লটে ভুরু কুঁচকে বললে, আমাদের!
আমি সঙ্গে সঙ্গে বললুম, সরি সরি! এই যে ইউরো-আমেরিকা থেকে হিপিরা ভারতে যায়, তারা তো সক্কলের পয়লা ধরে গাঁজা।* ওটার একটা লাতিন নামও আছে– কানাবিস ইন্ডিকা না কী যেন তা সে যাকগে!… যা বলছিলুম, গাঁজা, চরস, ভাঙ, আপিঙ, আরেকটার নাম হিপিদের উচিত এটা তাদেরই কোনও একেলে বেটোফেনকে দিয়ে সুরে বসিয়ে ইন্টারনেশনাল রূপে গাওয়া।
[*পশ্চিম বাংলায় প্রচলিত আছে কি না জানিনে বলে একটি গঞ্জিকাপ্রশস্তি নিবেদন করি :
জীবন গাঞ্জা, তোরে আমি ছাড়তাম না (ধু)
এক ছিলিমে যেমন তেমন
দুই ছিলিমে মজা
তিন ছিলিমে উজির নাজির
চার ছিলিমে রাজা।
পাঁচ ছিলিমে হুকুর হুকুর
ছয় ছিলিমে কাশ
সাত ছিলিমে রক্ত– গা
(মডার্ন মেয়েরা যাকে বাথরুম পাওয়া বলে।)।
আট ছিলিমে নাশ।]
ভুলে গিয়েছি– পাঁচটা পাইপে সাজিয়ে সে পাইপগুলো ঢুকিয়ে দেয় আরেকটা মোটা পাইপে। দেখে নাকি মনে হয় যেন একটা গাছের গুঁড়ি থেকে পাঁচটা শাখা ট্যারা হয়ে উপর বাগে উঠেছে। আবার সেই বড় পাইপটা ঢুকেছে একটা খোলে। সে খোলে থাকে কড়া ধান্যেশ্বরী। সেই খোলের একটা ফুটোর ভিতর ছোট্ট একটি পাইপ হুবহু সিগ্রেট হোল্ডারের মতো দেখতে, দেবে ঢুকিয়ে। ওদিকে পঞ্চ পাইপের মুণ্ডতে ধরাবে মোলায়েম আগুন। আর হোল্ডারে মুখ লাগিয়ে দেবে ব্রহ্মটান। ওহ! তাতে নাকি কৈবল্যানন্দ লাভ হয়। তা সে যাকগে। হিটলার আর তাঁর জাদরেলরা তো জর্মন জাতটাকে খাইয়ে দিলেন বিজয় মদ। তার সঙ্গে জুড়ে দিলেন নাৎসি পার্টির হের ডক্টর অর্থাৎ গ্যোবেলস পঞ্চঙ্গ প্রোপাগান্ডা। কিন্তু তিনি নিজে মাতাল হলেন না। একে তোমার মতো রাইন নদের পারে তার জন্ম–
লটে থাক, থাক কিন্তু মোলায়েম গলায়। আমি ও মনোভাবটা বুঝি! গ্যোবেলস মার্কা-মারা পাজির পা-ঝাড়া হতে পারে কিংবা সৎ ব্রাহ্মণের পদধূলিও হতে পারে, কিন্তু যাই বল যাই কও সে তো তার জন্মভূমি রাইনল্যান্ডকে বিশ্বের সুদূরতম কোণে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।
বললুম, তার শত্রুরা পর্যন্ত স্বীকার করে, নাৎসি পার্টির করাতের খুঁড়ো ভর্তি মাথাওলাদের ভিতর ওরকম পরিষ্কার মগজওলা দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিল না। মায় হিটলার।* ইংরেজ জাত ফরাসি জাতটার ওপর অত্যধিক সুপ্রসন্ন নয়, তারা পর্যন্ত স্বীকার করে লাতিন জাতের ফরাসিরাই এ জাতের অগ্রণী, ইতালীয়রা যতই চেল্লাচেল্লি করুক না কেন– এতে পরিষ্কার মাথা স্যাকসন টিউটনদের হয় না, এবং গ্যোবেলসের ধড়ের উপর যে ব্রেন-বক্সটি হামেশাই সজাগ থাকত সেটা ছিল লাতিন মগজে টইটম্বুর। আশ্চর্য নয়, এই রাইনল্যান্ডেই যে জর্মন রক্তের সঙ্গে ফরাসি রক্তের সবচেয়ে বেশি সংমিশ্রণ হয়েছে সে তত্ত্বটি বর্ণসঙ্কর বিভীষিকায় নিত্য নিত্য ঘামের ফোঁটায় কুমির দেখনেওলা হিমলার পর্যন্ত অস্বীকার করতে পারেননি। কেন লটে, তোমার যে চোদ্দ ডিগ্রি ট্যারার মতো চোদ্দ কেন, চোদ্দশো পুছ কালো চুল তার জুড়ির সন্ধানে বেরুতে হলে তো যেতে হয় ইতালি বা স্পেন মুল্লুকে। কী বল, আমার কৃষ্ণা কেশিনী?
