সংস্কৃতের ডাকসাইটে অধ্যাপক প্রফেসর কিফেল বহু বৎসর রাইনের পারে বাস করেছেন। একদিন আমি যখন রাইনের পাড়ে বসে আত্মচিন্তায় মগ্ন তখন তিনি আমার পাশে এসে বসাতে আমার ধ্যান ভঙ্গ হল। তিনি শুধালেন, রাইন আজ কী রকম? আমি বললুম, নদীর এপার ও-পার দু-পারই তো বেশ পরিষ্কার কিন্তু ঠিক জলের উপরটা কেমন যেন ঝাপসা ঝাপসা দেখায়। প্রফেসর বললেন, সে প্রায় গোটা বছর ধরেই চলে। তাই যেসব আর্টিস্ট রাইনের ছবি এঁকেছেন তাঁরাই রাইনের ঠিক উপরটা যেন সামান্য কুয়াশাঢাকা ঝাপসা ঝাপসা এঁকেছেন। এ বাক্যালাপের পর আমি রাইনের বহু ছবি দেখেছি। প্রফেসরের কথা ন-সিকে খাঁটি।
আজও তাই লটেকে দেখতে পাচ্ছি ঠিকই। কিন্তু মাঝে মাঝে কেমন যেন ঝাপসা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। চাঁদের আলো আজ রাতে তেমন উজ্জ্বল নয়। কিন্তু সে আরও কুহেলির গ্লানি ছিন্ন করে মাঝে মাঝে তার মুখের রেখা স্পষ্ট করে দিচ্ছে। কপালের উপরকার অতি সামান্য ঘাম তখন চিকচিক করে ওঠে। আর চিকচিক করে ওঠে তার অতি কৃষ্ণ কুন্তলের মাঝখানে তুষারশুভ্র সীমান্তরেখা। এরকম শুভ্র সিতের সমন্বয় তো আমাদের দেশে চোখে পড়ে না। মাঝে মাঝে আমার দিকে এক ঝলক তাকায় আর একটুখানি মুচকি হাসে।
শুধাল, কই? আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না!
মুশকিল! বললুম, তুমি কী প্রশ্ন শুধাতে চাও সেটা আমি এতক্ষণ চিন্তা করতে করতে হঠাৎ আমার একটি কবিতা মনে পড়ে গেল। তাই সমস্যাটার কোনও শেষ সমাধানে পৌঁছতে পারিনি। কখনও পারব বলে মনেও হয় না।
আমি বলব?
বল।
তুমি বাকি জীবন এই গোডেসবের্গ-মেলেমে কাটাবে না, সে আমি জানি। কিন্তু কদিন এখানে থাকবে সেটা আমি বার বার জিগ্যেস করতে গিয়ে থেমে গিয়েছি। যদি হঠাৎ বলে বসো, কালই চলে যাচ্ছ, তখন কী? এটা বলতে তোমার তো এতটুকু বাধবে না সে আমি ভালো করেই জানি। তোমার হৃদয়ে যে রত্তিভর মায়ামহব্বৎ নেই সে আমি ভালো করেই জানি। আর সত্যি বলতে কী, তোমার-আমার অদৃষ্ট সুপ্রসন্ন যে চাঁদের আলোতে ঘুম ভেঙে যাওয়ায় একদা জানালার পাশে এসে আমি দেখি, তুমি ছুটে চলেছ মায়ের চিঠি ডাকে ফেলতে। তুমি যদি সেদিন রহস্য করে যা লোকে আকছারই করে থাকে, বলতে হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ, এই– এই প্রিয়ার চিঠি ডাকে ফেলতে যাচ্ছি
আমি বাধা দিয়ে বললুম, ছিঃ! দশ বছরের বাচ্চা মেয়েকে কেউ কখনও এরকম কথা বলে?
লটে অবাক হয়ে বলল, কেন? সবাই তো বলে, সক্কলের সামনে!
আমাদের দেশে বলে না।
সেকথা থাক! আসল কথা তুমি যে তোমার মাকে খুব ভালোবাস সেটা আমাকে বড় আনন্দ দিয়েছিল সেদিন। ওইটুকু ছিল বলে–
কাকে-চিলে ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে উধাও হয়ে যায়নি।
মানে?
অতি সরল, অর্থাৎ এমনই পচা জিনিস যে কেউ তার দিকে ফিরেও তাকাবে না। পচা জিনিসের প্রতি লোভ কার? কাকের-চিলের। কিন্তু একটা কথা তোমাকে বলি, লটে, যদি প্রতিজ্ঞা কর, আমি যা বলতে যাচ্ছি, সেটা নিয়ে তার পর তুমি আমার সঙ্গে কোনও আলোচনা জুড়বে না, কোনও প্রশ্ন শুধোবে না।
প্রতিজ্ঞা করছি।
গলায় দরদ ঢেলে বললুম, তুমি বড় লক্ষ্মী মেয়ে লটে। তা হলে বলি। আমি আমার মাকে জানা-অজানায় যতখানি কষ্ট দিয়েছি অন্য কেউ সেরকম দিয়েছে কি না বলতে পারব না। আর আমি আমার জীবনে যা-কিছু দুঃখকষ্ট পেয়েছি সে শুধু মাকে কষ্ট দিয়েছিলুম বলে তার শাস্তিস্বরূপ, সেকথা জানি। ব্যস, এ বিষয়ে আর কোনও কথা না। এবারে তোমার কথার উত্তর দিই। আমি গোডেসবের্গ ছেড়ে কাল যাচ্ছিনে, পরশু যাচ্ছিনে, তরশুও না।
খুশিতে গলা ভরে বললে, বাঁচালে। তার পর মনমরা হয়ে শুধাল, তরশুর পর?
