এরপরই শুরু হল খোঁজ।
হোটেলের রিসেপশনের লোকজন বলল, মিসেস জোয়ারদারকে তাঁরা হোটেল ছেড়ে বেরোতে দেখেননি।
ফরাসি পুলিশ অফিসার মুচকি হেসে বললেন, আপনার স্ত্রী আপনার সঙ্গে হোটেলে এসে উঠেছিলেন তো!
কেউ বা বললেন, উনি হয়তো কোনও ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে ইলোপ করেছেন।
মধ্যবয়স্ক একটি মানুষ বিদেশ-বিভুঁই শহরে পাগলের মতো স্ত্রীকে খুঁজে বেড়াতে লাগল।
অবশেষে গ্র্যান্ড হোটেলের একজন পরিচারকের দেওয়া সূত্র ধরে নীতিন জানতে পারলেন, দুজন লোক তাঁর স্ত্রীকে একটা লাক্সারি সিডানে করে তুলে নিয়ে গেছে। সিডানটা যে-গলিতে পার্ক করা ছিল সেখানে গিয়ে নীতিন খুঁজে পেলেন রিনির ব্রেসলেট। কিন্তু তা সত্ত্বেও পুলিশ মানতে রাজি নয় যে, রিনিকে কেউ কিডন্যাপ করেছে।
হোটেলে ফিরে এসে হতাশভাবে বসে রইল একজন বিপন্ন মানুষ। নীতিন এখন কী করবেন? কার কাছে যাবেন সাহায্যের জন্য?
পরদিন ড. জোয়ারদারকে ফোন করল একজন অজ্ঞাতকুলশীল মানুষ।
ড. জোয়ারদার?
কথা বলছি।
আপনার স্ত্রী আমাদের কাছে রয়েছেন।
নীতিন জোয়ারদার পাগলের মতো হয়ে উঠলেন। একসঙ্গে অনেক প্রশ্ন করলেন অচেনা লোকটিকে।
তারপর জানতে পারলেন, ওরলি এয়ারপোর্টে তাঁর হাতব্যাগটি পালটে গেছে আর একজনের হাতব্যাগের সঙ্গে। সেই হাতব্যাগে একটা জিনিস আছে। সেটা নিয়ে এই লোকটির সঙ্গে কোথাও দেখা করে জিনিসটা দিলে ফেরত পাওয়া যাবে রিনিকে। আর নীতিন যদি পুলিশে খবর দেন তা হলে পাওয়া যাবে রিনির লাশ। এখন যেটা ড. জোয়ারদারের পছন্দ…।
অন্ধকার ঘরের বিশাল পরদায় বয়ে চলেছে রঙিন চলচ্চিত্র। রোমান পোলানস্কির রুদ্ধশ্বাস ছবি ‘ফ্র্যানটিক’-এর বাংলায় ডাব করা সংস্করণ। নায়ক ড. নীতিন জোয়ারদারের ভূমিকায় হলিউডের প্রখ্যাত অভিনেতা হ্যারিসন ফোর্ড। ‘সিরাজ’ হোটেলের বলরুমের আবছায়া অন্ধকারে বসে বিশিষ্ট দর্শকরা ছবি দেখছেন।
‘বার্ষিক রহস্য-রোমাঞ্চ লেখক সম্মেলন’ এইবার তৃতীয় বছরে পা দিল। উদ্যোক্তারা এ-বছরে কয়েকটি ক্রাইম ছবি দেখানোর ব্যবস্থা করেছেন। ফ্লিম আর্কাইভ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে ‘জিঘাংসা’ ও ‘চিড়িয়াখানা’। এ ছাড়া বাছাই করা কয়েকটি বিদেশি ছবি বাংলায় ডাব করে দেখানোর ব্যবস্থা হয়েছে। আজ, প্রথমদিনের ছবি ছিল ‘ফ্র্যানটিক’।
ছবি যখন শেষ হল তখন ঠিক পৌনে তিনটে।
বলরুমের সাবেকী ঝাড়লণ্ঠন জ্বলে উঠল। এ ছাড়াও অন্যান্য বাড়তি আলোয় ঝলমল করে উঠল চারদিক।
অজস্র সাদা ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে সুদৃশ্য মঞ্চ। সাদা ফুলের ঘন পটভূমিতে গল্পের গোয়েন্দা শার্লক হোমসের বিখ্যাত ছবি। মাথায় চেক-চেক টুপি। পরনে একই নকশার কোট। ঠোঁটে পাইপ। বাঁকানো লম্বা নাক। ব্যক্তিত্বময় প্রোফাইল। চোয়ালের শক্ত রেখা তাতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
