কথা থামিয়ে হঠাৎ বললে, বেচারি হেরমানকে কতক্ষণ বসিয়ে রাখবে? না বাইরে খাবে।
আমি বললুম, না হয় হেরমানের হাতে গুলি খেয়েই মরব। কিন্তু হরিণের মাংসটা খেয়ে নিয়ে।
বললুম, এই আসছি, কাউন্টারে গিয়ে কিনলুম একটা ঢাউস কেক।
ফিরতেই লটে বললে, এ আবার কী আদিখেত্তা।
আমি বললুম, হেরমানের জন্য ঘুষ।
বললে, আ! ঘুষ দেবার প্রাচ্যদেশিক পদ্ধতি এদেশে আবার আমদানি করছ কেন?
.
২৬.
বন-গডেসবের্গে একদা প্রবাদ ছিল, হাতে যদি মেলা সময় থাকে তবে ট্রামে চাপো, নইলে হন্টনই প্রশস্ততর, অর্থাৎ সংকীর্ণতর অর্থাৎ কম সময় লাগবে। কারণ এসব প্রাচীন শহরে এত গলিখুঁজির শট-কাট রয়েছে যে ট্রামকে অনায়াসে ঢিড দিতে পারেন–কারণ তাকে যেতে হয় চওড়া রাস্তা দিয়ে এবং তাকে অনেকখানি ঘুরে-ফিরে কখনও-বা ট্রায়েঙ্গেলের দুই সাইড কাভার করে, কখনও-বা চতুর্ভুজের তিন ভুজ দিয়ে তিন হদ্দি (ঈশ্বর রক্ষতু। চৌহদ্দি হয়) কেটে মোকামে পৌঁছতে হয়। বস্তুত আপনি ঘলিযুঁজি দিয়ে যাবার সময় ওই ট্রামকে অন্তত বার দু তিন অনেক দূর থেকে দেখতে পাবেন আপনার অনেক পিছনে। বস্তুত সে আমলে তিন শ্রেণির লোক ট্রামে চাপত: প্রথম-বিশ্বযুদ্ধে আহত খঞ্জ, বাচ্চা-কোলে মা এবং থুতুরে বুড়ি। বস্তৃত কোনও সুস্থ-সমর্থ যুবক ট্রামে উঠলে সবাই ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকাত : ভাবত নিশ্চয়ই অগা টুরিস্ট কিংবা মুক্ত পাগল (বদ্ধ পাগল নয়): পাগল গারদকে ফাঁকি দিয়ে পালাচ্ছে।
শুনেছি, কাশীর ঠিক মধ্যিখানে ওই একই হাল। হাতে এন্তের সময় থাকলে টাঙ্গাগাড়ি নেবে, না থাকলে চরণশকট। দিল্লিতে তো রীতিমতো এর আঙ্গিনা দিয়ে, ওর রান্নাঘরের দাওয়া থেকে লক্ষ মেরে তেসরা আদমির চৌবাচ্চায় উঠে, এমনকি সুড়ুৎ করে কোনও রমণীর প্রসাধনকক্ষের এক দরজা দিয়ে ঢুকে অন্য দরজা দিয়ে বেরিয়ে মোকাম পৌঁছানই রেওয়াজ। কেউ কিছুটি বলবে না।
রাস্তায় নেমে লটে শুধাল, ট্রাম না হন্টন?
আমি গুনগুন করে গান ধরলুম,
–তোমারি অভিসারে
যাব অগম পারে—
লটে খুশি হয়ে বললে, বাহ্ তোমার তো বাস ডুঙ্কেলে (অন্ধকার) গলা।
আমি শুধালুম, ডুঙ্কেলে স্টিমে, সে আবার কী?
