হেরমান বললে, ব্রাভো, ব্রাভো, ন-বউ বাঁচলে হয়।
এবার আমার চোপ বলার পালা। হেরমান যেন রণাঙ্গনে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়ে বলল, কেন? শুনতে পাবার মতো অধিকার আমার কাছে কি, বর্ণনাটা গেলবার মতো প্রাপ্তবয়স্ক হয়েছি কি, সে সিনেমাটা এ মার্কা না বি-মার্কা, জানতে পারি কি? কেন আর্টিস্টরা কি ন্যুড মডেল সামনে দাঁড় করিয়ে ছবি আঁকে না? আর দাঁড় করিয়েই বা বলছি কেন? আর্টিস্ট পিটলারের স্টুডিয়োতে যখনই গিয়েছি, তখনই দেখেছি, নিদেন গোটা তিনেক মডেল বার্থডে ফ্রক পরে কেউ বা কফি বানাচ্ছে, এখান থেকে দেশলাই আনছে, ওখান থেকে চিনিটা আনছে, সেখানে আতিপাতি খুঁজছে, কফির কৌটোটা গেল কোথায় শুধোচ্ছে, জানো তো আর্টিস্ট মাত্রই কী রকম মারাত্মক গোছ-গোছানোর নিট অ্যান্ড ক্লিন বেড়ালটির স্বভাব ধরেন– অন্যজন মুলারের আসন্ন প্রদর্শনীর জন্য ছবি খুঁজতে গিয়ে কখনও কাত হয়ে গড়াতে গড়াতে সোফার নিচে ঢুকছেন, কখনও-বা অর্ধ লফে জানালার চৌকাঠের উপর উঠে একটি বাহু সম্প্রসারিত করেছেন সর্বোচ্চ শেলফের দিকে, আমি তো ভয়ে মরি, হাতখানির প্রলম্বিত ওই টান-টান টানের ফলে দেহশ্রীর উচ্চার্ধ না বক্ষচ্যুত হয়।
হেরমান সবিনয় বললে, তাই সই। বাকিটা সংক্ষেপে সারছি। কারণ তৃতীয়া মডেলটি সবাকার সেরা। সেই বিরাট স্টুডিয়োর মাঝখানে তিনি মেদ বৃদ্ধি নিবারণার্থে জিমনাস্টিক জুড়েছেন। আর সে যা তা জিমনাস্টিক নয়– ভারতীয় সাপুড়ে নাচ থেকে শুরু করে মিশরি বেলিডানস– নাভিকুণ্ডলীটি কেন্দ্র করে।
আর ওইসব হুরীপরীদের কর্মকলাপের মধ্যিখানা যেন তুর্কির পাশা জর্মন পিটলার তার খাস-প্যারা ডিভানটির উপর অঘোরে ঘুমঘোরে নাক ডাকাচ্ছেন। একদিন পিটুকে শুধিয়েছিলুম, মঞ্চের উপর মডেল ছিল… দাঁড়িয়ে আছেন সে না হয় বুঝি। কিন্তু কাজকর্ম করার সময় ওনারা জামা-কাপড় পরলে কী দোষটা হয়। পিন্টু বললে, আমি নাকি একটা আস্ত বুন্ধু। দুনিয়ার তাবৎ মেয়েই তো এমন কিছু আর্টিস্টের মডেলের মতো যাবজ্জীবেৎ ততকাল মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে সুখং জীবেৎ বরাত নিয়ে আসে না। ওরা হাঁটে, কাজ করে, উপ হয়ে এটা-সেটা কুড়োয়, পায়ের আট আঙ্গুলের উপর ভর দিয়ে নাগালের প্রায় বাইরের তাকটা থেকে আচারের বোয়াম নামায়। এগুলোও তো আঁকতে হয়– অবশ্য ফ্রক ব্লাউস তখন তাদের পরনে থাকে, আমিও তাই আঁকি। কিন্তু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্থান পরিবর্তন এবং তজ্জনিত নানাবিধ আন্দোলন নুডে না দেখা থাকলে ছবি ডাইনামিক হয় না। উদাহরণ দিয়ে পিট বলেছিল, গাছের যে ডালপালা– তার গতিবিধি হুবহু জানতে হলে গাছটাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হয়, যখন শীতকালে সে সর্ব পত্রবিবর্জিত নগ্ন।
আমি বললুম, তা হতে পারে। কিন্তু আর্টিস্টরা সবকিছু দেখে নিরাসক্ত নয়নে। নুড গাছ, নুড রমণীকে একই নিরাসক্ত নয়নে। কিন্তু আর পাঁচজন তো প্রভু খ্রিস্টের মতো নয়। তিনি বলেছেন, পাপনয়ন উপড়ে ফেল। আর বললে বিশ্বাস করবে না, আমাদের দেশের এক বেশ্যাসক্ত পাপী ওই উপদেশ না জেনেও জ্ঞানচক্ষু খুলে যাওয়াতে চর্মচক্ষু উপড়ে ফেলে। আশ্চর্য, প্রভু খ্রিস্ট উদ্ধার করলেন ভ্ৰষ্টা নর্তকী মারি মাগদেলেনকে আর ভ্রষ্টা নর্তকী চিন্তামণির উপদেশে উদ্ধার পেল পাপী বিল্বমঙ্গল। কিন্তু সেকথা থাক। আমি বলছি, তোমার বউ তো বিরাট ওকগাছ–
লটে : কী বললে! আমি ধুমসী মুটকী ওকগাছ?
