এসব অবশ্য বাড়াবাড়ি। কিন্তু আমরা সকলেই জানি, নদী এবং প্রধানত পদ্মই রবীন্দ্রনাথের জীবনের কতখানি বৃহৎ অংশ অধিকার করে তাঁকে সুখে-দুঃখে সঙ্গ দিয়েছে। এমনকি শান্তিনিকেতনে ব্রহ্মচর্যাশ্রম স্থাপন করার পর থেকে পদ্মার সঙ্গে তার যোগসূত্র ক্ষীণতর হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কাব্যজগতে সে বিরাট নদী চলে নিরবধি। ক্ষীণস্রোতা তো হয়ইনি, বরঞ্চ সে মৃন্ময়ী নদী তখন চিন্ময় রূপ ধারণ করে তাঁর জীবনদর্শনে প্রধানতম স্থান অধিকার করে নিয়েছে। তাই বৈতরণীর সম্মুখীন হওয়ার বহু পূর্বেই তিনি গেয়েছেন :
ওরে দেখ, সেই স্রোত হয়েছে মধুর,
তরুণী কাঁপিছে থর থর।…
তিনি চলবেন,
মহাস্রোতে
পশ্চাতের কোলাহল হতে
অতল আঁধারে– অকূল আলোতে।
নদী তরণীর দেশ বাঙলা দেশ। সে শুভদিন প্রত্যাসন্ন সেদিন ওই বাঙলা দেশের ভাবী পদ্মা-সন্তান রবীন্দ্রনাথ-পদ্মাতরণী রচনা করে বাঙলা দেশের চিন্ময়রূপ আলোকিত করবেন।
.
পদ্মার জলে স্নান করেছি, সাঁতার কেটেছি বিস্তর। কিন্তু নৌকো কুপোকাত হওয়ার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ কখনও নাকানিচোবানি খাইনি। একদা মিস মেয়ে যখন তার ড্রেন-ইনিপেক্টর রিপোর্টে ভারতবাসীর নোংরা স্বভাবের চুটিয়ে নিন্দা করেন তখন তদুত্তরে প্রাতঃস্মরণীয় লালা হরকিষণ লালের সুযোগ্য পুত্র শ্রীযুক্ত কানহাইয়া লাল গাওবা তার আংকল শ্যাম (Uncle Sham = ঝুট চাচা বা ঠক চাচাও বলতে পারেন) পুস্তকে প্রসঙ্গক্রমে মার্কিনদের স্বপ্নলোক ফ্রানসভূমি– মার্কিন প্রবাদে আছে অশেষ পুণ্যবান আমেরিকান পরজন্মে ফ্রান্সভূমিতে জন্মলাভ করে–তথা তথাকার জনসাধারণের বদখদ নোংরা স্বভাব সম্বন্ধে বক্রোক্তি করেন, সেই ফরাসি দেশ– যেখানকার আপামর জনসাধারণ নিতান্ত জাহাজডুবি ভিন্ন অন্য কোনও অবস্থাতেই স্নান করে না। কিন্তু আমি এমন কী পাপ করেছি যে এই রাতদুপুরে নৌকাডুবির ব্যবস্থা করে বরুণদেব আমাকে স্নান করাবেন– আমি তো হে, প্রভো, নিত্য প্রভাতে দিব্য স্নান করি। তদুপরি যে দুর্ভাবনা আমার মনের ভিতর চড়াৎ করে নেচে গেল সেটি শুনলে লেডি-কিলার মাত্রই আমাকে বর্বরস্য বর্বর ভিন্ন অন্য কোনও উপাধি দেবেন না– লটে সাঁতার জানে তো, আমি তো ব্রিটেনের প্রাক্তন মন্ত্রী নটবর মি. প্রফুমো নই যে মাঝরাতে রাইন নদীতে লটের সঙ্গে জলকেলি করব। হুঃ–
নদী জলে স্নান করাটা
বলেন গুণী, স্বাস্থ্যকর।
প্রাণটা আগে বাঁচাই দাদা,
জলকেলিটা তাহার পর ॥
কিন্তু উলটো বুঝলি রাম; লটে চেঁচিয়ে শুধাল, সায়েড, তুমি সাঁতার জানো তো?
