[*সুকুমার রায় যজ্ঞির ভোজে পরিবেশকদের বর্ণনা করেছেন, কোনও চাচা অন্ধপ্রায় মাইনাস কুড়ি। ছড়ায় ছোলার ডাল পথঘাট জুড়ি।]
লটে বললে, আমি ঠিক ঠিক শুধাইনি। যদূর মনে পড়ছে চোদ্দই শেষ সীমা। তবে মেরেকেটে আরও দু-এক মাত্রা, দু-এক পেগ সেবন করতে পারি বোধহয়।
তাই সই। ওহে হেরমান, তুমি এই বেলা সময় থাকতে থাকতে লটের বিরুদ্ধে একটা ডিভোর্স কেস ঠুকে দাও। আদালতকে বলবে, এই রমণী আমাকে ধাপ্পা মেরে বিয়ে করেছে। বিয়ের পূর্বে একবারও সেই গুহ্য তথ্যটি প্রকাশ করেনি যে, সে ট্যারা। আর যা তা ট্যারা নয় হুজুর, একদম চৌদ্দ ডিগ্রি ট্যারা। এর বেশি ট্যারা মি লাট–মাই লর্ড–বিবাদিনী গেল বছর যে বিশাল– জর্মন ট্যারা কনফারেন্স-এর নিমন্ত্রিত হয়ে মুনিক গিয়েছিলেন—
এস্থলে আদালত বাধা দিয়ে তোমার উকিলকে শুধোবেন, বিবাদিনী কেন নিমন্ত্রিত হয়েছিলেন?
তোমার উকিল সোল্লাসে : ঠিক ওই বক্তব্যেই আমরা আসছিলাম, হুজুর। আমরা জনৈক প্রসিদ্ধ চক্ষু চিকিৎসককে সাক্ষীরূপে এই মহামান্য আদালতে হাজির করব, এবং তিনি কিছু হেজিপেজি যেদোমেধো–
আদালত ঈষৎ শুষ্ক তথা দৃঢ়কণ্ঠে : বিজ্ঞ আইনজ্ঞের শেষোক্ত জনপদসুলভ গ্রাম্য সমাসদ্বয়ের প্রয়োগ মহামান্য আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করবার অবকাশ ধারণ করে।
উকিল : আমি খুশমেজাজে বহাল তবিয়তে (মহামান্য আদালত ঈষৎ কুঞ্চন করলেন কিন্তু স্পষ্ট বোঝা গেল তিনি ভাষার জগাখিচুড়িকে আর ঘটাতে চান না।) ওই দুটো লক্ষ্মীছাড়া সমাসকে আদালত থেকে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিলুম। কিন্তু হুজুর, ইংরেজও বেকায়দায় পড়লে এ জায়গায় টম ডিক অ্যান্ড হ্যারি এস্তেমাল করে থাকে।
আদালত : অত্র আদালত স্বাধিকার-অপ্রমত্ত। কিন্তু অত্র আদালত অর্বাচীন আলবিয়নের রসনাসহযোগে অস্মদ্দেশীয় রাইন-মোজেল-মদিরা আস্বাদন করে না।
উকিল : তথাস্তু মি লট। পুরনো কথার খেই ধরে নিয়ে উপস্থিত জটটা ছাড়াই : সেই চোখের ডাক্তারের সুনাম দেশ-বিদেশের কহাঁ কহাঁ মুল্লুকে ছড়িয়ে পড়েছে। গত বৎসর তিনি প্যারিস যান। সারা জাহাঁ আঁখ মজলিসের দাওয়াত পেয়ে। তিনিই হরেক রকম হাতিয়ার চিড়িয়া পিঁজরা হুনর দিয়ে মহামান্য আদালতকে বাৎলে দেবেন, বিবাদিনী চোদ্দ পেগ-এর ট্যারা।
বিবাদিনীর উকিল পেরি মেসন কায়দায় হাইজাম্প মেরে : আমি আমার সুবিজ্ঞ সহকর্মী বাদিপক্ষের উকিল যে মন্তব্য করেছেন তার তীব্রতম প্রতিবাদ জানাই। তিনি অশোভন ইঙ্গিত করছেন, আমার সম্মানিতা মক্কেল চৌদ্দ পেগ হুইস্কির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।
হেরমান বাধা দিয়ে বললে, তোমাদের সিনেমা গমনের কী হল? আচ্ছা, তুমি বলছ, আমার কেস একদম ওয়াটার টাইট? মোকদ্দমা জিতবই জিতব?
