আমি রহস্যভরা কণ্ঠে বললুম, যতক্ষণ বেত না আসে কানমলা চলুক।
এরকম বেরসিক আছে যারা কোনওকিছু না বুঝতে পারলে হাসে। ভাবে, যখন বুঝতে পারিনি তখন নিশ্চয়ই কোনও রসিকতা। আশস্ত হলুম, হেরমান সে গোত্রের নয়।
এস্থলে এটা রসিকতা। এবং এতই উত্তম যে যদিও এটি আমি ভিন্ন প্রসঙ্গে অন্যত্র উল্লেখ করেছি তবু অক্লেশে এটার পুনরাবৃত্তি করা যেতে পারে।
বললুম, আমাদের দেশের গ্রামঞ্চলে কোনও মর্কট বড় বেশি বাঁদরামি করলে পণ্ডিতমশাই সর্দার পড়ুয়াকে আদেশ করেন একখানা লিকলিকে বেত নিয়ে আয় তো এবং ছেলেটার কান মলতে মলতে বলেন, যতক্ষণ বেত না আসে কানমলা চলুক
অসম্পূর্ণ বাক্যাংশ না শুনেই হেরমান হো হো করে হেসে বললে, বুঝেছি, বুঝেছি। যতক্ষণ শেমপেন না আসে মোজেল চলুক। উত্তম রসিকতা।
বিলকুল এবং শুধুমাত্র তাই নয়, এটা নিত্য ব্যবহার্য না হলেও পালপরবে অবশ্যই। এমনকি আপন গৃহেও। এই মনে করুন লটে আপনাকে কী একটা হাবিজাবি মাছ খেতে দিল। আপনি নিমন্ত্রিত বন্ধুসহ দুপুরবেলা বাড়ি ফিরে রান্নাঘর থেকে মুরগি রোস্ট করার খুশবাই পেয়েছিলেন। তাই সেই হাবিজাবি খেতে খেতে ইয়ারকে বলবেন, যতক্ষণ বেত (রোস্ট) না আসে ইত্যাদি এবং তার পর সেটি রসিয়ে রসিয়ে বুঝিয়ে বলবেন। এবং
ইতোমধ্যে আমার কোচের পশ্চাৎ থেকে হুঙ্কার শুনতে পেলুম, কী! আমি বুঝি হাবিজাবি মাছ রাধি! জানো, রাইনের জন্ম হওয়ার বহু বহু যুগ আগের থেকেই আমরা পুরুষানুক্রমে রাইনের পারে বাস করছি (আমি মনে মনে বললুম, রামের পূর্বেই রামায়ণ!), রাইনের মাছ আমি রাঁধতে জানিনে– মুরমুরে ভাজা, আঙুর পাতায় জড়ানো স্যাকা খেয়েছ কখনও?
আমি বললুম, রাইনের মাছ যে অপূর্ব সে বিষয়ে সন্দেহ করে আমি কি তৃতীয় পিস্তলকে আমন্ত্রণ জানাব? আমাদের গঙ্গার ইলিশও কিছু ফ্যালনা নয়। সংস্কৃতে শ্লোক আছে, আমার ঠিক ঠিক মনে নেই, কিসের উপরে যেন কী, তার উপরে যেন আরও কী, তার উপর বোধ হয় জল, তার উপর কচ্ছপ, কচ্ছপের উপর পৃথিবী, তার উপর হিমালয়– তোমাদের আলপস তো তার হেঁটোর বয়সী– তার সর্বোচ্চ চুড়ো এভারেস্টের উপরে শিব
ও! শিবের কাহিনী আমি জানি। কিন্তু বলে যাও।
শিবের উপর তার জটার ভিতর গাঙ্গেস (গঙ্গা) তার জলের উপর কেলি করেন ইলিশ। সেই সর্বোচ্চ স্থানাসীন ইলিশ যে খায় না, তার চেয়ে বৃহত্তর মূর্খ ত্রি-সংসারে আর কেউ আছে কি? কিন্তু ভদ্রে, আমি তো শুনেছি, অগুনতি জাহাজের পোড়া তেল ইত্যাদি (বিজ) প্রক্ষিপ্ত হওয়ার ফলে এখন নাকি রাইনের মাছে আর সে সোয়াদ নেই।
লটে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল। দশ সেকেন্ড যেতে না যেতে বলল, এখুনি আসছি।
