মধু তার নিজ মূল্য নাহি জানে,
মধুকর তারে না বাখানে।
আসলে লটে কী করে জানবে, সামান্য কয়েক গ্লাস ওয়াইন খেতে না খেতে তার গাল দুটি আরও টুকটুকে হয়ে গিয়েছে। দেখতে পাচ্ছে হেরমান, লক্ষ করছি আমি। লটে জানবে কী করে? আমাদের দেশের সাধারণ জনের বিশ্বাস, ইউরোপের মেমসায়েবরা সায়েবদেরই মতো জালা জালা মদ গিলে ধেই ধেই নৃত্য করে। দ্বিতীয়টা সত্য। পুরুষের তুলনায় মেয়েরা নাচতে ভালোবাসে বেশি (কাষ্ঠরসিকরা তার সঙ্গে আবার যোগ দেন, বাচ্চা বয়সে তারা আপন খেয়াল-খুশিতে নাচে; একটু বয়স হওয়ার পর বেকুব পুরুষগুলোকে নাচায়) কিন্তু মদ তারা খায় পুরুষের তুলনায় ঢের ঢের কম। কেন কম খায়, সে এক দীর্ঘ কাহিনী। তবু একটা ইঙ্গিত দিতে পারি; কাচ্চাবাচ্চা হওয়ার সম্ভাবনা লোপ পাওয়ার পর অনেক মেয়েছেলেই পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মদ খেতে শুরু করে এবং বিস্তর পয়সাওলী বৃদ্ধা খাটে শুয়ে শুয়ে রাত বারোটা অবধি খাসা টুকুস ঢুকুস করে। লটের এখনও বাচ্চা হতে পারে কি না বলা কঠিন অসম্ভব নয়। তবে একথা ঠিক, লটের ওয়াইন চুকুস চুকুস করার কায়দাকেতা থেকে পষ্ট মালুম হয়, ও রসে এ গোবিন্দদাসী বঞ্চিত না হলেও আসক্তা তিনি নন। তাই কুল্লে আড়াই গ্লাস চুষতে না চুষতেই তার গোলাপি গাল দুটি হয়ে গিয়েছে টুকটুকে লাল– বুড়িদের নাক হয়ে যায় বিচ্ছিরি কোণী ঘেঁষা লাল।
হেরমান নির্ভয়ে বললে, হের সায়েড তার দেশের কী এক মাছের বিরাট বয়ান দিয়ে বলেছিল না, সে মাছ যে খায় না সে মূর্খ। তোমার গাল দুটি যা টুকটুকে লাল হয়েছে– মনে হয় ঠোনা দিলেই ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটবে– সে গালে একটুখানি হাত বুলিয়ে দিতে যে লোকের ইচ্ছে হয় না সে মূর্যের চেয়েও মূর্খ, গবেট, গাড়ল এবং বর্বর।
লটে আমার দিকে তাকিয়ে শুধাল, আর তুমি সায় দিচ্ছিলে?
আমি ঘাড় চুলকোতে চুলকোতে এ পোড়ার দেশে আবার টাইট কলারের চাপে আপন অপ্রতিভ ভাবটা যথারীতি পাকা ওজনে চুলকোনোও যায় না– নানা প্রকারের অস্কুট আনুনাসিক মার্জার সুলভ আঁও এ্যাও করতে করতে বললুম, তা, –সে– এটাতে– সত্যি বলতে কী, এহেন দুরাকাঙ্ক্ষা যদি আমার হৃৎকন্দরে অঙ্কুরিত হয় তবে সেটা এমনকি অন্যায় হল বল তো। তোমাদের দেশেই তো, বাপু, প্রবাদ আছে, বেড়ালটা পর্যন্ত খুদ কাইজারের দিকে তাকাবার হক্ক ধরে।
আমি মনে মনে ভাবছিলাম, লটে বোধহয় বিরক্ত হয়েছে।
ওমা, কোথায় কী! লটে চটেনি।
বললে, আমার বয়স পঞ্চাশ বুড়ি হতে আর ক বছর বাকি?
আমি গম্ভীর কণ্ঠে বললুম, জর্মনিতে বুড়ি নেই। এ দেশে কেউ বুড়ি হয় না।
মানে?