বাঁচাল। কারণ যে সুরে প্রশ্নটা শুধাল, তার থেকে স্পষ্ট বোঝা গেল, লটে সাঁতার জানে, তার দুশ্চিন্তা আমকে নিয়ে। বদরপীর সোনাগাছির জন্মদাতা সোনা গাজি দু জনই পানির পীর, এবং মাঝি-মাল্লার ত্রাণকর্তা। এতক্ষণ মনে মনে উভয়কে স্মরণ করছিলুম; এখন বিস্তর শুকরিয়া জানালুম।
কিন্তু কোনও পীর, কোনও বরুণদেবের শরণ না নিলেও চলত। লটে দেখি খোলামকুচিখানা খাসা সামলে নিয়েছে। কিন্তু ধাক্কা লেগেছিল কিসে? কোনও বয়াতে নাকি? কিন্তু লটে আমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা বিলকুল বেকার মনে করে শুধাল, ভয় পেয়েছিলে নাকি?
না।
লটে তাচ্ছিল্যভরে বললে, এরকম তো আখছারই হয়। আর ছোট নৌকো তো বড় জাহাজের চেয়ে ঢের বেশি নিরাপদ। নইলে বিরাট জাহাজ ডুবে গেলে মানুষ ক্ষুদে লাইফবোটে ওঠে কেন? তা হলে আগেভাগে ছোট নৌকো চড়লেই হয়। কিন্তু এ যুক্তিটা আমার আবিষ্কার নয়। কে যেন এক মিনি-নৌকো-পাগল দুদে আটলান্টিক শিকারি, বলতে গেলে ডিমের খোলায় চড়ে স্পেন থেকে পানামা না কোথায় যেন পৌঁছায়। সেখানে কেউ ওকে না থামালে হয়তো তার পর লেগে যেত প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিতে। তাকে নাকি হিটলার প্রশ্নটা শুধিয়েছিল। হয়তো লোকটার কথাই ঠিক। আমি কিন্তু ওরকম সাগর পাড়ি দিতে একা একা পারব না।
কেন, মেয়েরা একা কোনও কাজ করতে ভয় পায়, তাই?
কিছু জানো না তুমি সায়েড। একা একা বিস্তর কাজ করে থাকে মেয়েরা। কিন্তু ভয় পায় একা থাকতে। শারীরিক-মানসিক দুই অবস্থাতেই ভয় পায় একা থাকতে। এই যে ছোঁড়াছুঁড়িরা ধেই ধেই করে নৃত্য করছে, তাদের তিন কোয়ার্টার শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে চায়। কিন্তু আরেকটা একা থাকা সত্যই রীতিমতো বিপজ্জনক। আমাদের বাড়িটা দেখেছ তো– চতুর্দিক নির্জন। যে কোনও রাত্রে এমনকি দিনের বেলাও যে কোনও মহাপ্রভু মার্কিন স্টাইলে বাড়ি হানা দিতে পারেন হাতে পিস্তল চোখের উপর দুটো ফুটোওলা পট্টি। এবং মেয়েরাও কম যান না। পিস্তল ব্যবহার করতে মোটেই বাধে না। ব্যাঙ, ব্যাঙ, ব্যাঙ। ব্যস হয়ে গেল। তুমি দু-ভাঁজ হয়ে সামনের দিকে না, দড়াম করে নয়, চুবশে-যাওয়া বেলুনটার মতো ধীরে ধীরে কার্পেটের উপর গুটিয়ে পড়বে। তার পর রক্তগঙ্গা–
আমি বাধা দিয়ে বললুম, লটে, তুমি বড় বেশি মার্কিন ক্রিমি পড়েছ (ক্রাইম-নভেল, ক্রাইম-টেলিভিশনের মার্কিনি এই শব্দটি জর্মনরা গোগ্রাসে গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশের লোক একটুখানি অলঙ্কার চাপিয়ে এস্থলে বলে, ঘামের ফোঁটায় কুমির দেখছ।
কথাটা তো চমৎকার। মনের খাতায় টুকে রাখলুম। কিন্তু তোমাকে যা বলছি সেটা একদম সত্যি। আচ্ছা, সবকিছু বাদ দিয়ে তোমাকে শুধোই, তুমি কখনও বাড়ারমাইনহ-গ্রুপ-এর নাম শুনেছ?
