খানিকক্ষণ মুচকি হেসে শুধালে, আচ্ছা বল তো, আমার বয়স যখন কুড়ি আর তোমার ছত্রিশ তখন আমাদের দেখা হলে কী হত?
আমি সতর্কতার সঙ্গে শুধালুম, হেরমান তখন বাজারে ছিল কি?
বললে, জোঃ। শুধু হেরমান! আমি কি অতই ফ্যালনা! আমার রসের হাটে অন্তত হাফ ডজন নাগর ছিলেন। সপ্তাহের ছটা দিন ছটা উইক-ডে ওদের ভাগ করে দিয়েছিলুম রীতিমতো টাইম-টেবল বানিয়ে। আর রোববারটা রেখেছিলুম ফ্রি চয়েসের জন্য। সপ্তাহের ছ দিনের আটপৌরে কাপড় পরার মতো আটপৌরে লাভার নিয়ে তো রোববার বেরুনো যায় না। পরতে হয় সানডে বেসটু। কিন্তু কই আমার কথার তো উত্তর দিলে না।
কোন কথা?
ঠোঁট বেঁকিয়ে বললে, লাও! কোন কথা? হায়রে আমার লাভার! আমার বয়স যখন কুড়ি আর তোমার
অ! বুঝেছি বুঝেছি, কিন্তু জুলিয়েটের বয়স তো ছিল চোদ্দ।
সে তো ইতালির মেয়ে, প্রেমের ফুল ফুটে যায় কলিটা ভালো করে শেপ নেবার পূর্বেই। ওরা তো দক্ষিণ দেশের।
মনে মনে বললুম খাস কলকাত্তাই বজবজের লোককে বলে দোনো। ওরা নাকি বড়ই অকালপক্বতা রোগ ধরে দোহাই ধর্মের আমাকে দোষ দেবেন না– শুনেছি, কলকাতায় ফুর্তি করতে এসে চারটি পয়সা বেঁচে গেলে কাগজ কিনে খুড়োর নামে একটা ভুয়ো মোকদ্দমা লাগিয়ে গ্রামে ঢোকার সময় খুড়োকে শুধিয়ে যায় মোকদ্দমা লাগিয়ে এসেছি, খুড়ো! এইবারে শিকের ঝুলনো হাঁড়ি থেকে ধুতি শার্ট বের কর। সদরে কবার ছুটোছুটি করতে হবে রাসবিহারী ঘোষও বলতে পারবে না। আর ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরে যেও। নইলে খবরটা আমার কানে পৌঁছলে আমি তোমার ভাইপো হিসেবে বড় লজ্জা পাব যে।
ওদিকে লটে অতিষ্ঠ।
আমি গম্ভীর কণ্ঠে বললুম, ওই সময়ে দেখা হলে, হুঁ, একটা আতশবাজি, একটা বিশ্বযুদ্ধ, একটা ভূমিকম্প, একটা দাবানল, একটা প্রলয়ঙ্করী মন্বন্তর, একটা– মুখে আর কথা জোগাল না। ঈষৎ ভয় পেয়ে বললুম, কিন্তু নাৎসিরা তখন সর্বশক্তিমান। তারা কি আমাকে ছেড়ে কথা কইত! আমাকে ইহুদি ভেবে—
যাহ্। তোমাকে ইহুদি ভাবতে যাবে এমনতরো দু চোখ কানা নাৎসিদের ভিতরও হয় না। ইহুদিদের মতো শকুনিপারা বাঁকা নাক তোমার কোথায়? কোথায় মোটা মোটা ঠোঁট যার নিচেরটা ঝুলে পড়েছে বিঘৎ খানেক? কোথায় দুটো বিরাট বিরাট কান যেগুলো মাথার সঙ্গে চেপ্টে না গিয়ে পার্পেনডিকুলার হয়ে যেন আকাশের দু-প্রান্ত ছুঁয়ে উঠে আছে দুনিয়ার কে কী বলছে সেসব সাকুল্যে শোনার জন্য যেন ফাঁদ পেতেছে। আর বলতে নেই কিন্তু কোথায় তোমার সেই হাফ-মেয়েলি নাদুসনুদুস যুগ নিতম্ব ইহুদিদের পেটেন্ট করা মাল? বরঞ্চ আমাকে ইহুদিনী বলে ভাবতে পারে।
আমি ভয় পেয়ে বললুম, করেছিল নাকি?
তাচ্ছিল্লির সঙ্গে বললে, এক লক্ষ্মীছাড়া কালো কুর্তিপরা নাৎসি আমার সঙ্গে আলাপচারী করার জন্য কোনও অরিজিনাল পন্থা না পেয়ে শেষটায় ক্যাবলাকান্তের মতো বত্রিশটা পোকায় খাওয়া মুলোর মতো হলদে দাঁত বের করে শুধল, আমি ইহুদিনী কি না?