এ তত্ত্বটা আমি শিখি এই গোডেসবের্গ শহরেই। তোমার মনে আছে, আমাদের সেই ফুলওলা? সবে এখানে এসেছি, তার সঙ্গে আলাপ হয়নি। ইতোমধ্যে মার পেটে কী যেন একটা হল। জব্বর অপারেশন করলেন কলোন থেকে এসে ডাকসাইটে এক সার্জন।
লটে বললে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, আমার পষ্ট মনে আছে। আমাদের পাড়ার হাসি-খুশি তখন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
একদম খাঁটি কথা। আমার মা যখন সেরে উঠছেন তখন ভাবলুম, কিছু ফুল নিয়ে যাই। ঢুকলুম সেই ফুলের দোকানে। সেই ছোকরা প্রায় আমার বয়সী তো উল্লাসে প্রায় নৃত্যমান। বার তিনেক জপ-মন্ত্রের মতো গুটন্ মর্গন বলতে বলতে শুধালে, আপনার ইচ্ছে? আদেশ করুন। এবং পূর্ববৎ অদৃশ্য সাবানে হাত কচলাতে লাগল।
জর্মন ফুলের তত্ত্ব তখনও কিছু জানিনে। কোন ফুল নিলে ভদ্রদুরস্ত হয় সে বাবদে আরও অজ্ঞ। তাই কিন্তু কিন্তু করছি দেখে অতিশয় লাজুক খুশিভরা মুখে বলল, স্যর, কিছু মনে করবেন না। কে, কার জন্য, কোন ফুল নেবেন কি নেবেন না, সে সম্বন্ধে কোনও প্রকারের কৌতূহল দেখানো আমার পক্ষে, সর্ব ফুলবেচনেওলার পক্ষে অমার্জনীয় অপরাধ। তাই, হেঁ হেঁ, কিছু মনে করবেন না, যদি সামান্যতম ইঙ্গিত দেন–
আমার বয়স তখন আর এমন কী। লজ্জা পেয়ে থতমত হয়ে তোতলালুম, না, না, সেরকম কিছু নয়। আমি ফুল কিনব একজন অসুস্থ বৃদ্ধা
সঙ্গে সঙ্গে যেন কেউ তার উদোম পিঠে সপাং করে বেত মেরেছে– কোঁৎ করে ককিয়ে বললে, এমন কথাটি বলবেন না, স্যর।
আমি তো রীতিমতো ভীতসন্ত্রস্ত। নাচতে গিয়ে আবার কোনও এটিকেট নামী মহিলার পা মাড়িয়ে দিয়েছি।
কোমরে দু ভাঁজ হয়ে বাও করে বিনয় কণ্ঠে বললে– আপনি বিদেশি; তাই জানেন না, আমাদের এই ডয়েশনট ঝুবার আলেসের দেশে, বিশেষ করে এই সুর-কানন সুন্দর রাইনল্যান্ডে কোনও বৃদ্ধা, এমনকি প্রৌঢ়া মহিলাও নেই। কস্মিনকালে হয়নি, হবেও না। বলতে হয় বর্ষীয়সী এবং সর্বোত্তম পন্থা, কিঞ্চিৎ হেঁ হেঁ করে যেন বড়ুই অনিচ্ছায়। বলছেন, এই একটুখানি বয়স হয়েছে আর কি। সেই আমার প্রথম শিক্ষা। তাই বলি, পঞ্চাশ! ছছাঃ! সে আর এমন কী বয়স!
লটে বললে, পিরামিডের তুলনায় তেমন আর কী?… সেই যে বলছিলুম, আর বচ্ছর যখন আমি মনিক গিয়েছিলুম।
আমি উৎসাহিত হয়ে বললুম, হ্যাঁ, হ্যাঁ, হিটলার, যোগাযোগ, ড্রেজেন হোটেল এসব দিয়ে কেমন যেন একটা ক্রসওয়ার্ড পাজল বানাচ্ছিলে?
