.
ট্রামে সামান্য আলাপ হয়।
তার পর সেটা যে দানা বাঁধল না তার একমাত্র কারণ, মেলার তিন-চারদিন পরই তো তোমার ল্যাভলেডি গোডেসবের্গের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে বন-এ ফ্ল্যাট নিল। তুমিও সুশীল ছেলের মতো তার সঙ্গে সঙ্গে বন চলে গেলে। কেন? গোডেসবের্গে কি অন্য ঘর আর ছিল না?
আমি চুপ।
বললে, আমি কেঁদেছিলুম।
আমি তো অবাক।
আমরা তখন তোমার প্ল্যাৎসে পৌঁছে গিয়েছি। লটে বললে, ওই দ্যাখো একটা ট্রাম আসছে। ওটা ধরলে পাঁচ মিনিটে বাড়ি পৌঁছে যাব।
আমি সেই প্রাচীন প্রবাদ সময় হাতে থাকলে ট্রাম, নইলে হন্টন উদ্ধৃত করলুম।
ছোঃ, এখন তো ট্রামটা একদম ফাঁকা রাস্তা দিয়ে নাক বরাবর মেলেম যাবে! একদম আমাদের বাড়ির সামনে ট্রামের টার্মিনাল।
আমি উৎসাহিত হয়ে বললুম, পায়ে চলার পথ দিয়ে কিছুটা ঝোঁপঝাড় পেরিয়ে একদম রাইনের পাড়ের উপর একটা ফুটফুটে কটেজ আছে বলে মনে পড়ছে।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। তোমার কী করে এতসব মনে আছে?
য়োহানেস সে তো যুদ্ধে রয়ে গেল, আংনেস আর আমি এখানে প্রায়ই আসতুম– রাইনে সাঁতার কাটতে। একদিন হয়েছে কী– সে ভারি মজার গল্প– আংনেস একটা ঝোঁপের আড়ালে ফ্রক-ট্রক ছেড়ে সেগুলো একটা উঁচু ঝোঁপের নিচের ডালে ঝুলিয়ে রেখে সুইমিং কসটুম পরে বেরিয়ে এল। সাঁতার কাটতে কাটতে সন্ধের অন্ধকার ঘনিয়ে এল। ফেরার মুখে আংনেস কিছুতেই সে ঝোঁপ খুঁজে পায় না। বেঝো ঠেলা। য়োহানেস, জানো তো, সবসময়ই ঠাট্টামস্করা করতে ভালোবাসত। সে বিজ্ঞভাবে বললে, নিশ্চয়ই আংনেসের কোনও এডমায়ারার চুরি করেছে। যেন চাপানের ওতর দিলুম, যেন বৃন্দাবনের বস্ত্রহরণ। য়োহানেস শুধাল, সে আবার কী? ওদিকে আংনেস কাঁদো কাঁদো। সুদুমাত্র সুইমিং কসটুম পরে এখান থেকে বাড়ি পর্যন্ত সদর রাস্তা দিয়ে সে যাবে কী করে। চোখের জলে প্রায় ভেসে গিয়ে বললে, তোমরা দু জনার কেউ কি লক্ষ করনি আমি কোন ঝোঁপটার আড়ালে কাপড় ছেড়েছিলুম?
য়োহানেস, বা রে? আমরা বুঝি আড়ি পেতে দেখব একটি তরুণী কী প্রকারে বিবস্ত্র হচ্ছে?
কোরাস :
আমি, বিলক্ষণ! বিলক্ষণ! ভদ্রতায় বাধে নইলে—
আংনেস : অশ্রুবর্ষণ তথা রোদন।
শেষটায় আমি বললুম, ওই যে রাইনের পাড়ে বাড়িটি সেখান থেকে না হয় তোমার জন্য একটা ফ্রক ধার নেওয়া যাবে। অবশ্য ও-বাড়ির বাসিন্দাদের আমরা আদৌ চিনতুম না।
লটে বললে, তখন সে বাড়িতে থাকতেন আমার শ্বশুরশাশুড়ি আর হেরমান। তাঁরা গত। হলে পর– সে অনেক দিনের কথা– হেরমান আমাকে বিয়ে করে ওই বাড়িতে তোলে। নইলে তো অন্য বাড়ি খুঁজতে হত। কিন্তু
ট্রামগাড়ি তখন প্রায় ফাঁকা। টার্মিনাসে পৌঁছেছে কি না। ঠাঠা করে অট্টহাস্যে কন্ডাক্টরকে সচকিত করে লটে শুধু হাসে আর হাসে।
আমি শুধালুম, কী হল?
