মুচকি হেসে এবং বেশ গর্বসহকারে বললুম, এর উত্তর তোমাদের কান্টও দেননি, আমাদের শঙ্করাচার্যও দেননি। দিয়েছে বাঙলা দেশের এক গাঁইয়া কবি। গেয়েছে,
কালো যদি মন্দ তবে।
কেশ পাকিলে কান্দো কেনে?
ব্লন্ডের সন্ধান সে কবি জানতেন না। কেশ পাকলে সাদা হয়, আর বল কেশ মানেই তো বার্ধক্য। তা সে কেশকে যে নামেই ডাকো না কেন– ব্লন্ড, প্ল্যাটিনাম ব্লন্ড, সিলভার ব্লন্ড, পরান যা চায় সে নাম দাও। হ্যাঁ, স্বীকার করি, সত্যিকার ব্লন্ড চুল অদ্ভুত চিকচিক করে, ঠিক যে রকম লটের কালো চুল চিকচিক করে (লটের একটা ক্ষীণ আপত্তি শোনা গেল তার চুলে নাকি পাক ধরতে শুরু করেছে। কিন্তু যবে থেকে না জানি কোন নাৎসি লক্ষ্মীছাড়া ছাতের চিমনির উপর থেকে চাঁচাতে আরম্ভ করল, খাঁটি নর্ডিক জাতের চুল হয় ব্লন্ড, অমনি আর যাবে কোথা– বইতে লাগল গ্যালন গ্যালন হাইড্রোজেন পারক্সাইড না কী যেন এক রাসায়নিক দ্রব্য। রাতারাতি সবাই হয়ে গেল ব্লন্ড। কিন্তু সে দ্রব্যের প্রসাদাৎ যে ব্লন্ড নির্মিত হন, তিনি না করেন চিকচিক, না আছে তেনাতে কোনও জৌলুস।
লটে বললে, থামো না। তুমি কি ওয়ার্লড ফেডারেশন ফর দি প্রিভেনশন অব হাইড্রোজেন পারক্সাইডের প্রেসিডেন্ট?
আমি বললুম। আর একটুখানি সময় দাও। কিন্তু আমি জানি, হেরমান কেন তোমাতে মজেছে। চুল কালো হলে এদেশে চোখ হয় কটা। বিকুটে কটাও আমি দেখেছি–ঠিক যেন বেড়ালের চোখের মতো। কিন্তু কালো চুল আর নীল চোখের সমন্বয় বড়ই বিরল। লটের বেলা সেই সমন্বয় ঘটেছে। আর জানো সুনীল-নয়না লটে, নীল চোখ আমি বড় ভালোবাসি। তোমাদের দেশে খাঁটি নীল রঙের আকাশ বড় একটা দেখা যায় না। যেটা আমাদের দেশে দিনের পর দিন দেখা যায় বিশেষ করে শরৎকালে। নীল চোখ এন্তের না হলেও বিরল নয় এদেশে। লটের কালো চুল আমার স্মরণে আনত বোনেদের কথা, আর তার নীল চোখের দিকে তাকালেই আমি যেন দেশের নীলাকাশ দেখতে পেতাম; মনটা বিকল হবে না তো কী? বিশ্বাস করবে না, ওই নিয়ে একটা কবিতাও লিখে ফেলেছিলুম।
কাতরে শুধাই, একি
তোমার নয়নে দেখি,
আমার দেশের নীলাভ আকাশ
মায়া রচিছে কি?