ম্যুনিকে পরিচয় হল এক ভদ্রলোকের সঙ্গে, পরবের শেষ পার্টিতে। কথায় কথায় বেরিয়ে পড়ল, তিনি হিটলারের যে অ্যারোপ্লেন পাইলট ছিলেন বাওর, তার নিকট-আত্মীয়। আমাদের মধ্যে কে যেন আশকথা-পাশকথার মাঝখানে যোগাযোগের মাহাত্মের প্রতি ইঙ্গিত করেছিল। আত্মীয়টি তখন বললেন, এই যে পাঁচ বছর ধরে পৃথিবীর বীভৎসতম যুদ্ধ হয়ে গেল, কত নিরপরাধ ইহুদি কনসানট্রেশন ক্যাম্পে মারা গেল, বমিঙের ফলে হাজার হাজার নারী-শিশু মারা গেল এর কিছুই হয়তো শেষ পর্যন্ত ঘটত না, যদি না সামান্য একটা যোগাযোগে একটুখানি গোলমাল হয়ে যেত। তার পর বিশেষ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি গডেসবের্গের বাসিন্দা বললেন না, সেই গডেসবের্গের ড্রোজেন হোটেলে গিয়ে উঠেছেন হিটলার। তারিখটা ২৯-এ জুন ১৯৩৪। আমার আত্মীয় বাওর বলেন, হিটলারের আশু প্রোগ্রাম সম্বন্ধে কেউই বিশেষ কিছু জানত না। তবে হিটলার তাঁকে বলে রেখেছিলেন, তাঁর প্লেন যেন হামেহাল তৈরি থাকে। বাওর খানিকক্ষণ পরে এসে বললেন, সে প্লেনে নাকি কী একটা গলদ দেখা গিয়েছে তবে তিনি অন্য প্লেনে বার্লিন গিয়ে সেখান থেকে রাতারাতি স্পেয়ার নিয়ে আসতে পারবেন। হিটলার অসম্মতি জানালেন। রাতের খানাদানা শেষ হলে পর হিটলার কেমন যেন চুপ মেরে গেলেন। যথারীতি তাঁর প্রিয় ভাগনারের রেকর্ড বাজতে শুরু করল। হিটলারের সেদিকে যেন কান নেই, অভ্যাসমাফিক সঙ্গীতের সঙ্গে সঙ্গে উরুতে ঠেকাও দিচ্ছেন না আর সর্বক্ষণ উসখুস করছেন। বাওর তখন সেই একঘেঁয়েমি থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য হিটলারের কাছ থেকে ঘণ্টা দুত্তিনের ছুটি চাইলেন। ইচ্ছে, পাশের বন শহরে একটা রোদ মেরে আসেন। এটা কিছু নতুন নয়। হিটলার হামেশাই এ ধরনের ছুটি সবাইকে মঞ্জুর করতেন। আজ কিন্তু বললেন, না, তোমাকে যে কোনও সময় আমার প্রয়োজন হতে পারে। দুপুররাতে বাওরকে বললেন, খবর নাও তো, মুনিক ফ্লাই করার মতো আবহাওয়া স্বাভাবিক কি না। বাওর পাশের বড় অ্যারপোর্ট কলোন শহরে ট্রাঙ্ককল করে খবর পেলেন, আবহাওয়া খারাপ। হিটলার কেমন যেন উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। বাওরকে আদেশ দিলেন, খানিকক্ষণ বাদে বাদে যেন তিনি ট্রাঙ্ককল করে আবহাওয়ার খবর নেন। বাওর তাই করে যেতে লাগলেন। শেষটায় রাত তিনটের সময় বাওর সুসংবাদ দিলেন, এখন ফ্লাই করা সম্ভব। হিটলার সঙ্গে সঙ্গে মোটরে উঠলেন, প্লেনে চেপে ভোরের আলো ফুটি ফুটি করছে এমন সময় মুনিক পৌঁছলেন। এস্থলে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, হিটলারের আপন প্লেন মেরামত হয়নি বলে তিনি মনিক পৌঁছলেন অন্য প্লেনে। অ্যারপোর্টে পৌঁছেই হিটলার জোর পা চালিয়ে গিয়ে উঠলেন মোটরে। সে গাড়িতে তার কয়েকজন অতিশয় বিশ্বাসী সশস্ত্র সহচর তার জন্য প্রতীক্ষা করছিলেন। মোটর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুতগতিতে উধাও হল। বাওর প্লেন হ্যাঁঙারে তোলার ব্যবস্থা করে দিয়ে অ্যারপোর্টে পায়চারি করছেন এমন সময় তার পরিচিত এক অফিসার তাঁকে দেখে শুধোলেন, আপনি এখানে? কেন, ফুরারকে খানিকক্ষণ আগে প্লেনে করে এখানে নিয়ে এলুম যে।
