অফিসার আরও আশ্চর্য হয়ে শুধোলেন, সে কী? তাঁর প্লেন তো দেখতে পেলুম না।
আমরা অন্য প্লেনে এসেছি। কিন্তু ব্যাপার কী?
অফিসার অত্যন্ত চিন্তান্বিত হয়ে বললেন, কেপটেন র্যোম আমাকে খাড়া হুকুম দিয়েছিলেন, আমি যেন এখানে কড়া চোখ রাখি, ফুরারের প্লেন দেখা গেলেই যেন তাকে ফোন করে খবর দিই। এখন করি কী?
বাওর বললেন, করার তো কিছুই নেই আর। ফুরার তো এতক্ষণে কেপটেন রোমের ওখানে নিশ্চয়ই পৌঁছে গিয়েছেন।
এস্থলে বলা প্রয়োজন, হিটলার সম্বন্ধে বিশেষ কোনও বই পড়া না থাকলেও একাধিক ফিলমের মারফত অনেক পাঠকই জানেন, এই কেপটেন রোমই হিটলারের সর্বপ্রধান অন্তরঙ্গ সখা যিনি হিটলারকে জর্মনির চ্যানসেলর রূপে গদিনশিন করার জন্য সর্বাধিক কৃতিত্ব দেখান। তাঁর অধীনে প্রায় পাঁচ লক্ষ নাৎসি যুবক আধা-মিলিটারি ট্রেনিং পেয়েছিল। হিটলার নাকি হঠাৎ খবর পান– কখন পান বলা কঠিন– যে র্যোম নাকি তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন, তাঁকে হটিয়ে স্বয়ং গদিতে বসবেন। তবেতে আছে, বিশেষ করে তাঁরই (র্যোমেরই) অনুগত পাঁচ লক্ষ নাৎসি– এদেরই নাম ব্রাউন শার্ট।
হিটলার তাই কাউকে কোনও খবর না দিয়ে, গোপন ব্যবস্থা করে হঠাৎ গোডেসবের্গ থেকে (সেখানে গিয়েছিলেন যেন পূর্বাভ্যাসমতো বিশ্রাম নিতে– আসলে র্যোমের চোখে ধুলো দেবার জন্য; অবশ্য র্যোমও কিছুটা সন্দেহ করেছিলেন বলে পূর্বোল্লিখিত অফিসারকে অ্যারপোর্টে মোতায়েন করেছিলেন) মনিকে পৌঁছে সোজা র্যোম যে হোটেলে স্বাস্থ্যোদ্ধার করছিলেন, সেখানে অতি ভোরে পৌঁছে তাঁকে অতর্কিতভাবে হামলা করে বন্দি করেন।
র্যোম এবং তাঁর নিতান্ত অন্তরঙ্গ ষড়যন্ত্রকারীদের গুলি করে মারা হয়।
লটে বললে, আবহাওয়ার যোগাযোগ তো আছেই কিন্তু আসল কথা এই, হিটলার যদি আপন প্লেনে আসতেন তবে সেই পাহারাদার অফিসার তৎক্ষণাৎ রোমকে জানাতেন। রোমও তৈরি থাকতেন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গকে জড়ো করতেন। কে জানে, আখেরে কী হত। হয়তো রোমই জিততেন। তা হলে কী হত? কে জানে? হিটলারের মতো র্যোম তো ফ্রানসের প্রতি বিরূপ ছিলেন না ভালোবাসতেন বললেও অত্যুক্তি হয় না।
আর জানো, সবকিছু ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার পর বাওর এই প্লেনের গুবলেট-কাহিনী হিটলারকে বলেন।
হিটলার নাকি প্রত্যুত্তরে বলেন, নিয়তি!
লটে বললে, আমি বলি, যোগাযোগ।
.
৩১.
আচ্ছা লটে, আর পাঁচজন জর্মনের মতো তুমি তো হিটলার-যুগটা একটা বিভীষিকা ভরা দুঃস্বপ্নের মতো ভুলে যেতে চাও না। তবে একটি কাহিনী আমি শুনতে চাই- বরঞ্চ বলা উচিত, আমি শুনতে চাই আর না-ই চাই, আমার দেশের ছেলেছোকরা মোকা পেলেই আমাকে শুধোয়, হিটলার বিয়েশাদি করলেন না কেন? তা সে করুন আর না-ই করুন ইউরোপে যখন দুধ সস্তা তখন গাই কিনে সেটার হেপাজতির বয়নাক্কা– ঝামেলা পোয়ানো মহা আহাম্মুকি– প্রেম-ট্রেমের দিকে তার কি কোনও প্রকারেরই ঝোঁক ছিল না?