কাঁধ পেরোনোর পরই প্রখ্যাত গোয়েন্দার ছবিটা শেষ। কিন্তু অনায়াসেই বাকিটা কল্পনা করে নেওয়া যায়।
অনেকক্ষণ আধো-আঁধারির পর হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠায় ‘বেঙ্গলি ক্রাইম রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর সভাপতি ভাস্কর রাহা চোখ পিটপিট করছিলেন। চোখের আর দোষ কী! ওদেরও তো বয়স প্রায় পঁয়ষট্টি হল! পাঁচ বছর আগেই ওদের রিটায়ার করা উচিত ছিল। কিন্তু পুরু লেন্সের চশমা ওদের প্রতি পদে সাহায্য করায় ওরা এখনও হাল ছাড়েনি।
হাল ছাড়েননি ভাস্কর রাহাও। সেই কোন কালে, বলতে গেলে কিশোর বয়েসে, লেখালিখি শুরু করেছিলেন। তারপর আর থামা হয়নি। নিষ্পাপ গল্প-কবিতার পথ থেকে কবে যেন পদস্খলিত হয়ে ‘অপরাধ’ জগতে পা দিয়ে ফেলেছিলেন। ব্যস, তারপরই ফেরা-যায়-না এমন বিন্দুতে পৌঁছে গেছেন। ‘অপরাধী’ সাহিত্য চর্চা করতে-করতে কখন যেন ডুবে গেছেন ‘পাপের বোঝায়’। আর কয়েক দশকের মধ্যেই জুটে গেছে কয়েকটা খেতাব। তার মধ্যে একটা হল ‘রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের মুকুটহীন সম্রাট’। একদিন রসিকতা করেই কলেজ স্ট্রিট কফি হাউসের আড্ডায় কথাটা বলেছিলেন উৎপলেন্দু সেন। তারপর সেটাই যেন কেমন করে টিকে গেছে।
‘হ্যারিসন ফোর্ডকে ড. নীতিন জোয়ারদার বলে ভাবতে বেশ কষ্ট হয়—’ ভাস্কর রাহার পাশ থেকে উৎপলেন্দু মন্তব্য করলেন।
রাহা উৎপলেন্দুর দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘ডাব করা ছবি দেখতে বসে এসব ভাববেন না, উৎপল। আমরাও তো গল্পের আইডিয়া যখন সাহেবদের থেকে লোন নিই তখন জোনাথানকে করি যতীন, ক্যাথারিনকে রীনা, আর রবার্টকে করি রবি। ধীরে-ধীরে এসব গা সওয়া হয়ে যাবে।’
বলরুমে সুন্দর করে সাজানো সারি-সারি আধুনিক চেয়ার। চেয়ারে আমন্ত্রিত অতিথিরা বসে আছেন। লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক, পাঠক, সাংবাদিক, ফোটোগ্রাফার—সব ধরনের অতিথিই হাজির হয়েছে এই সম্মেলনে। গত দু-বছরের তুলনায় এবারের সম্মেলনে জাঁকজমক ও আয়োজন একটু বেশি। কারণ, এবার বেশ কয়েকটি ভালো স্পনসর পেয়েছেন উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া এই সম্মেলন উপলক্ষ্যে প্রকাশকরা অন্তত তিরিশটি ক্রাইমজাতীয় বই প্রকাশ করেছেন। বলরুমের পাশের হলে একটি ছোট বইমেলারও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভাস্কর রাহার বাঁদিকেই বসেছিলেন রতন বন্দ্যোপাধ্যায়। অনুষ্ঠানসূচি অনুসারে এইবার শুরু হবে গল্প পাঠ। চারজন লেখক গল্প পড়বেন, তারপর সেই গল্পগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। চারজনের মধ্যে প্রথম নামটিই রতন বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