আমি বাধা দিয়ে বললুম, তুমি ঠিক আমার বোনেদের মতো। যখনই ওদের বাড়িতে গিয়ে উঠি এবং সেটা ঝাড়া চলিশ বছরের ব্যবধানে নয়– তখনই তারা ঠিক তোমারই মতো ডার্বি ঘোড়ার স্পিডে ঘড়ি ঘড়ি রান্নাঘরের দিকে ছুট দেয়। ভালোমন্দ এটা-সেটা নয়, রাজ্যের তাবৎ পদ খাওয়াবে বলে। আমি বলি, বোস, তোর সঙ্গে দুটি কথা কই, কতদিন পরে দেখা। আমি তো খেতে আসিনি। কিন্তু ওরা শোনে না, ওরা জানে, যবে থেকে মা গেছে, অন্য কারওরই রান্না আমার পছন্দ হয় না। ওরাই কিছুটা পারে, কিছুটা নয়, বেশ বিস্তর।
লটে তার ঠোঁটের উপর করুণ মুচকি হাসির সঙ্গে মধুরিমা মিশিয়ে বললে, সে আমি জানি। তুমি একদিন বিষ্ণুত্বারে রাত নটার সময় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে চলেছিলে আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে। আমি তখনও ছোটদের মধ্যে। টায়-টায় আটটায় শুয়ে পড়তে হত। সে রাত্রে পূর্ণিমার চাঁদ পড়লেন তাঁর কড়া আলো নিয়ে আমার চোখের উপর। পর্দাটা টানবার জন্য জানালার কাছে যেতেই দেখি তুমি। ফিস ফিস করে ডাকলুম তোমাকে। তুমি থমকে দাঁড়িয়ে বললে, এক লহমার তরেও সময় নেই। চিঠি ফেলতে ডাকঘরে যাচ্ছি। তার পর ঠিক জানালার নিচে দাঁড়িয়ে।
হেরমান বিগলিত কণ্ঠে মুদিত নয়নে কাব্যিক কাব্যিক সুরে বললে– যেটা বাঙলায় দাঁড়ায়– মরি গো মরি! সখী তোরা আমায় ধর, ধর। এ যে সাক্ষাৎ রুমিয়ো-জুলিয়েট। আর বলতে হবে না। রুমিয়ো তখন পূর্ণচন্দ্রকে সাক্ষী মেনে লটে থুড়ি শারলটে-কে, ফের থুড়ি, জুলিয়েটকে তার অজরামর প্রেম নিবেদন করলেন– তোমাদের কপাল ভালো, মাইরি। সে সন্ধ্যাটা পূর্ণিমা না হয়ে অমাবস্যাও হতে পারত, পূর্ণিমা হয়েও গভীর ঘনমেঘের ঘোমটা পরে আত্মগোপন করে থাকতে পারত
লটে বললে, কী জ্বালা! হার সায়েডের বুকপকেটে তখন তার প্রিয়া আমারি, জরিমানা, মার্লেনে– জানিনে কোন প্রিয়ার নামে লেখা প্রেমপত্র। আর সে তখন শপথ করবে আমাকে প্রেম নিবেদন করে! অতখানি ডন জুয়ান আমার বন্ধু কস্মিনকালেও ছিল না। শোনোই না বাকিটা। আমি তো সেই সন্দ করে ঠোঁট বাঁকিয়েছি আমার দিকে তাকিয়ে বললে–এখখুনি ছুটতে হবে। ইন্ডিয়ান সাপ্তাহিক মেল-এর শেষ ক্লিয়ারেনস গোডেসবের্গে হয় প্রতি বিষবারে—
রহস্য উদ্ঘাটিত হল। বললুম, তাই বল– নইলে সেটা যে বিষত্বার ছিল সেকথাটা এত যুগ পরেও তোমার মনে রইল কী করে, আমিও তাই ভাবছিলুম।
লটে অসহিষ্ণু হয়ে বললে, শোনোই না! তুমি আর হেরমান যেন যমজ দুই ভাই জেমিনাই (অশ্বিনী ভ্রাতৃদ্বয়) একজন যদি থামলেন তো অন্যজন পে ধরলেন।
