এখন হয়েছে কী, সে প্রভাতে কিউয়ের পঞ্চম ব্যক্তি ছিলেন এক সাতিশয় খানদানি মনিষ্যি, ফ্রান্সধিরাজ সম্রাটের ভাগ্নে না কী যেন। তিনি বন্দি হওয়ার সময়ই জানতেন তাঁর অদৃষ্টে কী আছে। তাই তার সর্বোত্তম রাজদরবারি বেশ পরেই তিনি কারাগারে এসেছিলেন। সকালে বধ্যভূমিতে নির্গত হওয়ার পূর্বে ঘণ্টাখানেক ধরে প্রসাধন করেছেন। জুতোর খাঁটি রুপোর বগলস ঘষে ঘষে ঝা চকচকে করেছেন। পা থেকে আরম্ভ করে সর্বশেষে মাথার পরচুলার উপর সযত্নে পাউডার ছড়িয়েছেন। আহা যেন নব বর– গিলোটিন-বধূকে আলিঙ্গন করতে যাচ্ছেন।
তিনি লক্ষ করেছিলেন, কিউয়ে ঠিক তারই সামনে একটি মহিলা।
আমাদের নব বর কিউ থেকে একপাশে সরে গিয়ে ডান হাত দিয়ে মাথার হ্যাট তুলে, বা হাত বুকের উপর রেখে কোমরে দুভাজ হয়ে বাও করে মহিলাটিকে বললেন, আমাকে স্মরণাতীতকাল থেকে আমার মা-জননী আদেশ করেছেন, লেডিজ ফার্স্ট। সে আইন আমি কস্মিনকালেও অমান্য করিনি। আজ বড়ই প্রলোভন হচ্ছে মাত্র একবারের তরে সে আইন খেলাফ করি। একবারের বেশি যে করব না সে-শপথ আমি মা মেরির পা ছুঁয়ে গ্রহণ করতে প্রস্তুত। প্রমাণস্বরূপ আরও নিবেদন করতে পারি মাতৃলব্ধ সেই অনুশাসন ভঙ্গ করার পর ধন্য হে জননী মেরি, তুমি মা করুণাময়ীর অশেষ করুণায়– যার পদপ্রান্তে আমরা ত্রিসন্ধ্যা অশ্রুজলসিক্ত প্রার্থনা জানাই, দেবতাত্মা মা মেরি দেবজননী। পাপী-তাপী আমাদের ওপর এক্ষণে তোমার আশীর্বাদ বর্ষণ কর এবং যখন মরণের ছায়া আমাদের চতুর্দিকে ঘনিয়ে আসবে। আমেন– তাঁরই অশেষ করুণায় আমার মাতৃদত্ত সেই অনুশাসন ভঙ্গ করার পর আমি মাত্র মিনিট তিনেক ইহসংসারে মাতৃআজ্ঞা লঙ্ন করার বিবেকদংশনে কাতর হব, তিন মিনিট হয় কি না হয় মরণের ছায়া ঘনিয়ে আসবে, মা মেরি আশীর্বাদ করবেন, তাঁরই পদপ্রান্তে অনন্ত শান্তি অশেষ আনন্দ পাব।
আমার একান্ত অনুরোধ কিউয়ে আপনি আমার স্থানটি গ্রহণ করুন। আমি আপনার স্থানটি গ্রহণ করার ফলে গিলোটিনে যাব আপনার পূর্বে লেডিস ফার্স্ট আইন সজ্ঞানে স্বেচ্ছায় ভঙ্গ করব এ জীবনে প্রথমবার এবং এ জীবনে শেষবারের মতো। এই আমার সকরুণ ভিক্ষা আপনার কাছে।* যে বংশে জন্মেছি তার প্রসাদে এবং প্রাসাদে আমাকে কখনও ভিক্ষা করতে হয়নি। এ জীবনে এই আমার সর্বপ্রথম ভিক্ষা গ্রহণ এবং দ্বিতীয়বার এ দীনাচার করার পূর্বে সেটা চূর্ণবিচূর্ণ করে অনন্তলোকের প্রতি অভিযান। মা মেরির জয় হোক।
[*১. আত্মহত্যা করার পূর্বে হিটলার তাঁর উইলে অনুশাসন করেন এবং তাঁকে বাচনিক আদেশ দেন গোবেলস যেন তার মৃত্যুর পর প্রধানমন্ত্রী (চ্যান্সেলর) রূপে কর্মভার গ্রহণ করেন। কিন্তু গোবেলস আত্মহত্যা করেন হিটলারের মৃত্যুর ২৪ ঘণ্টা পর। তার উইলে লেখেন, আমার জীবনে এই প্রথম আমি ফুরারের আদেশ অমান্য করলুম। কিন্তু এটা লিখতে ভুলে গেলেই এবং এইটেই শেষ অবাধ্যতা। আফটার অল গোবেলস তো খানদানি ভদ্রলোক নন। ফরাসি অভিজাতদের মতো তার পেটে এত এলেম, বুকে অত দরদ হবে কোথায়?]