লক্ষ করেছি, এ প্রশ্নে অনেক জর্মনই অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। কিন্তু লটে মেয়েটির সমঝ-বুঝ আছে। একদিকে যেমন খানিকটে ধরিটানিজম আছে, অন্যদিকে কথাপ্রসঙ্গে যদি প্রেম এমনকি আলোচনা দৈহিক কামনার দিকে মোড় নেয় তবে সে সবসময় নাসিকা কুঞ্চিত করে না। এমনকি মাঝে মাঝে হাজার ভলটের প্রাণঘাতী শকও দিতে জানে। যেমন আমাদের তিনজনাতে বেশ যখন জমে উঠেছে তখন লটে বেশ রসিয়ে রসিয়ে য়োহানেস-আঙনেস-আমার মান-বিহারের বিপর্যয় কাহিনী হেরমানকে শোনাল। হেরমান কৌতুকভরে আমাকে শুধাল, আচ্ছা সায়েড, সবই তো হল কিন্তু ঝোঁপের আড়াল থেকে অষ্টাদশী আঙনেসের বার্থডে ফ্ৰকপরা যে অনাবিল সৌন্দর্য
ঝোঁপের ভিতর দিয়ে আসার সময় কাহিনী বলতে বলতে যখন এই অঙ্কে পৌঁছই তখন যে রকম রসভঙ্গ করে লটে ধমক দিয়ে বলেছিল চোপ, এস্থলে সেটা তদ্বৎ।
আমি হেরমানের দিকে তাকিয়ে করুণ কণ্ঠে ফরিয়াদ জানালুম, ভায়া হেরমান, আড়াল থেকে মাত্র দুটিবার এ জীবনে নগ্ন সৌন্দর্য দেখবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল–
ঠোঁটকাটা হেরমান শুধলে, আর মুখোমুখী?
লটে ফের ধমকাল, চোপ! এ- চোপেতে আমার সর্বান্তঃকরণের সম্মতি।
রূঢ়বাক্য প্রয়োগের বেলায় লটের শব্দভাণ্ডার বড়ই বাড়ন্ত। অনুমান করলুম, প্রাচীনদিনের সেই নবীনা লটে নানা অনাবশ্যকীয় কিন্তু অনিবার্য পরিবর্তন সত্ত্বেও সেই লটে এখনও শান্তা নাম নিতে পারে। কাউকে ধমক-টমক দিতে দিতে কড়া কথার স্টক বড় একটা বাড়াতে পারেনি।
আমি হেরমানকে করুণতর কণ্ঠে বললুম, শুনলে ভাইয়া, শুনলে? দেখলে, কী মারাত্মক পুরিটান, ঝুরঝুরে সেকেলে পদি পিসি!
লটে স্থির নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, আমার সঙ্গে যুগ অভিসারে বেরিয়েছ আমারই বাড়ির সামনেকার কুঞ্জবনে–।
আমি মনে মনে খানিকটে আমেজ করে গুনগুনালুম,
আমার বঁধুয়া আন বাড়ি যায়
আমারি আঙ্গিনা দিয়া।
লটে বাক্যের শেষাংশ পুনরাবৃত্তি করে বললে আমারই বাড়ির সামনেকার কুঞ্জবনে, আর আমাকে শুনতে হবে, কান ভরে শুনতে হবে, প্রাণভরে আ মরি-আ মরি বলতে হবে আংনেসের নগ্ন সৌন্দর্যবর্ণনার প্রতিটি শব্দ যখন আমার কানের পর্দাতে কটাং কটাং করে হাতড়ি ঠুকবে। ভেবো না আমি হিংসুটে। নগ্ন সৌন্দর্যের বর্ণনা যে কোনও পুরুষ যে কোনও রমণীর এবং ভাইস-ভার্সা দিক। আমার তাতে বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই– তা সে বিন্দু সরেসতম নেপলিউন ব্রান্ডিরই হোক আর নিরেসতম জাপানি বিয়ারেরই হোক; কিন্তু তুমি যদি দিতে চাও– তা সে তোমার জীবনে প্রথমবারের মতোই হোক, আর শেষবারের মতোই হোক-তুমি দেবে আমায় রইল কথা।