হাসতে হাসতে বললে, সে বাড়িতে তখন তো আমার শাশুড়ি ভিন্ন অন্য কোনও মেয়েছেলে নেই। তার ওজন ছিল নিদেন একশো কিলো। ইয়া দশাসই গাড়ম লাশ। আংনেসের চেয়ে দেড় মাথা উঁচু। তাঁর ফ্রক পরে আংনেস রাস্তায় নামলে তোমাদের দু জনাকে মাটিতে লুটনো সেই ফ্রকের শেষপ্রান্ত তুলে ধরে চলতে হত– বিয়ের সময় গির্জেতে দুটি মেয়ে যে রকম কনের অ্যাললম্বা ফ্রকের শেষপ্রান্ত তুলে ধরে পিছন পিছন যায়। তা সে যাকগে। শেষটায় হল কী তাই কও।
পর্বতের মূষিকপ্রসব। ব্যাপারটা কী জানো, আমাকে তোমরা যতখানি ভালো ছেলে বলে মনে করতে
কে বললে?
আমি ততখানি মোটেই ছিলুম না। আড়ি পেতে বেশ কিছুটা—
চোপ!
অবশ্য আমি চালাকও বটি। যখন ঝোঁপটা খুঁজে পেলুম তখন তার থেকে বেশ খানিকটে দূরে গিয়ে য়োহানেসকে ডেকে বললুম, ওহে সোনার চাঁদ য়োহানেস, ওই হোথা ঝোঁপটায় তদন্ত কর তো? আমি এদিকটা সামলাই।
মূর্খ য়োহানেস যখন আবিষ্কারের বজ্রধ্বনি ছাড়ল তখন কোথায় লাগে প্রাচীন যুগের ইউরেকা–সে তো ঝিঁঝি পোকার মর্মরধ্বনির মৃদু গুঞ্জরণ।
আংনেস তখন যোহানেসের দিকে যেভাবে তাকাল তার তুলনা তুমি যদি আমার দিকে পিস্তল উঁচিয়ে খুনের শাসানি দিয়ে শুনতে চাও তবে বলব, য়োহানেস যদি কোনও গ্রামের দয়ানিধি নিরীহ পাদ্রিসাহেবকে সপরিবার হত্যা করে তাদের লাশ ওই গ্রামের একটিমাত্র কুয়োতে ফেলে দিয়ে তার জল বিষিয়ে দিত তবুও বোধ হয় গ্রামের কনস্টেবল তার দিকে ওভাবে তাকাত না।
মনে মনে বললুম, খেলেন দই রামকান্ত, বিকারের বেলা গোবদ্দন।
সেই ঝোঁপঝাড়ের ভিতর দিয়ে বনের পথে আঁধার-আলোর আলিম্পনের উপর দিয়ে আমি লটের কোমরে হাত রেখে আস্তে আস্তে এগিয়ে চলেছি। লটে যেন আরও ধীরে ধীরে যাচ্ছে। সে বনে যেন আবেশ লেগেছে। রাইন থেকে বয়ে আসা বাতাসের পরশে পাতায় পাতায় যেন নূপুরধ্বনির মৃদু গুঞ্জরণ। হায় যদুপতি, কোথায় গেল মথুরাপুরী–না, না, কোথায় গেল সেই কদম্ব বনঘন বৃন্দাবন। কলিযুগে দেবতাদের স্মরণ করা মাত্রই সম্বল।
–চলি পথে যমুনার কূলে
শ্রীরাধামাধব কিবা
কুঞ্জে কুঞ্জে রসকেলি করে।
বল লটে, কেবা যায় ঘরে!!
হায়, আমার কপাল যে বড়ই মন্দ।
লটে তার দীর্ঘতম উষ্ণ প্রশ্বাস ফেলে বললে, তুমি বড় দেরিতে এলে।
আমি মনে মনে বললুম, তবু তো এসেছি। কদম্ববনবিহারিণী বিরহিণীর শোক তো লটে জানে না। শ্যামসুন্দর যখন মথুরা চলে গেলেন তখন তারই স্মরণে আমারই গ্রামের কবি গেয়েছিলেন :