আমি সোৎসাহে : আলবৎ, একশো বার।
আর তুমি তখন লটেকে বগলদাবা করে ড্যাং ড্যাং করে নাপাতে নাপাতে এন্ডিয়া বাগে সটকে পড়! না? অফ কোর্স নট। আমাদের ফরেন মিনিস্টারের নাম হের শেল (Scheel), অর্থাৎ ট্যারা, লক্ষ্মীট্যারা নয়, সমুচা ট্যারা। তার বউ তো তাকে তালাক দেয়নি।
লটে এক লাফে হেরমানের কোলে বসে তাকে জড়িয়ে ধরে চুমো খেতে খেতে বললে, ডার্লিং, তুমি সত্যই আমার মূল্য বোঝে।
আমি বললাম, কচু বোঝে। ওয়াইলড বলেছেন, আমাদের প্রত্যেকেরই এমন সব রদ্দিমাল আছে যা আমরা সানন্দে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিতুম। শুধু ভয়, পাছে অন্য কেউ না কুড়িয়ে নেয়। এস্থলে আমি শর্মা রয়েছি যে।
কী! আমি রদ্দি মাল! তোমার সঙ্গে সিনেমা যাব না, না, না!!
.
২৯.
আমি বললুম, সুন্দরী লটে, তুমি যাত্রারম্ভে বার বার মন্ত্রোচারণ করেছিলে যোগাযোগ, যোগাযোগ, সবই যোগাযোগ, এবং সঙ্গে সঙ্গে হিটলারেরও উল্লেখ করেছিলে সেটা তো সঠিক প্রকাশ করলে না। আমি জানি, ভালো করেই জানি জর্মন মাত্রই হিটলার-যুগটাকে যেন একটা দুঃস্বপ্নের মতো ভুলে যেতে চায়। আমি তাদের খুব একটা দোষ দিইনে; আমি দেশে বসেই হিটলারের বিজয়ের পর বিজয়, পতনের পর পতন, প্রায় সবকিছুই স্বকর্ণে শুনেছি–
মানে?
অতি সরল। বেতার আমাদের দেশে ত্রিশ শতকেই বেশ ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে ইউরোপীয় বেতারকেন্দ্রগুলো আমাদের বড় একটা পরোয়া করত না– একমাত্র বিবিসি আমাদের জোর তোয়াজ করত। বোঝাবার চেষ্টা করত, আখেরে ইংরেজ জিতবেই জিতবে। ওদের ভয় ছিল আমরা যদি ইংরেজ পরাজয়ের মোকাটি হেলায় অবহেলা না করে ভারত থেকে তাদের তাড়াবার বন্দোবস্ত শুরু করি তা হলেই তো চিত্তির। তাই তারা সুবো-শাম জোর প্রপাগান্ডা চালাত– বিশেষ করে ডানকার্কের অতুলনীয় পরাজয়ের পর–যে ইংরেজকে হারানো চারটিখানি কথা নয়। জর্মনি তখন বিজয়মদে মত্ত। বিজয় মাত্রই কড় কড়া মদ। সে মদে যদি আবার পঞ্চরঙ মিশিয়ে দাও তা হলে তো আর কথাই নেই–
পঞ্চরঙ আবার কী মদ?
আমি সবিনয় নিবেদন করলুম, ওই বস্তুটির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি বলে আমি সত্যই লজ্জা বোধ করি। শুনেছি পাঁচটা ভিন্ন ভিন্ন পাইপে (ছিলিম তো এরা বুঝবে না) পাঁচটা ভিন্ন ভিন্ন জাতের নেশা, যেমন গাঁজা, চরস, ভাঙ–
এসব আবার কী?
বোঝানো শক্ত, কারণ নিজেই জানিনে। তবে ইউরোপোমেরিকায় প্রচলিত হশিশ, হেরোইন, মরফিন এগুলোর প্রায় সবকটাই হয় গাঁজা নয় আফিম থেকে তৈরি হয়। এই যে তোমাদের হিপিরা–
