আমি মুদিত নয়নে উধ্বমুখে প্রার্থনা করলুম, আমেন, আমেন।
লটে : মানে?
অতি সরল। জেমিনাই জমজ… অন্তত আমাদের দেশে একই সময়ে একই রমণীর প্রেমে পড়েন।
হেরমান লম্বা এক দমে শেমপেন গেলাস শেষ করে বললে, লাও! অ্যাদ্দিন বাদে এসে জুটলেন আমার, সাতিশয় মাই ডিয়ার, টুইন ব্রাদার তার, খবর নিতে। তখন কোথায় ছিলে, বৎস, হার ডক্টর, যখন লটের প্রেমে আমি চোখের জলে নাকের জলে হাবুডুবু খাচ্ছি, বিষ্টিতে ভিজে ঢোল হয়ে রাঁদেভূতে পৌঁছে মাদমোয়াজেলকে না পেয়ে তিক্ততম সত্য অনুভব করলুম, সেই জলঝড়ে তিনি তার সাত বছরের পুরনো ফ্রকটি- যেটা এ আমলের ফ্যাশানের নিদর্শনস্বরূপ লুভর যাদুঘরে হেসে-খেলে উচ্চ সিংহাসন পায়– সেটাকেও বরবাদ করতে নারাজ, এবং
হেরমানের খেদোক্তি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে লটে যেন শুধু আমাকে বললে– দু গালে দুটি টোল জাগিয়ে তখন তুমি বললে, সাত সমুদ্র তের নদীর ওপারে সেই সুদূর ইন্ডিয়ায় মা বসে আছে এই চিঠির প্রতীক্ষায়। শেষ ক্লিয়ারেন্স মিস করলে ইন্ডিয়ান মেলও মিস। মাকে নেট চিঠির জন্যে প্রহর গুনতে হবে আরও পুরো সাতটি দিন। আর আমার মা স্বপ্নেও কাউকে কখনও অভিসম্পাত করেনি– নইলে তার অভিশাপে গোটা জর্মন দেশটা জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যেত। মনে পড়ছে?
আমি ভেজা গলায় বললুম, খুব মনে পড়ছে। কিন্তু তোমার মনে আছে কি, তুমি প্রায়ই আমাকে তার পর শুধাতে, মায়ের চিঠি লিখেছেন? কেন বাপু, বিষবারের শেষ মুহূর্তে চিঠি লিখতে বসা? দু দিন আগে ধীরেসুস্থে চিঠিটা লিখে পোস্ট করতে আপনাকে ঠেকিয়ে রাখে কোন হিন্ডেনবুর্গ? তুমি বড় পাকা মেয়ে ছিলে, ডার্লিং লটে!
.
২৮.
যোগাযোগ, যোগাযোগ! সবই যোগাযোগ। দার্শনিকার মতো বললে লটে।
আমি শুধালুম, কী রকম?
বললে, এই যে আকস্মিকভাবে আমাদের দেখা হল।
হেরমান জর্মনে যে শব্দটি ব্যবহার করল সে যদি বাঙাল হত তবে বলত খাইছে! ঘটিগো ভাষায় খেয়েছে! এই মরেছে-তে ঠিক যেন সেরকম খোলতাই হয় না। আবার ওরা যখন বলে মাইরি তখন আমাগো ভাষায় তার ইয়ার পাওয়া যায় না।… তার পর বললে, বা– রে! এত বড় অত্যাচার! অদ্য রজনীর টাইমটেবল তো পাকাঁপোক্ত করা হয়ে গিয়েছে। আহারাদির পর তোমরা যাবে সিনেমায়, তার পর শাস্ত্রানুযায়ী যাবে পার্কে–অশাস্ত্রীয় রসালাপ করতে। তবে কেন, আমার প্রাণের লটে, আমার হক্কের ওপর ট্রেসপাস করছ? আমাকে দুটি কথা কইতে দাও না, সায়েডের সঙ্গে।