[*স্বয়ং গ্যোবেলস তাঁর ডাইরিতে লিখেছেন, ফুরারের পশ্চাদ্দেশে তিনি এস্থলে যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন সেটি জর্মনির গ্রাম্যতম আটপৌরে শব্দ এবং ইংরেজিতেও একই অর্থ এবং প্রায় একই ধ্বনি ধরে) আস্ত একটা জ্যান্ত টাইম বম না রাখা পর্যন্ত তার চৈতন্যোদয় হয় না।]
তাচ্ছিল্যভরে বললে, রেখে দাও তোমার ওই রক্ত নিয়ে ধানাইপানাই। হিটলার চেল্লালেন, জর্মনরা সব নর্ডিক। এখন রব উঠেছে, আমরা রাইনলেভার নই, প্রাশান নই, এমনকি আমরা জর্মনও নই(!), আমরা সব্বাই এখন ইউরোপীয়ান! ছোর। কিন্তু এই সুবাদে শুধোই, লোকে বলে বিপরীত বিপরীতকে টানে। তোমার চুল তো কালো। তবে তুমি প্লাটিনাম ব্লন্ড রুপোলি ব্লন্ডের এফাঁকে উল্লাসে নৃত্য করতে করতে তোমার টিমের গোলি না করে আমাকে করতে কেন?
হেরমান এতক্ষণ অবহিত চিত্তে আমাদের চাপান-ওভোর শুনছিল। মৌনভঙ্গ করে বললে, শাবাশ! হে অশ্বিনীপ্রধান! (আশা করি শ্রুতিধর পাঠককে অযথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে না, অশ্বিনী ভ্রাতৃদ্বয় নিরবচ্ছিন্ন অভিন্নমনা ছিলেন বলে উভয়ে একই কামিনীকে কামনা করতেন। তোমার জয় হোক। তৎপূর্বে প্রিয়াকে সদুত্তর দাও। অনুজ শিক্ষালাভ করুক।
আমি বললুম, প্রিয়ে কৃষ্ণকুন্ডলে! তোমার চুল আমাকে আমার দেশের খেলার সাথীদের কথা স্মরণ করিয়ে দিত। তাদের চুল ছিল তোমারই মতো কালো।
(লটের চোখে কেমন যেন সন্দ সন্দ ভাব)
আমার প্রথম খেলার সাথী জোটে সাত-আট বছর বয়সে।
(লটের ঠোঁটে ক্ষীণতর মধুর স্মিতহাস্য)
করে করে আমার পাঁচটি সঙ্গিনী জুটল। আমি আমার ছোট বোনেদের কথা বলছি।
লটে আমার দিকে রহস্যভরা নয়নে তাকিয়ে বললে, খুশি হব, না ব্যাজার হব ঠিক অনুমান করতে পারছিনে। তুমি যদি বলতে, আমার চুল দেখে তোমার আপন দেশের প্রিয়ার কথা স্মরণে আসে তবে আমার বুক নিশ্চয়ই হিংসায় কিছুটা খচ খচ করত। তা-ও না হয় সয়ে নিতুম, কিন্তু আমার চুল তোমাকে তোমার বোনেদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় সে যে বড় পানসে।
হেরমান বললে, মানুষের মতিগতি এমনিতেই বোঝা ভার, তার ওপর যে মানুষ দূর বিদেশ থেকে এসেছে তার হৃদয়, তার রুচি বোঝা আরও কঠিন। লটে ঠিকই শুধিয়েছে, কালো চুলের প্রতি তোমার, বিশেষ করে তোমার এহেন অহেতুক আনুগত্য কেন? কালোর কীই-বা এমন ভূলোক দ্যুলোক জোড়া বাহার?
