এতক্ষণ অবধি দু জনার কারওরই কোনও আচরণে কোনও প্রকারের আড়ষ্টতা ছিল না। দু জনা একই সৃষ্টিকর্মের ভাবাবেশে নিমজ্জিত, একই আদর্শে অনুপ্রাণিত– একজন ডাইনামিক অন্যজন স্টাটিক। একজনের সে ভাব পরিবর্তন হওয়া মাত্রই সে পরিবর্তন ওর মনে সঞ্চারিত হল। মৃন্ময় দেহ সম্বন্ধে সে এই প্রথম সচেতন হল। সঙ্গে সঙ্গে তার চিত্তে উদয় হল, সঙ্কোচ ব্রীড়া লজ্জা। সঞ্চারিত হল দেহে।
অনুরোধের সঙ্গে সঙ্গে এ মেয়েটির বিবস্ত্র হওয়া, আর্টিস্ট যতক্ষণ স্কেচ করছিল আপন নগ্নদেহ সম্বন্ধে সম্পূর্ণ অচেতন থাকা, স্কেচ শেষে হঠাৎ আর্টিস্টের চোখের ভাবান্তর লক্ষ করে চিন্ময়ভুবন থেকে মৃন্ময়লোকে পতন– এ সবই সম্ভব হয়েছিল, তার একটিমাত্র কারণ সে ছিল জনপদবালা সরলা কুমারী।
হেরমান ঠিক সমে এসেই থামল। আমার দিকে তাকিয়ে বললে, বে-আদবি মাফ হয়। আমি একটু আসি।
আমি লটের দিকে তাকালুম। তার নয়ন মুদ্রিত। হেরমানের ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার শব্দ শুনে চোখ মেলে আমার দিকে গভীর স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে বললে, হেরমান অনায়াসে চিন্ময়-মৃন্ময়ে আনাগোনা করতে পারে। আমার অতখানি বুদ্ধি নেই, অতখানি স্পর্শকাতরও আমি নই। আমি অত্যন্ত সাদামাটা রাইনের কাদায় গড়া মানুষ। তবু বলব, হেরমান যেভাবে সমস্যাটা বুঝিয়ে বলল, এর পর হিটলারের প্রেম নিয়ে আলোচনা করা যায় না। লোকে বলে হিটলারের প্রেম, কিন্তু সে পঙ্কিল বস্তুটাকে প্রেম নাম দিতে হলে অনেকখানি কল্পনাশক্তির প্রয়োজন, ওটা আজ থাক।
খানিকক্ষণ ভেবে নিয়ে শুধাল, আজ চাঁদের আলোটা ঠিক তেমন উজ্জ্বল নয়, সেই সে-রাত্রে তুমি যখন রাইন গলট এক্সপ্রেসের তুফান বেগে চিঠি ডাকে ফেলতে যাচ্ছিলে। তবু নেই নেই করে কিছুটা তো আছে। আচ্ছা তুমি কখনও চাঁদের আলোতে ক্যানভাসের ফোলডিং বোট-এ রাইনের উপর ঘোরাঘুরি করেছ?
আমি বললুম, কেন?
আমাদের একটা আছে! যাবে?
আমি শুধালুম, সে তো বেশ কথা। হেরমান নিশ্চয়ই ভালো নৌকো বাইতে জানে– রাইনের পারে জন্মাবধি এতটা কাল কাটাল।
লটে খিল খিল করে হেসে বললে, তুমি কি ভেবেছ আমাদের ফোলডিং বোট স্বর্গীয় মানওয়ারি জাহাজ বিসমার্ক বা কুইন মেরি সাইজের জাহাজ। ওটাতে মাত্র দু জনার জায়গা হয়।
আমি বললুম, সর্বনাশ।
.
৩২.