আহা চটো কেনে? অন্য হাতটা আনতে দাও—
সে আবার কী জ্বালা?
পরে হবে, –কিংবা তুমি তন্বঙ্গী চিনার গাছও নও, তা হলে, বল বত্স, হেরমান, করি কী?
হেরমান : কে বললে তোমাকে, আর্টিস্টরা নিরাসক্ত নয়নে কুল্লে দুনিয়ার দিকে তাকায়? তা হলে কোনও নুডকে সরলা, কোনওটিকে চিন্তাশীলা, কোনওটিকে কামুকা, কোনওটিকে চিত্তপ্রদাহিণী, কোনওটিকে শান্তিদায়িনী আঁকে গড়ে কী প্রকারে? নিশ্চয়ই তাদের হৃদয়মনে ভিন্ন ভিন্ন ভাবোদয় হয়। অবশ্য পূর্ণ সিদ্ধা মডেল তার থোড়াই পরোয়া করে। সঙ অব সঙ- সঙ অব সলমন নামেও পরিচিত– ফিলিম দেখেছ? আমাদের ওই পাশের শহরে। কলোনের মেয়ে হিটলার-বৈরী রমণী মার্লেন ডিটরিষ সে ফিলিমের প্রধান নায়িকা। গাঁইয়া মেয়ে এসেছে শহরে পিসির দোকানে কাজ করতে। সেখানে এক ছোকরা ভাস্করের সঙ্গে মাত্র কয়েক মিনিটের আলাপ। ছোকরা পিসির ভয়ে বেরুবার সময় শুধু আঙ্গুল দিয়ে দেখাল– সামনের পাঁচতলার বাড়ির চিলেকোঠায় তার স্টুডিও। মেয়েটা মজেছে। সে রাত্রেই গেল আর্টিস্টের কাছে। আর্টিস্ট সত্যই মেয়েটিকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছে যেন সন্ধান পেয়েছে তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি, মাস্টারপিস সঙ অব সঙস সর্বগীতির সেরা গীতি ওরই ব্লড দিয়ে নির্মাণ করবে। অনুপ্রাণিত ভাষায় মেয়েটিকে তার আদর্শ, তার সর্বকীর্তির শ্রেষ্ঠতম কীর্তির কথা বলে বলে সেই সরলা বালার হৃদয়ে তার ভাবাবেগ সঞ্চারিত করল। অবশেষে অনুরোধ করা মাত্র সর্ব আবরণ খুলে ফেলে দাঁড়াল মঞ্চের উপর সে মেয়ে। দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য আর্টিস্ট ঊর্ধ্বশ্বাসে দ্রুততম গতিতে এঁকে যেতে লাগল প্রথম স্কেচ। সম্বিতে ফিরে এল স্কেচ শেষ হওয়ার পর। তখন এই সর্বপ্রথম, সে লক্ষ করল মেয়েটির দেহের সৌন্দর্য। তার চোখের উপর ফুটে উঠল সে ভাব-পরিবর্তন, মেয়েটি এক পলকেই সে আবেশ লক্ষ করল। সঙ্গে সঙ্গে পেল নিদারুণ লজ্জা। ছুটে গিয়ে সর্বাঙ্গ জড়াল, হাতের কাছে যা পেল তাই দিয়ে।
