দেখা হইল না রে, শ্যাম, আমার এই
নতুন বয়সের কালে।
লটে বাড়ির দোরে ল্যাচকি লাগাবার পূর্বেই হুস করে দরজা খুলে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে– কে আর হবে– হেরমান।
আমি মূৰ্ছাহতের ন্যায় দরজা চেপে ধরে ক্ষীণ কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করলুম, কটা পিস্তল?
.
২৭.
এই হেরমান লোকটির সঙ্গে পরিচয় না হলে আমার জীবনে একটা দুঃখ থেকে যেত। খবরের কাগজে তাই কোনও কোনও বেসাতির চতুর বেসাতি বিজ্ঞাপনে বলেন, আপনি জানেন না, আপনি কী হারাইতেছেন অর্থাৎ আপনি যে সানসা কিংবা অমূল্য রমা-দালদা ব্যবহার করছেন না– তাতে করে আপনার যে কী মারাত্মক সর্বনাশ হচ্ছে সেকথা আপনি জানেন না। উত্তরে গুণীরা বলেন, হু! যার সম্বন্ধে আমি কিছুই জানিনে, সেটা আমার আর কী ক্ষতি করতে পারে। যতক্ষণ আপনার জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হওয়ার ফলস্বরূপ আপনি জানতে পারেননি আপনার একচেটে প্রিয়া বিশ্বপ্রেমে বিশ্বাস করেন, ভূমাতে আনন্দ পান, কাউকে কোনও ব্যাপারে বঞ্চিত করে তাকে মনোবেদনা দিতে অতিশয় বিমুখ, ততক্ষণ আপনার কিসের দুঃখ, কিসের দৈন্য, কিসের লজ্জা, কিসের ভয়। কিন্তু হায়, এ তত্ত্বও সর্বাবস্থায় কার্যকরী হয় না। আপনার সেই প্রিয়াই আপনার অজানাতে খাদ্যে সেঁকো মিশিয়ে দিল। আপনি সেঁকোর উপস্থিতি সম্বন্ধে কিছুই জানতেন না বলে সেঁকো কি আপন ধর্মানুযায়ী কর্ম করে আপনাকে নিমতলায় পাঠাবে না? সেকথা থাক।
ইতোমধ্যে লটে টাট্টু ঘোড়ার মতো ছুট দিয়েছে, রান্নাঘরের দিকে।
হেরমান দেখলুম তৈরি। কোনও গুরুর কৃপায় জানতে পেরেছে যে আমি মোজেল খেতে ভালোবাসি। অত্যুকৃষ্ট মোজেল নিয়ে এল ফ্রিজ থেকে। একটা গেলাসে নিজের জন্য ঢেলে নিয়ে আমার গেলাসে ঢালল। পাঠক হয়তো আশ্চর্য হয়ে ভাবছেন, এটিকেট পর্যায়ে যেরকম প্রথম আপ্তবাক্য, লেডিজ ফাস্ট, ঠিক তেমনি মেহমানদারির মামেলায় প্রথম অনুশাসন, গেস্ট ফার্স্ট। কিন্তু লটে নির্দেশিত প্রথম আপ্তবাক্যের যে রকম ব্যত্যয় আছে, এই অনুশাসনের বেলাও হুবহু তাই। আপনি যদি মেহমান (অতিথি সঙ্কারক)* হন, তবে আপনি সরবত, হুইস্কি ইত্যাদি দেবার সময় প্রথম মেহমানের জন্য ঢালবেন। কিন্তু যদি যে বোতল থেকে ঢালছেন সেটা কর্ক দিয়ে ছিপি আঁটা থাকে তবে নিজের জন্য ঢালবেন, পয়লা। কারণ অনেক সময় কর্কের অতি ছোট ছোট টুকরো বা গুঁড়ো পানীয়ের উপরে ভাসে। হোস্ট নিজের গেলাসে প্রথম ঢালতে সে রাবিশ তিনি গ্রহণ করবেন। বিবেচনা করি বিদ্যেসাগরমশাই এই নীতিটি ঈষৎ সম্প্রসারণ করেই দুধ ঢালবার সময় আরশোলাটা আপন গেলাসে গ্রহণ করেছিলেন।**
[*মেহমান শব্দ আমরা জানি, কিন্তু মেজমান (host) শব্দটিও যদি বাঙলায় চালু হয় তবে একটা জুৎসই শব্দ পাওয়া যায়। অতিথি-সকার ইত্যাদি শব্দে আমি ঈষৎ ভীত। এক মারওয়াড়ি বিদ্যাসাগর নাকি তার বাঙালি অভ্যাগতকে সবিনয় বলেন, আপনি এই এখানে দেহরক্ষা করুন। আমি আপনার সকার (আপ্যায়ন করি।]