কথায় বলে কানু ছাড়া গীত নেই। অবশ্য সে গীত শ্রীকৃষ্ণের শৌর্যবীর্য, তার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা এমনকি তিনি যে মথুরায় একাধিক বিবাহ করেছিলেন এবং হয়তো-বা এঁদের কোনও একজন বা একাধিক জনকে ভালোও বেসেছিলেন– এসব বিষয় নিয়ে নয়। সত্রাজিত দুহিতা সত্যভামার প্রতি তিনি যে বিলক্ষণ অনুরক্ত ছিলেন সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। মহাভারতে আছে, সত্যভামা কোপাবিষ্ট চিত্তে রোদন করিতে করিতে বাসুদেবের ক্রোড়ে উপবিষ্ট হইয়া তাহার কোপানল উদ্দীপিত করিলেন। এবং ফলস্বরূপ পরে যে হানাহানি আরম্ভ হয় সেটাতে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বিস্তর ভোজ এবং অন্ধক বংশের বীরদের বিনষ্ট করেন। কিন্তু প্রশ্ন, সত্যভামার প্রতি বাসুদেবের অনুরাগ নিয়ে কোনও কবি উচ্চাঙ্গের কাব্যসৃষ্টি করেছেন বা গীত গেয়েছেন একথা তো কখনও শুনিনি। কানুর গীত মানেই শ্রীরাধার উদ্দেশে কৃষ্ণের প্রেমনিবেদনের গীত এবং তার চেয়েও মধুরতর এবং বেদনায় নিবিড়তর–বিশ্বসাহিত্যে অতুলনীয়–কানুর বিরহে রাজার ঝিয়ারীর আর্তগীতি।
গোডেসবের্গ-মেলমের অতি কাছেই রাইনের দুটি অপরূপ সুন্দর দ্বীপ। অর্থাৎ লটেদের বাড়ি থেকে দূরে নয়। কিন্তু উজানবাগে।
হেরমান নৌকাটি ফিটফাট করে সেটাকে এক ধাক্কায় ভাটির দিকে ঢালু করে দিয়ে বেশ উঁচু গলায় বললে, বলি লটে, বেশি বাড়াবাড়ি কর না। রিভার-পুলিশ কাছেই। আমাদের স্টেশনে স্টেশনে যেরকম একদা সাইনবোর্ড সাবধানবাণী শোনাত পকেটমার নজদিকে হৈ। আমি বললুম, তবেই হয়েছে। বলেই ফিক করে আধগাল হেসে নিলুম।
তোমার কথায় আর আচরণে কোনও মিল নেই। এদিকে বলছ, তবেই হয়েছে, অর্থাৎ কাছেপিঠে রিভার-পুলিশ থাকলে আমাদের সর্বনাশ হবে। ওদিকে ঠোঁটের আলোতে খেলে গেল মোলায়েম হাসি। মানে খুশি। কোনটা ঠিক? হেঁয়ালি ছেড়ে কথা কও। তুমি চিরকালই বেখেয়ালি। অভদ্র ভাষায় বলতে হলে নির্ভয়ে বলব, তুমি আমার মনে আমার বুকে কী চলছে সে সম্বন্ধে উদাসীন। আচ্ছা, তুমি কি একবারের তরেও নিজের মনকে শুধিয়েছ, আমি তোমাকে সর্বক্ষণ কোন প্রশ্নটি, মাত্র একটি প্রশ্ন শুধোতে চাই? বল।
এর চেয়ে পকেট-বুক সাইজের ভেলা, মোচার খোলও অক্লেশে বলা যেতে পারে ত্রিসংসারে হয় না। জর্মন জাতটাই দুই একসট্রিম নিয়ে গেণ্ডেরি খেলতে ভালোবাসে, ক্ষণে আসমান ক্ষণে জমিন, ক্ষণে মোচার খোলা নৌকো ক্ষণে জেপেলিন। এ ভেলাটি সাইজে দেশের মাদ্রাজি মেসবাড়ির মাদ্রাজি উচ্চারণে হিন্দিতে চোট সে চোটা– তক্তপোশের যমজভাই দৈর্ঘ্যেপ্রস্থে। অবশ্য নৌকাটির হাল আর গলুইয়ের দিক দুটো উঁচল বলে সে দু-প্রান্তে তক্তপোশকে অবশ্যই হার মানায়। লটে হাল ধরে বসেছে একপ্রান্তে, আমি অন্যদিকে। দেশের কেঁদা নৌকোর সঙ্গে এ ভেলার আর একটা সর্বনাশা প্রাণঘাতী মিল আছে। কোঁদা নৌকোতে ওঠার সময় নৌকোর ঠিক মধ্যিখানে না বসলে, বসার পরও ডাইনে-বাঁয়ে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রির বেশি, হঠাৎ কাত হয়েছ কি অমনি নৌকো কুপোকাত। হাটবারে কচ্ছপকে চিৎ করে রাখে, আর ইনি হয়ে যান উপুড়। হ্যাঁ, হেরমান অতি নিশ্চিত তালেবর মাল। এ ভেলায় আর যা হয় করতে চাও কর কিন্তু ঢলাঢলিটি–উভয়ার্থে করতে যেয়ো না, বাপধন! আচ্ছা এক নয়া সেফটিবেল্ট আবিষ্কার করেছে রাম ঘুঘু হেরমান। ওদিকে আমি তো ঘুঘু দেখেই নাচতে শুরু। ফাঁদ তো, বাবা দেখিনি ॥–হেরমান যখন পার্কের বেঞ্চিতে বসার প্রোগ্রাম বাতিল করে দিয়ে কত না সোহাগভরে তরণীবিহারের প্রস্তাবটা পাড়লে তখন সে কত ধুরন্ধর বুঝতে পারিনি– পরে লটে বলেছিল।