আমি গম্ভীর হয়ে বললুম, লটে, তোমার কথা শুনলে যে কোনও লোক ভাববে যেন কোনও বাচ্চা মেয়ে জীবনে এই প্রথম প্রেমে পড়েছে।
নিশ্চিন্ত মনে লটে বললে, তা ভাবুক না। আমার তাতে কী? যে জিনিসের মূল্য না বুঝে কিংবা নিজেদের এঞ্জেলের মতো মনে করে দম্ভভরে কতকগুলি পাড় ইডিয়ট হাসি-ঠাট্টা করে তার গায়ে তাতে করে কোনও ক্ষত হয় না।
আমি উৎসাহভরে বললুম, দাঁড়াও, দাঁড়াও, তোমার কথাতে আমার গুরুর একটি আপ্তবাক্য মনে হল। শোনো, শোনো।
বাহুর দম্ভ, রাহুর মতো, একটু সময় পেলে
নিত্য কালের সূর্যকে সে এক-গরাসে গেলে,
নিমেষ পরেই উগরে দিয়ে মেলায় ছায়ার মতো,
সূর্যদেবের গায়ে কোথাও রয় না কোনও ক্ষত।
হায়, অনুবাদে কি আর সে রস আসে, সাধে কি বিবেকানন্দ বলেছেন, অনুবাদ– সে তো কাশ্মিরি ডিজাইনের উল্টো দিকটা দেখার মতো।
লটে বললে, মূর্খ মূর্খ মূর্খ, কী ভাববে সবাই? বুড়ি লটের ভীমরতি ধরেছে, এইবারে দেখে নিও। কী কেলেঙ্কারিটাই না হয়। ড্যাং ড্যাং করে লাফাতে লাফাতে হের সায়েডকে বগলে চেপে চলল লটে মন্তে কালো কিংবা হাওয়াই দ্বীপে। জব্বর অপারেশন করিয়ে মুখের চামড়া টান-টান করাবে। পাকি-পাকছি পাকি-পাকছি চুলের উপর লাগাবে তিন পলস্তরা কলপ
তা হলে?
তা হলে? এই যে তুমি তিন দিন থাকবে আমি কি তোমার পিছন পিছন ছোঁক ছোঁক করব নাকি? তোমার গায়ে পোস্টেজ স্ট্যাম্পের মতো সেঁটে রইব নাকি।
গেল গেল চিৎকার করে উঠলুম আমি। কী যেন কী একটা ভাসন্ত জিনিসের সঙ্গে ভেলা খেয়েছে জব্বর এক ধাক্কা ॥
.
৩৩.
জর্মন কবি গ্যোটেকে নিয়ে যত গবেষণা আলোচনা হয়েছে, রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার শতাংশের একাংশ হয়েছে কি না সন্দেহ। অথচ জর্মন সাহিত্যে গ্যোটে ছাড়াও এমন সব কবি রয়েছেন যাঁদের দু-চারজনকে পেলে আমাদের সাহিত্য বর্তে যেত। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও তাই অল্প বয়সেই জর্মন কবি হাইনের গুটিকয়েক কবিতার বাঙলা অনুবাদ করেন। লোকে বলে গ্যোটের সম্বন্ধে জর্মনে তথা পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাতে এত বেশি আলোচনা টীকা-টিপ্পনী করা হয়ে গিয়েছে যে আজ নয়, প্রায় অর্ধশতাব্দী পূর্বে এক ছোকরা গবেষক তার ডকটরেটের জন্য অন্য কোনও সবজে না পেয়ে থিসিস লেখে গ্যোটে ও দম্ভশূল বিষয়ের ওপর। তার বক্তব্য ছিল গ্যোটের কাব্যে যেসব বিষাদময় নৈরাশ্যব্যঞ্জক অনুভূতি আমরা পাই, তার অধিকাংশই কবি রচনা করেছেন যখন তিনি দাঁতের কনকনানিতে কাতর, কিংবা কাতর না হলেও সেটা তাঁকে স্বস্তিতে আপন রুচি অনুযায়ী (কলকাত্তা-ই হিন্দিতে যে রকম বলে আপন রুচি খানা) কবিতা রচনা করতে দিত না। দন্তরুচি অনুযায়ী অর্থাৎ দাঁতের যা রুচি, সেই অনুযায়ী লিখতে বাধ্য হতেন, অর্থাৎ পর রুচি খেতেন। এখানে আমি অবশ্য দন্তরুচি প্রচলিত দাঁতের সৌন্দর্য অর্থে ব্যবহার করিনি। এবং দাঁতের রুচি যে কী হতে পারে সেটা ভুক্তভোগী পাঠক নিশ্চয়ই আমার নিবেদন শেষ হওয়ার বহু পূর্বেই দন্তরুচি বিকশিত করে সহাস্য আস্যে অনুমান করে নিয়েছেন।