ও হরি, তা-ও জানো না। হেলে স্টিমে– সে হল পরিষ্কার গলা–
আমি অভিমানভরে বললুম, বদখদ গলা? সেকথা সোজা কইলেই পার, অত ধানাইপানাই কেন? আর তোমার হেরমানের গলা বুঝি কোকিলের মতো, সুজ কুকুক না (চুলোয় যাকগে)–*
[*জর্মন শিক্ষার্থীদের উপকারার্থে : কোকিলকে জৰ্মনে কুকুক বলে। তবে দু টাতে বোধহয় কিঞ্চিৎ পার্থক্য আছে– যদুর আমার জ্ঞান। সুজ কুকু নমাল, অনেকটা আমাদের কছু, ঘন্টা, হাতি-র মতো। এস্থলে কোকিলকেই কেন বেছে নেওয়া হল সে প্রশ্ন যদি আপনি শুধোন তবে উত্তর, কচু, ঘণ্টা, হাতিই বা আমরা বেছে নিলুম কেন? ছাই জানেনা কেন? আর জমনে বলা হয়, যে কোকিললোকে (কুকুকসৃল্যান্ড) বাস করেছে সে মহাশূন্যে বাসা বেঁধেছে; বাস্তবের সঙ্গে তার কোনও যোগ নেই। হিটলারের তাবৎ সৈন্যদল যখন পরাস্ত, রুশরা বার্লিন উপকণ্ঠে হানা দিয়েছে তখনও হিটলার ম্যাপের উপর লাল-নীল নানা রঙের বোম সাজিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কাল্পনিক সেনাবাহিনীর (কারণ তারা তখন হেরে গিয়ে উধাও) প্রতীক দিয়ে কোথায় তিনি পুনরায় আক্রমণ করে রুশদের মরণকামড় দেবেন, তারই স্ট্র্যাটেজি-পরিকল্পনা করছেন। যেসব জেনারেল তখনও তাঁকে ত্যাগ করেননি তারা বাস্তবের সঙ্গে সুপরিচিত ছিলেন বলে যুদ্ধশেষে লিখেছেন, হিটলার তখন কোকিললোকে বাসা বেঁধেছেন। বিশেষ করে কোকিলকেই কেন বাছা হল– সে তো খুব উর্ধ্বাকাশে যায় না তার কারণ বোধহয় সেই অবাস্তবলোকে কোকিলই তাঁকে মধুর আশার বাণী শোনায়।]
বাধা দিয়ে লটে বলে, তোর বুদ্ধি বাড়তি না কমতি? সুকুমার রায় যেরকম হযবরল নামক তুলনাহীনা পুস্তিকায় কার যেন বয়স কত জানার পর বিকুটে প্রশ্ন শুধান বাড়তি না কমতি? অর্থাৎ বয়স বাড়ছে, না কমছে?
আমি তাড়া দিয়ে বললুম, আমি ছেলেবেলাতেই ছিলুম অলৌকিক বালক। যে রকম বেটোফেন আট না দশ বছর বয়সে ওস্তাদস্য হেন্ডেল একবার এই গোডেসবের্গে এলে পর তার সামনে কী যেন এক যন্ত্র বাজান, মেন্ডেলজন ওই বয়সেই গ্যোটের সামনে পিয়ানো বাজান। তোমরা যাকে বল ভুভার কিট (ওয়ান্ডার চাইলড়) ইংরেজিতে বলে চাইলড প্রডিজি।
লটে আমাকে জড়িয়ে ধরে জায়গাটায় ঈষৎ আলোছায়ার লুকোচুরি চলছিল– বললে, হ্যাঁ আলবৎ! তুমি সেই ছাব্বিশ বছরেই ছেষট্টি বছরের বুদ্ধি ধরতে।
আমি খুশি হয়ে বললুম, হেঁ হেঁ। তখন হঠাৎ খেয়াল গেল, লটে মিন করেছে, ছাব্বিশের পর আমার বুদ্ধি বাড়েনি। বললুম, কী বললে?
লটে একটা বাড়ি দেখিয়ে বললে, এই তো তোমার আরেক প্রিয়া, লিসবেটের বাড়ি।
আমি চিন্তান্বিত হয়ে বললুম, লিসবেট? লিসবেট?– আ এলিজাবেৎ।
অবহেলার চরমে পৌঁছে লটে যা বললে সেটা আমরা বাঙলায় বলি, পাড়ার মেধো ও-পাড়ার মধুসূদন।
আমি বললুম, ওর সঙ্গে আমার আবার কবে ভাব-ভালোবাসা হল? আমাদের মেলার সময় সবাই সকলের সঙ্গে কথা কয়। সেখানে প্রথম আলাপ। তার পর তো মাত্র দু-তিন বার ট্রামে—
হ্যাঁ হ্যাঁ। তুমি আর ও তোমরাই তো ছিলে দু জন যারা এখান থেকে বন ইউনিভার্সিটিতে পড়তে যেতে।