[**বঙ্গের রত্নমালা না কী যেন এক পুস্তকে আমি এটা পড়ি। সেখানে গেলাস শব্দই ছিল, কিন্তু আমার বিশ্বাস সে-যুগে তখনও ফিরিঙ্গির গেলাস গৌড়ীয় পরিবারে প্রবেশাধিকার পায়নি। আর পাঠান-মোগল ব্যবহার করত জাম–যার থেকে জামবাটি। ইদানীং ইন্দ্রমিত্র মহাশয় নাকি বিস্তর বিদ্যাসাগরীয় লেজেন্ড ফুটো করে দিয়েছেন (আফটার অল, ঘটির দেশ তো!), এটা করেছেন কি না জানিনে। কারণ তাঁর পুস্তকখানি প্রাপ্তির ঘণ্টাখানেকের ভিতর সেটি কর্পূর হয়ে যায়। চোর মহাশয় যদি সেটা ফেরত দেন তবে আমি রাবণের মতো দশ হাত তুলে তাঁকে আশীর্বাদ করব। হায়রে দুরাশা–]
হেরমান সিগারেট এগিয়ে দিয়ে অনুরোধ করলেন, ইচ্ছে হোক।
আমি সঙ্গে আনা কেকটা করিডরের একটি ছোট্ট টেবিলে রেখে এসেছিলুম। চিন্তা করতে লাগলুম, লটের অসাক্ষাতে কেকটি এই বেলা দরগায় ভেট দেব কি না। এমন সময় লটেই ছুটে গিয়ে কেকটা নিয়ে এসে বললে, এই নাও তোমার ঘুষ। তোমার কাছে দুটো পিস্তল আছে শুনে সেই ভয়ে এনেছে।
হেরমান বললে, তা হলে শেমপেন অনুপানরূপে ব্যবহার করতে হয়। তাবৎ ইউরোপে বিশেষ করে বিলেতে কেক অ্যান্ড শেমপেন, শেমপেন অ্যান্ড কেক। (মদ্দেশীয় মুড়ির সঙ্গে পাঁপড়ভাজা কিংবা মেঘের কোলে ইন্দ্রধনু মরণকালে হরির নাম)। তুমি একটু বসো লটে, আমি সেলার থেকে নিয়ে আসছি। কে বা শোনে কার কথা। হেরমানের অনুরোধ শেষ হওয়ার পূর্বেই সেলারের কাঠের সিঁড়িতে শোনা গেল লটের জুতোর খটখট শব্দ।
বোতল ঘিরে মাকড়ের জাল এবং দেড় পলস্তরা ধুলো। জর্মন, ডাচ, অস্ট্রিয়ান, সুইসরা ঘরদোর মাত্রাধিক ছিমছাম রাখে, কিন্তু ভূগর্ভস্থ কুঠুরির মদের বোতল কখনও ঝাড়ামোছা করা হয় না। এবং মেহমানের সামনেও সেটা পেশ করা হয় ওই অবস্থাতেই। তিনি স্বচক্ষে দেখতে পাবেন, ইটি প্রাচীন দিনের খানদানি বস্তু।* ইতোমধ্যে লটে এনেছে একটা রুপোর কিংবা ওই জাতীয় কোনও ধাতু সংমিশ্রণে তৈরি, বরফে ভর্তি একটা বালতি। হেরমান বতরিবৎ বোতলটি ন্যাপকিন দিয়ে সাফসুরো করে বালতিতে ঢুকিয়ে বললে, বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে না। আমাদের সেলারটিই আধা ফ্রিজ। এই হল বলে। ততক্ষণ মোজেল চলুক।
[*এটিকেট, যার বাড়াবাড়িকে চালিয়াতি বলা যেতে পারে, বিলেতে নগণ্য জন কাড়ি কাড়ি টাকা কামিয়ে হঠাৎ নবাব (আপস্টার্ট) বনে যাওয়ার পর সে যখন সমাজের উচ্চতম স্তরের ডিউক-আর্লদের সঙ্গে দহরম মহরম করে কঙ্কে পেতে চায় (বারি) তখন তাকে সাহায্য করার জন্য একখানি প্রামাণিক পুস্তিকা লেখেন এক ডিউক স্বয়ং– বিলেতের প্রাচীনতম ডিউকদের অন্যতম। ডিউক অব বেডফর্ড লিখিত পুস্তিকার নাম বুক অব মবস। ইনি তাঁর প্রাসাদ দর্শকের জন্য অবারিতদ্বার করে দেন দেড় শিলিঙের দক্ষিণার পরিবর্তে।]