জর্মন অনুবাদটা আমার পছন্দসই হল না। কিন্তু লটেকে পায় কে? সে কবিতার বাকিটা শুনতে চায়।
আমি কিন্তু-কিন্তু করে গোটা দুই টোক গিলে বললুম, কিছু মনে কর না লটে, আর ব্রাদার হেরমান, কবিতার বাকিটা একটু স্কেটিং অন থিন আইস, আমাদের দেশের ভাষায় সদ্য নতুন ভেসে-ওঠা চরের চোরাবালির উপর হাঁটা। যে যুগে কবিতাটি লেখা হয় তখন সেটা রীতিমতো দুঃসাহসিক কর্ম ছিল।
হেরমান বললে, বাইরের দিকে দেখতে গেলে কবিতা গদ্যের তুলনায় অনেকখানি শৃঙ্খলাবদ্ধ। তাকে ছন্দের বন্ধন, মিলের কড়া শাসন মেনে চলতে হয়; আর সনেট রচনা করতে গেলে তো কথাই নেই। সেখানে এসবের বন্ধন তো আছেই তদুপরি ক ছত্রে সে কবিতাটিকে সুষ্ঠু সমাপ্তিতে আনতে হবে সেটা যেন রাজদণ্ডাদেশ। কোনও কোনও দেশে যাবজ্জীবন কারাবাসের অর্থ চোদ্দ বছরের শ্রীঘর। আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয় এই চোদ্দর অনুশাসনটি আইন-কর্তারা ধার নিয়েছেন কবিদের কাছ থেকে, তাদের সনেট হবে চতুর্দশপদী। এবং তারও ওপর আরেকটা মোক্ষম বন্ধন বিষয়বস্তু কোন কায়দাকেতায় পরিবেশন করবে সেটাও আইনকানুনে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। প্রথম চার ছত্রে প্রস্তাবনা, দ্বিতীয় চার ছত্রে আমার মনে নেই আরও যেন কী কী। কিন্তু ঠিক এই কারণেই সে অনেক-কিছু বলার স্বাধীনতা পেয়ে যায়, যেটা গদ্যের নেই, গদ্যে সেটা কর্কশ এমনকি ভালগার শোনায়। এই যে আমি লটেকে বিয়ে করে পরাধীনতা স্বীকার করে নিয়েছি।
লটে : অর্থাৎ বিয়ের সদর রাস্তা ছেড়ে আইবুড়ো বয়সের সাইড জাম্প আর মারতে পার না।
ইগজেকলি! কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নীলাকাশে উড্ডীয়মান হওয়ার মতো, কিংবা বলতে পারো লটের নীল চোখের গভীরে ডুবে যাওয়ার মতো এমন একটা স্বাধিকার লাভ করেছি যেটা অতুলনীয়, যেটা না পাওয়া পর্যন্ত বাউণ্ডুলে আইবুড়ো সেটার বিন্দু পরিমাণ কল্পনাও করতে পারে না। লটেকে আমি সবকিছু বলতে পারি। এস্তেক আমার মারাত্মকতম দুর্বলতা। কবিতার বেলাও তাই। দেখোনি–প্রিয় অপ্রিয় গোপন কথা বাদ দাও–বহু কবি তার হীনতা নীচতা পর্যন্ত অম্লান বদনে স্বীকার করেছেন আপন আপন কবিতায় এবং সেটাও কোনও বিশেষ ব্যক্তির সম্মুখে নয়, বিশ্বজনকে সাক্ষী মেনে। তুমি নির্ভয়ে বলে যাও।
আমি তবু আমতা আমতা করে বললুম, পূর্বেই বলেছি তোমাদের দেশে নীলাকাশ হয় না, কিন্তু নীল নয়ন হয়। ঠিক তেমনি না হলেও বলা যায়, তোমাদের দেশে পদ্মফুল ফোটে না বটে, অর্থাৎ সরোবরে ফোটে না, কিন্তু ফোটে অন্যত্র! আমাদের দেশে মেয়েরা শ্যাম, উজ্জ্বল শ্যাম, এমনকি ফর্সাও হয় বটে, কিন্তু ধরো আমাদের লটের মতো ধবলশুভ্র কস্মিনকালেও হয় না। তাই, যার নীল নয়ন দেখে দেশের নীলাকাশ মনে পড়েছিল তাকে বললুম,
তোমার বক্ষতলে
আমার দেশের শ্বেত পদ্ম কি
ফুটিল লক্ষ দলে?
.
৩০.
হেরমান দুষ্ট হাসির মিটমিটি লাগিয়ে বললে, লোভ হচ্ছে না?
আমি বললুম, সে আর কও কেন, ব্রাদার?
লটে বুঝতে পারেনি। চটে বললে, কী সব হেঁয়ালিতে কথা বলছ তোমরা? কবি বলেছেন
