কিন্তু আরেকটা বিবরণ জানা আমার আছে।
গেল বছর আমি গিয়েছিলুম মনিক। তুমি হয়তো জানেন না, সয়েড, জর্মনদের এখন এমনই বস্তা বস্তা ধনদৌলত হয়েছে যে কী করে খরচ করবে ভেবে পায় না। তাই নিত্যি নিত্যি লেগে আছে সেমিনার কনভেরজাৎসিয়োনে, কনফারেন্স আরও কত কী। আমার আজ আর মনে নেই যেটাতে গিয়েছিলুম সেটা বিশাল জর্মন ট্যারাদের কনফারেন্স না–
আমি বাধা দিয়ে বললুম, ট্যারাদের কনফারেন্সে তুমি যাবে কী করে? তুমি তো ট্যারা নও। এস্তেক লক্ষ্মীট্যারাও নও।
বললে, কে বলল আমি ট্যারা নই। ওই তো সেদিন আমার এক আত্মীয় কোত্থেকে জানি নিয়ে এল এক নয়া যন্তর। আমার হাতে সেটা দিয়ে বললে, ওই ফুটাটার ভিতর দিয়ে তাকাও তো একটিবার। দেখতে পাবে একটা খাঁচা আর অন্য প্রান্তে একটা পাখি। এইবারে এই হান্ডিলটা নাড়িয়ে পাখিটাকে খাঁচার মধ্যে পোরো দিকিনি!
দম নিয়ে বললে, হেরমানের মতো সদাই উড়ু উড়ুকু চিড়িয়াকে পুরেছি চোখে-না-যায়-দেখা, হাতে না-যায় ছোঁওয়া খাঁচায়। আমারে ঠ্যাকায় কেডা?
হেরমানের দিকে চোখ মেরে বললে, কই, কিছু বলছ না যে?
কে কাকে পুরছে তার খবর রাখে কোন গেস্তা, কোন ওগৃপু? চিড়িয়াখানায় খাটাশটার খাঁচার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা চিত্তবিনোদন করি। ওদিকে খাটাশটা ভাবে, নিছক তার চিত্তবিনোদনের জন্যই আমাদের ডেকে আনা হয়েছে। আমাকে জু-র বড়কর্তা অতিশয় সঙ্গোপনে বলেছেন, যেদিন জলঝড় ভেঙে দু চারটি মুক্ত-পাগল ভিন্ন অন্য কেউ জু-তে আসে না সেদিন খাটাশটা তার নিত্যদিনের চিত্তবিনোদন বরাদ্দ থেকে বঞ্চিত হয়ে রীতিমতো মনমরা হয়ে যায়।
লটে বললে, কই তোমাকে তো কখনও মনমরা হতে দেখিনি।
আমি মনে মনে বললুম, লাগ, লাগ, লাগ। বাইরে বললুম, কে কাকে খাঁচায় পুরেছে সে তার উপস্থিত থাক। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, দু জনাতে একই খাঁচাতে তো দিব্য উঁহু উঁহু। কুঁহু কুহু করছ। রীতিমতো হিংসে হয়। তা সে যাকগে। তুমি তো খাঁচায় পুরলে সেই চিড়িয়াটাকে। ডাক্তারের আলুক্ষেতে তাতে করে ক গণ্ডা পুলি পিটে গজালো, শুনি।
লটে : সায়েডষেন, সেইখানে তো রগড়। ডাক্তার বলে কি না, আমি নির্ভেজাল চোদ্দ ডিগ্রি ট্যারা।
সেন্টিগ্রেড না ফারেনহাইট?