লটে বললে, কোথায় হল ট্রেসপাস আর কোথায়ই-বা রসালাপ! ট্রামে আসার সময় সায়েড আমাকে বলছিল, ১৯৩০-এ তুমি-আমি হিটলারের থোড়াই তোয়াক্কা রাখতুম। তার পর ওই তিরিশেই আখেরে সে পেল মেলাই ভোট। আমরা তবু নিশ্চিন্ত মনে আমাদের ফুটবল চালিয়ে গেলুম।* তিন বৎসর যেতে না যেতে ভিয়েনার সেই ভ্যাগাবন্ড, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আটপৌরে নিতান্ত সাধারণ একটা করপোরাল– তার পর কী জানি কোন এক ভাষায় কী একটা কবিতা আউড়ে বললে আমি আবৃত্তি করেছিলুম, বণিকের মানদণ্ড পোহালে শর্বরী দেখা দিল রাজদণ্ডরূপে। লক্ষ্মীছাড়া ভবঘুরে পোহালে শর্বরী বসে গেল রাজসিংহাসনে জর্মনির মতো অত্যুচ্চ শিক্ষিত দারুণ ঐতিহ্যপন্থি দেশের হয়ে গেল চ্যান্সেলার।
[*১. এই ফুটবল খেলা নিয়ে আমি বহু বৎসর পূর্বে ৮/১০/১২ বছর হতে পারে একটি গল্প লিখি। তার প্লট : আমাদের ফুটবল গ্রাউন্ডের (অর্থাৎ সরু একচিলতে গলির) শেষ প্রান্তে বাস করতেন ফ্রাউ উলরিষ, খাণ্ডারিনী, ইয়া লাশ বুড়ি। একবার যদি তিনি কারণে-অকারণে চটে গিয়ে বকা আরম্ভ করতেন তবে যতক্ষণ না তার পরবর্তী ভোজনের সময় আসে তিনি নায়গ্রা প্রপাতের মতো নাগাড়ে বকে যেতে পারতেন। আমাদের পুরোপাক্কা খবরদারি হুশিয়ারি সত্ত্বেও একদিন ফুটবলটা দড়াম করে গিয়ে পড়ল তার জানালার উপর শার্সিখানা খান খান। এহেন অন্যায় আচরণ ফুটবলের নয়, আমাদের যে তাঁকে সেদিন বকাবকির রেকর্ড নির্মাণের তরে টুইয়ে দেবে সে তত্ত্ব বাৎলে দেবার জন্য হেমলেটের পিতৃপ্রেতাত্মা কেন, আমি টেশে গেলে যে মামদো জন্মাবে তারও প্রয়োজন নেই। সে পেল্লায় কটু বক্তিমের মূল বক্তব্য ছিল– সরকার কি রাস্তা বানিয়েছে ফুটবলের তরে? বহু বৎসর পরে জানতে পাই, বুড়ি উলরিষ তার বেবাক সঞ্চিত ধন উইল করে দিয়ে যায়, আমাদের পাড়ার ছেলেমেয়েদের জন্য একটা ক্ষুদে প্লেগ্রাউন্ড নির্মাণ করার জন্য। কাহিনীটি আমি হারিয়ে ফেলার ফলে সেটি পুস্তকাকারে কখনও প্রকাশিত হয়নি। কোনও সহৃদয় পাঠক যদি দয়া করে আমাকে জানান (C/o সম্পাদক দেশ ৬নং প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলিকাতা-১) কোন বসর, কোন মাস, কোন পত্রিকায় এটি বেরোয়, তবে আমি তার কাছে চিরঋণী হয়ে থাকব।]
খানিকক্ষণ চুপ করে থাকার পর লটে ফের বললে, যোগাযোগ যোগাযোগ, সবই যোগাযোগ! এই যে আমরা খানিকক্ষণ আগে হোটেল ড্রেজেনের গা ঘেঁষে এলুম না, সেখানে এসে উঠেছিলেন হিটলার। সমস্ত জৰ্মনির সব হোটেলের চাইতে তিনি বেশি ভালোবাসতেন এই হোটেল ড্রেজেন। আর রাইনের ওপারে পেটেরসবের্গ পাহাড়ের উপরকার হোটেলে উঠেছিলেন ইংলন্ডের প্রধানমন্ত্রী শ্ৰীযুত চেম্বারলেন। সমঝাওতা হল না। শুভক্ষণে শুভলগ্নে কোন্ যোগাযোগ হল না বলে সবকিছু ভেস্তে গেল, সে তত্ত্ব আমরা কখনও জানতে পারব না।
