আমি বললুম, কী যে বল। তুমি তো রয়েছ।
লটের চোখে ফের জলের রেখা। হতাশ কণ্ঠে বললে, কদিনই-বা এদেশে থাকবে। আর কবারই তোমার দেখা পাব। কিন্তু ভেবে দেখ দিকি, এটা কি একটা আশ্চর্য ঘটনা নয়। বল। দেখি এ পৃথিবীতে কটা মেয়ে দশ বছর বয়সে যাকে ভালোবেসেছে তাকেই ফিরে পেল চল্লিশ বছর পরে। তা-ও নিতান্তই দৈবাৎ। তুমি যদি দশ মিনিট পর ট্রাম-স্ট্যান্ডে আসতে তো তোমার সঙ্গে দেখাই হত না; আমার ট্রাম এসে যেত আর আমি চলে যেতুম কোথায় কোন পোড়ারমুখো বন শহরে। তার পর ফের দেখা হত পঞ্চাশ বছর পরে।
আমি বললুম, মোটেই বিচিত্র নয়। তোমার ঠাকুদ্দার বাবা তো বেঁচেছিলেন একশো এক বছর! তুমিই-বা কী দোষ করলে।
রাগের ভান না রাগ, হতে পারে দুটো মিশিয়ে, বললে, তোমার শুধু হাসাহাসি আর ঠাট্টা মজা। কোনও জিনিস সিরিয়াসলি নিতে পার না।
আমি শঙ্কা আর দুর্ভাবনার ছল করে শুধালুম, আমাদের প্রেমটা কি বড়ই সিরিয়াস?
আকাশ পানে হানি যুগল ভুরু বললে, দারুণ ডেঞ্জারাস, কখন যে ফট করে আমার হার্টটা টুক করে ফেটে যাবে তার কোনও ঠিকঠিকানা নেই। আর শোনো, আমি একশো বছর বাঁচতে চাইনে।
কেন?
হেরমানের পরিবারের সবাই স্বল্পায়ু… বাপের দিক থেকে, মায়ের দিক থেকেও। সে আমার আগে চলে গেলে আমি সইতে পারব না। বেশিদিন বাঁচব না। আমি মনে মনে সমস্ত হৃদয় দিয়ে প্রার্থনা করলুম। তোমার সিঁথির সিঁদুর অক্ষয় থাকুক। তোমার জীবন যেন খণ্ডিত না হয়। তুমি অখণ্ড সৌভাগ্যবতী হও।
.
২৫.
আমি শুধালুম, লটে, এদেশে তো নিয়ম কাফে-রেস্তোরাঁ-পাব-এ ঢোকার সময়ে ব্যত্যয় হিসেবে লেডিজ ফার্স্ট নয়, পুরুষ আগে ঢোকে। তবে তুমি হুট করে এ-রকম পয়লা ঢুকলে কেন?
উত্তর শুনে বুঝলুম লটে রীতিমতো তালেবর মেয়ে হয়ে উঠেছে। বললে, এটিকেট যারা অন্ধভাবে মেনে চলে তারা হয় মূর্থ নয় সব। স্নব-রা সর্বক্ষণ ভয়ে মরে, ওই বুঝি এটিকেটের পান থেকে চুন খসে গেল, এবং সঙ্গে সঙ্গে সবাই বুঝে গেল যে সে আসলে নিম্ন পরিবারের লোক কিন্তু এখন দু-পয়সার রেস্ত হয়েছে বলে উঠেপড়ে লেগেছে কী করে খানদানি সমাজে প্রবেশাধিকার পাওয়া যায়। তা হলেই তো সর্বনাশ। স্নেক অ্যান্ড ল্যাডার খেলায় সাপের মুখে পড়লে যেরকম এক ধাক্কায় স–স-র করে পিছলে পড়ে ফের আপন কোটে ফিরে যেতে হয় তারও হবে সেই হাল। আবার, ফের, ফিনসে। আসলে এ এটিকেটের কারণটা কী? রেস্তোরাঁ-পাব-এতে আকছারই কোনও কোনও পেঁচি মাতাল এমনকি অতিশয় খানদানি মনিষ্যিও (শোনোনি ড্রাঙ্ক লাইক এ লর্ড) বানচাল হয়ে হইহুল্লোড় লাগায় আকছার। ওই অবস্থায় কোনও লেডি যদি হুট করে হঠাৎ ঢুকে পড়েন তবেই তো চিত্তির। তিনি হবেন বিব্রত অপ্রতিভ। তাই সঙ্গের পুরুষ তার আগে ঢুকে পাব-এর বাতাবরণটা জরিপ করে নিয়ে হয় তদণ্ডেই বেরিয়ে যায় নয় তাকে গ্রিন সিগনেল দেয়। বেরুবার সময় কিন্তু লেডিজ ফাস্ট। লেডির উপস্থিতিতে সে হয়তো বিল বাবদে স্লো সার্ভিস নিয়ে কথা কাটাকাটি করতে চায়নি। লেডি বেরিয়ে গেলে কাউন্টারে গিয়ে প্রেমসে লড়াই লাগাবে। হয়তো-বা বড় বেশি বিয়ার খাওয়ার ফলে পেট টনটন করছে– সে স্থলে স্বয়ং কাইজারও ঘোড়ায় চড়ে যেতে পারেন না– অর্থাৎ বাথরুম– সে স্থলে একটা চুঁ মেরে আসতে চায়।