আমি বললুম, সর্বনাশ! আমসটার্ডমের আন ফ্রাঙ্কের কথা মনে পড়াতে শরীরটা শিউরে উঠল। কনসানট্রেশন ক্যাম্পে অসহ্য যন্ত্রণা ভুলে যে গেল, তার দিদি মৃত্যুশয্যায় ছটফট করতে করতে উপরের বাঙ্ক থেকে সিমেন্টের মেঝেতে পড়ে শিরদাঁড়া ভেঙে মারা গেল। তাদের বুড়ি মা গেল অন্য ক্যাম্পে অনাহারে, কিন্তু শান্তসমাহিত-চিত্তে। পরিবারের মাত্র একজন বেঁচে গেলেন অবলীলাক্রমে। হুকুম এসেছিল যে কটা ইহুদি, বেদে, বামন বাঁটকুল আছে (এই বাটকুলেরা সার্কাসের ক্লাউন প্রভৃতি সেজে নাৎসি কসাইদের মনোরঞ্জন করত বলে এদের গ্যাস-চেম্বারে পাঠানোটা ক্রমেই পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। তাদের সবাইকে খতম করে কনসানট্রেশন ক্যাম্প নিশ্চিহ্ন করা হোক। কিন্তু সে আদেশ পালন করার পূর্বেই রাশানরা ক্যাম্প জয় করে সবাইকে মুক্তি দিল। এরই মধ্যে ছিলেন আন ফ্রাঙ্কের পিতা। ইনি যখন কৃষ্ণ সমুদ্র থেকে বাড়ি আমসটার্ডম পাড়ি দিলেন তখন তারই মতো অবলীলাক্রমে নিষ্কৃতিপ্রাপ্ত ইহুদিদের কাছ থেকে শুনতে পেলেন তাঁর পরিবারের সম্পূর্ণ বিলুপ্তির কথা।*
[*হিমলার সম্প্রদায় যে কী মারাত্মক আহামুকিবশত কত লোক মেরেছে তার হিসাব নেই। একবার ধরা পড়ে কয়েকশো বা হাজার এক অজানা জাতের লোক। বিস্তর এনসাইক্লোপিডিয়া ঘেঁটেও হিমলারের জাতি নিরূপণ বিভাগের উঁইফোড় পণ্ডিতরা স্থির করতে পারলেন না, এরা আর্য না অনার্য, সাবধানের মার নেই এই তত্ত্বের স্মরণে শেষটায়– বোধহয়, একটা মুদ্রা টস করে– ওদের গ্যাস-চেম্বারেই পাঠানো হল। যুদ্ধের পর সন্দেহাতীতরূপে আন্তর্জাতিক গবেষকরা মীমাংসা করলেন এরা আর্য। এ জাতের কটা লোক এখনও বেঁচে আছে কেউ জানে না।]
লটে বললে, আমি তেড়ে বললুম, আমার চতুর্দশ পুরুষ ইহুদি। তার পর হ্যান্ডব্যাগ থেকে বের করে আমাদের ছাপানো কুলজি দিলুম বাছাধনের হাতে। ওটা ছাপা হয়েছিল কাইজারের আদেশে। তিনি অবশ্য তখন নির্বাসনে। কিন্তু কাইজার থাকাকালীন তিনি এরকম কেউ শতায়ু হলে তাকে অভিনন্দন জানাতেন, ঠাকুদ্দার বাবাকেও সেই রীতি অনুযায়ী শুভেচ্ছা। জানান এবং অনুরোধ করেন আমাদের কুলজি যেন নির্মাণ করা হয়।
আমাদের অধ্যাপক কিফেল, গেরেমভারি বিস্তর বাঘা বাঘা প্রফেসর মায় পাদ্রি সাহেবরা, যাদের গির্জেতে আমরা বাপ্তিস্ট হয়েছি এবং চার্চের কেতাবে আমাদের নাম রয়েছে– এন্তের গবেষণা করে প্রমাণ করলেন আমাদের পরিবার সাতশো বছরের পুরনো ক্যাথলিক। এর চেয়ে প্রাচীনতর কোনও পরিবার আছে বলে তারা জানেন না। এটা যখন তৈরি হয় নাৎসিরা তখনও দাবড়ে বেড়াতে আরম্ভ করেননি। কাজেই ওতে কোনও ফাঁকি-ফক্কিকারি ছিল না। আর গোটা ফতোয়াটাতে ক্যা অ্যাব্বড়াবড়া শিলমোহর– সুপ প্লেটের সাইজ।