লটে ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে বললে, কোনওটাই না। তুমি কিছু বোঝ না। চোদ্দ ডিগ্রি বলেছিল, না চোদ্দ কেজি বলেছিল সে কি আর আমি কান পেতে শুনেছিলুম। চোদ্দ– কোনও কিছু একটা। তার পর ডাক্তার কী বলল, জানো? বললে, এই ট্যারাইসিন সারাতে হলে হয় কামচাটকা, নয় লুলুম্বা হুলা হুলা থেকে আনাতে হবে এক অতি বিশেষ রকমের চশমার পরকলা হঠাৎ থেমে গিয়ে আমাকে শুধাল, তোমার কী হল সায়েড ডিয়ার? হঠাৎ অভিনিবেশ সহকারে এরকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করছ কেন? বিস্তর পুরুষমানুষ দেখেছি যারা ডিনার শেষে ওয়েটার বিল নিয়ে আসছে দেখলে হঠাৎ অতি অকস্মাৎ জানালা দিয়ে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিরীক্ষণ করতে লেগে যায়। ও প্রকৃতির কী মাহাত্ম্য! পাঁচো ইয়ার তখন আর কীই-বা করেন। হাঁড়িপানা মুখ করে সেই জিরাফকণ্ঠী বিলটা শোধ করে দেন। কই, আমরা তো এখনও তোমাকে কোনও বিল দিইনি, মাইরি।
আমি চিন্তাকুল কণ্ঠে বললুম, যত দুর্ভাবনায় ফেললে, লটে সুন্দরী।
যথা?
ওহে হেরমান, এমন মোকাটি হেলায় অবহেলা কর না ভাই। টাপেটোপে কই। তোমারই মতো এক নিরীহ, গোবেচারীর বউয়ের জিভে কী যেন কী একটা বিকুটে ব্যামো দেখা দিল। বউ একদম একটি কথাও বলতে পারছে না। এমনকি গা গা ইডিয়টের মতো গাঁ-আঁ আঁ, গাঁ আঁ আঁও করতে পারছে না। বেচারি সেই সাত পাকের সোয়ামি নিয়ে গেল বউকে ডাক্তারের কাছে। ডাক্তার মাত্র একটিবারের তরে বউয়ের জিভের উপর চামচের চ্যাপটা হাতলটা বুলিয়েছে কি বুলোয়নি– দ্যাখ তো না দ্যাখ– সাত পাকের হাত পাকড়ে ধরে দে ছুট। বৃহৎ হাসপাতালের নিভৃততম কোণে তাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বললে, হিপোক্রাতেসের শপথে এ বিধান নেই। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, আমার ধর্মবুদ্ধি বলে কারও কোনও ব্যামো যদি অন্য কারওর উপকার সাধন করে তবে উপকৃতজনকে এ বিষয়ে কনসাল্ট করে নিতে। আপনাকে অতিশয় সঙ্গোপনে একটি তথ্য নিবেদন করি : আপনি সত্যই বড় লাকি পুরুষ; কথায় বলে স্ত্রী ভাগ্যে ধন। এই যে আপনার স্ত্রীর জিভ আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছে, কোনও প্রকারের শব্দটি মাত্র উচ্চারণ করতে পারছেন না, টু ফ্যা দূরে থাক, অষ্টপ্রহর বকর বকর করে আপনার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতে পারছেন না, এরকম ক দৈবাৎ কখনও কোনও স্বামীর কপালে নৃত্য করে। বললে পেত্যয় যাবেন না, শতেকে গোটেক নয়, লাখে এক হয় কি না হয়। ডাক্তার দম নিয়ে স্বামীকে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ভেবে দেখুন, ভালো করে চিন্তা করে নিন আপনি কি সত্য সত্য, তিন সত্য চান, যে আমি আপনার স্ত্রীর জিভটা সারিয়ে দিই। বলুন, আবার বলছি চিন্তা করে বলুন।
হেরমানের হাসির পরিমাণ থেকে অনুমান করলুম, সে লটেকে কতখানি ডরায়।
বললে, কিন্তু গল্পটি আমারই উদ্দেশে বিশেষ করে বললে কেন?
আমি বললুম, বলছি, বলছি। অত তাড়াহুড়ো করছ কেন, হের গট– সদাপ্রভু তো এক মুহূর্তেই বিশ্বসংসার নির্মাণ করতে পারতেন; তবে পূর্ণ ছয়টি দিন ওই কর্মে ব্যয় করলেন কেন? কিন্তু তার পূর্বে লটে-কে একটা প্রশ্ন শুধান দরকার। আচ্ছা লটে, তুমি যে চৌদ্দ ডিগ্রি না চৌদ্দ গজ ট্যারা সে তো বুঝলুম, কিন্তু তোমার ট্যারাতর ট্যারাতম মার্জিন আর কতখানি? মোলা, আঠারো? আমাদের ছেলেবেলায় চশমার পাওয়ার মাইনাস কুড়ির চেয় বেশি হত না।*
