরিশ বছর ধরে তাঁকে অক্লান্ত ছুটিয়েছে, ছুটিয়েছে।
মঞ্চের ওপরে ঘোষক অনুষ্ঠানসূচি ঘোষণা করে রতন বন্দ্যোপাধ্যায়কে মঞ্চে আসতে অনুরোধ করল।
রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাঁ-দিকে বসেছিল পঞ্চাশ ছুঁই-ছুঁই লেখক অর্জুন দত্ত। সে নাকে সামান্য নস্যি গুঁজে রতন বন্দ্যোপাধ্যায়কে একরকম ঠেলা মারল, ‘রতনদা, চটপট যান। আপনাকে ডাকছে—।’
সম্মেলন উপলক্ষ্যে রতন বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে জামাইটি সেজে এসেছেন। স্বাস্থ্য ভালো হওয়ায় তাঁকে বেশ মানিয়েছে। ধবধবে সাদা কোঁচানো ধুঁতি-পাঞ্জাবি। গলায় সোনার চেন। তার আশেপাশে পাউডারের ছোঁয়া। পাকা চুল ব্যাকব্রাশ করে আঁচড়ানো। সরু গোঁফজোড়া দেখলেই বোঝা যায় মালিক রোজ এদের যত্ন নেন।
ফোলিয়ো ব্যাগ থেকে গল্পটি বের করে ব্যাগ চেয়ারে রেখে মঞ্চের দিকে হাঁটা দিলেন রতন। সামনের সারিতে বসেছিলেন বর্ষীয়ান রহস্য-রোমাঞ্চ লেখিকা রত্নাবলী মুখোপাধ্যায়। ওঁর পাশেই অনামিকা সেনগুপ্ত। ওঁরা দুজনে হেসে রতন বন্দ্যোপাধ্যায়কে উইশ করলেন।
উৎপলেন্দু লম্বা হাই তুলে বললেন, ‘নিন, এবার একটা ওরিজিন্যাল ক্রাইম গল্প শুনুন, ভাস্করবাবু।’
ভাস্কর রাহা হাত নেড়ে বললেন, ‘এত চটে যাচ্ছেন কেন? রতনদা সত্যিই হয়তো সব ওরিজিন্যাল লেখেন—।’
উৎপলেন্দু শুধু তাচ্ছিলের একটা ‘হুঁঃ’ শব্দ করলেন।
অনামিকা ঘাড় ঘুরিয়ে জিগ্যেস করল, ‘ভাস্করদা, অনিমেষবাবু আমার কাছে ব্যাগ রেখে কোথায় গেলেন বলুন তো! আধঘণ্টা হয়ে গেল—আমার তো কোল ব্যথা করছে।’
অনামিকার বয়েস অল্প। লম্বা, ফরসা, সুন্দরী। লেখালিখি করে কম, কিন্তু সেগুলো নামি পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়। দুজন প্রকাশকের ‘ঘর’ থেকে এ-বছরের শেষে ওর দুটো বই বেরোনোর কথা।
একটা চুরুট ধরানোর জন্য ভাস্কর রাহার ঠোঁট আর আঙুল নিশপিশ করছিল। কিন্তু এয়ার কন্ডিশনড বলরুমে স্মোক করার উপায় নেই।
তিনি বললেন, ‘সত্যিই তো! পান কিনতে যাচ্ছি বলে যে চলে গেল তা তো প্রায় চল্লিশ মিনিট হবে। এই অধ্যাপকগুলোর না কাণ্ডজ্ঞানের অভাব আছে! দাও, তুমি ব্যাগটা আমার কাছে দাও—।’
অনামিকা বলল, ‘না, থাক। এখুনি হয়তো এসে পড়বেন—।’
অনিমেষ চৌধুরি ইতিহাসের অধ্যাপনা করেন বাঙুর কলেজে। লম্বায় ছোটখাটো। তবে দৈর্ঘের খামতি পুষিয়ে দিয়েছেন প্রস্থ দিয়ে। তাঁর ব্যাগটির বপুও নেহাত কম নয়। ব্যাগ হাতে যখন তিনি হেঁটে যান তখন ভারি অদ্ভুত দেখায়।
ভাস্কর রাহা উৎপলেন্দুর দিকে তাকিয়ে জিগ্যেস করলেন, ‘এতক্ষণ ধরে প্রফেসর কী পান কিনছে বলুন তো?’
উৎপলেন্দু হাসলেন। বললেন, ‘দেখুন গিয়ে, সস্তার পান খুঁজতে-খুঁজতে হয়তো এ-গলি ও-গলি করে তিন কিলোমিটার পথ পার হয়ে কোথাও হারিয়ে গেছে।’
‘হ্যাঁ, যেরকম অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড…হতেও পারে…।’
‘থামুন তো, আর বলবেন না। অন্যের বেলা অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড, আর নিজের বেলা টনটনে জ্ঞান। দেখছেন না, ব্যাগ রাখার জন্যে কী সুন্দর কোল বেছেছে।’ শেষ মন্তব্যটা উৎপলেন্দু করেছেন চাপা গলায়।
সব কিছুতেই তেতো মন্তব্য করা উৎপলেন্দু সেনের একরকম স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে ওঁর সব মন্তব্যই যে উড়িয়ে দেবার মতো তা নয়। আসলে লেখালিখিতে ব্যর্থতা ওঁকে খানিকটা সিনিক করে তুলেছে। ওঁর চশমার পুরু কাচ অনেক বছর ধরেই ক্রোধ আর ঈর্ষায় নীল হয়ে গেছে।
এ-পর্যন্ত উৎপলেন্দুর মোট বারোটা বই বেরিয়েছে। তার মধ্যে ন-টা অনুবাদ, আর বাকি তিনটে নিজের লেখা। বইগুলো খারাপ চলেনি। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রকাশকরা কেন যে ওঁর লেখা ছাপতে চায় না কে জানে!
উৎপলেন্দুর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো ভাবছিলেন ভাস্কর রাহা। ওঁর সঙ্গে রাহার আলাপ প্রায় পঁচিশ বছরের। রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের অনেক ওঠানামা দেখেছেন দুজনে।