লটের চোখ দেখি ছলছল করছে। মেয়েটা চিরকালই স্পর্শকাতর আর অভিমানী।
কাফের রেসেপশন কমিটির মেয়েরাও তখন গুঁড়ি গুঁড়ি এসে আমার কাহিনী শুনছে।
আমি বললুম, তুমি তো সাতিশয় খানদানি–
কী যে বল!
আমি বললাম, তোমরা লিমেরা রেগরা, গ্রেটে-কেটেরা, তোমরাই তো এখানকার প্রাচীনতম বাসিন্দা। এবং আপস্টার্ট মার্কিনদের সঙ্গে দু-পয়সার মোহে ধেই ধেই নৃত্য না করে উপায়ান্তর না দেখে আপন আপন বাস্তুবাড়িতে নিজেদের জ্যান্ত গোর দিয়েছ–
থাক, থাক। আমি হলে কী করতুম? বলতুম, না, সম্মানিত মহাশয়। আমি তিন মিনিট বেশি বাঁচলুম কি না বাঁচলুম সেটা অবান্তর। কিন্তু আপনি আপনার মাতৃ আজ্ঞা– তা সে মৃত্যুর তিন মিনিট পূর্বেই হোক আর তিন বছর পূর্বেই হোক– লজ্জন করতে যাবেন কেন? ফল যাই হোক না কেন। অবশ্য আমি নিশ্চয় জানি, আপনার পুণ্যশীলা মাতা মা মেরির পদ-প্রান্ত থেকে সস্নেহ দৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকিয়ে আপনাকে আশীর্বাদ করবেন, আপনাকে গর্ভে ধরে নিজেকে ধন্য মনে করবেন।
লটে হঠাৎ বলে উঠল, এই হুঁড়িরা, তোরা ভাগ দেখি এখান থেকে। আমি হেরমানকে ফাঁকি দিয়ে ছোঁড়াটাকে (আমি মনে মনে বললুম, আমি সিটি সিস্ ইয়ার ওল্ড নই, আমি সিক্সটি সি ইয়ার ইয়ং) নির্জনে নিয়ে এলুম পীরিত করব বলে। তোরা আবার বাগড়া দিচ্ছিস কেন? যাঃ! মেয়েগুলো হুড়মুড়িয়ে একে অন্যের ঘাড়ে পড়ে সঙ্গে সঙ্গে অন্তর্ধান। শুধু একজন বললে, কোজনেফ মা! লটে মাসি যে অ্যাদ্দিন ডুবে ডুবে শ্যামপেন খাচ্ছিলেন সে তো এ মুল্লুকের কোনও চিড়িয়াও জানত না।
লটে আমার পায়ের উপর জুতো বসিয়ে সম্পূর্ণ মোলায়েমসে চাপ দিল।
আমি সোৎসাহে বললুম, গো… ল।
লটে : মানে?
তোমার পা দিয়ে কী করছ? ফুটবল খেলছ না?
বললে, ধ্যৎ। আমার পাশেই ছিল একটা হ্যাট-স্ট্যান্ড। হঠাৎ লটের নজর গেল। সেদিকে। সবচেয়ে ধূলিমাখা হ্যাটটি নামিয়ে এনে বললে, এইটেই তো তোমার? দাঁড়াও আসছি। বলে কাউন্টারে গিয়ে সেখান থেকে নিয়ে এল একটা ব্রাশ। টুপিটাকে অতি সযত্নে ব্রাশ করতে করতে বললে, তোমাকে দেখভাল করার জন্য ইহসংসারে কেউ নেই। টুপিটার গণ্ডি নিচের দিক থেকে যে ধুলো বেরুল সে-রঙের ধুলো এ দেশে নেই। আর এদেশে দেখভাল করার তরে কেউ যে নেই সেটা তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি।