এ কাফেটি আমি চিনি আমার হাতের চেটোর মতো– দশ বছর বয়স থেকে। কাফের অধিষ্ঠাত্রী মালিক আমাকে চেনেন সেই আদ্যিকাল থেকে। এখানে আমি হুট করে ঢুকলে বিব্রত হব কেন? তদুপরি সবচেয়ে মোক্ষম তত্ত্ব যেটা অবতরণিকাতেই বলা উচিত ছিল যে, এ কাফেতে মাদকদ্রব্য আদৌ বিক্রি হয় না। এখানে বানচাল হবে কী গিলে? আইসক্রিম, চা, কোকো, নেবুর রস, ইওগুর্ত (দই), কফি?–আর কালো কফি খেলে তো নেশা কেটে যায়।
আমি শুধালুম, লটে, তুমি কখনও নেশা করে বানচাল হয়েছ?
লটে বললে, বা রে। সেই যে দশ বৎসর বয়সে তোমাকে ভালোবেসেছিলুম সে নেশার খোয়াড়ি তো এখনও কাটেনি। অবশ্য একথা ঠিক, তোমার সঙ্গে যদি ফের দেখা না হত তবে সে প্রেম এরকম মাথাচাড়া দিয়ে জেগে উঠত না। শুনেছি, চীন দেশে নাকি একরকম মোক্ষম দারুণ কড়া মদ আছে। রুশদের ভোদকা, ফরাসিদের আবাৎ তার কাছে নাকি একদম নিম্বুপানি। সে-মদ রাত দশটা অবধি দু-তিন পাত্তর খেতে না যেতেই পুরো পাক্কা নেশা। তার পরও যদি খাও তবে হয় বমি করবে, নয় অঘোরে ঘুমিয়ে পড়বে। পরের দিন ঘুম ভাঙতে দেখবে নেশা বিলকুল কেটে গিয়ে মাথা একদম সাফ। তখন সামান্য একটুখানি প্রাতরাশ সেরে খাবে দু-পেয়ালা গরম জল। আর যাবে কোথা? চড়চড় করে ফের নেশা চড়বে হুবহু আগের রাত্তিরের মতো। চীনারা বলে, আগের রাত্তিরের নেশার একটা তলানি পেটে জমে থাকে আর পাঁচটা মদের মতো শরীর থেকে বেরিয়ে যায় না। সেটাতে গরম জল পড়লেই সে মাথাচাড়া দিয়ে জেগে ওঠে, আবার সেই অরিজিনেল মদের কাজ করে। পরের দিন আবার দ্বিতীয় দিনের মতো স্রেফ দু-পেয়ালা গরম জল ঢাললেই ফের উত্তম নেশা, করে করে একবার মদ খেয়ে তিন দিন ধরে তিন বার নেশা করা যায় একই খর্চায়।
আমি শুধালুম, মদ্যাদি ব্যাপারে যে তুমি এত গবেষণা করেছ সে তো আমি জানতুম না।
চোখ পাকিয়ে বললে, তুমি একটা আস্ত বুদ্ধ (জর্মনে বলে ডো তার পর সেই ডোফ শব্দের তর তম করে বললে ডোফ–ডোভার– কালো)। রূপকটা একদম ধরতে পারনি। আমার দশ বৎসর বয়সে তুমি যে প্রেমমদিরা খাইয়েছিলে, চল্লিশ বৎসর পরে এসে তার তলানিতে ঢাললে দু পেয়ালা গরম জল। সে প্রেম ফের চাড়া দিয়ে উঠল। বুঝলে? না টীকার জন্য প্রফেসর কিফেলের সন্ধানে বেরুতে হবে।*[*প্রফেসর কিফেল গডেনবের্গে বাস করতেন বলে লটে তাকে চিনত। বন বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত পড়াতেন। পুরাণ সম্বন্ধে তিনি একখানা বিরাট গ্রন্থ রচনা করেন। নাম ইন্তিশে কসমোগনি। বহু জর্মন-অজর্মনকে উত্তম সংস্কৃত শিখিয়েছিলেন আমাকে শটকে শেখাতে পারেননি। সেনসাস রিপোর্টে ধর্মস্থলে তিনি লেখেন, বৌদ্ধ।]
