কিন্তু সুশীলা লটে-চরিত্রের কোনও কোনও অংশ বেশ টনটনে। বললে, কিন্তু ফোন থেকে যে কড়ি দুইয়ে বের করলে সেটা বুঝিয়ে বল।
আমি বললুম, সেটা পরে হবে। তুমি বরঞ্চ বল, হেরমান কী বললে?
হঠাৎ থেমে গিয়ে বললে, দেখো হের ডক্টর হের প্রফেসর, প্রাচীন দিনের কথা স্মরণে আনন। তোমার কোনও আদেশ, কোনও নির্দেশ আমি কস্মিনকালেও অমান্য করেছি? এখনও কি আমার পালা আসেনি আদেশ করার–গলায়, অল্প অত্যল্প ভেজা ভেজা অভিমানের সুর।
আমি হন্তদন্ত হয়ে বললুম, এ কী বলছ তুমি। তুমি যা বলবে, তাই হবে। সে আমলে। বললেও হত। ওই যে ফোনের বাক্স
তার বাঁ হাত দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে পাঁজরে দিলে কাতুকুতু।
আমি কোঁক বলে সামনের দিকে দু ভাঁজ হই আর কি।
লটে ভারি পরিতৃপ্ত হয়ে বললে, একদিন তোমার বাড়িতে রান্নাঘরে ঢুকে দেখি সেই গুণ্ডা অসকার তোমাকে সোফায় চিৎ করে ফেলে তার লোহার আঙুল দিয়ে তোমার পাঁজরে যেন পিয়ানো বাজাচ্ছে। আর তুমি পরিত্রাহি চিৎকার ছাড়ছ। আমারও বড় শখ হয়েছিল, আমিও মজাটা চেখে দেখি। এবারে ভাবলুম, এত দিনে বোধহয় পাঁজরে তোমার আর সে সেনসিটিভনেস নেই। আছে, আছে, আছে। তুমি এখনও আমাদের সনাতন ফুটবল টিমের ক্যাপটেন। থাক ফোনের কেচ্ছা। হেরমান বলছিল, কাফেতে যাচ্ছি, উত্তম প্রস্তাব। কিন্তু ডিনার বাইরে কেন? তার শিকারের উত্তম হরিণের মাংস যখন বাড়িতে রয়েছে।
আমি বললুম, আহ্!
মানে?
আমি জিভ চ্যাটাং চ্যাটাং করে বললুম, হরিণ আমি বড্ড ভালোবাসি। কিন্তু তার জন্যে হরিণের মতো আমিও কি তার হাতে শিকার হব?
আর বললে, সিনেমাটা বাদ দাও। ওখানে তো রসালাপ করতে পারবে না। বরঞ্চ বাড়িতে ডিনার খেয়ে পার্কে যাবে। আমি বললুম, চেষ্টা দেব বন্ধুকে নিয়ে আসতে। এখন চল কাফেতে।
আমি পুনরায় মেরির ভেড়ার মতো লটের পিছনে পিছনে কাফেতে ঢুকলুম।
.
২৪.
ভোজনান্তে দীর্ঘ জীহ্বা প্রকাশিয়া ইন্দ্রধনু বিনিন্দিত হনুদ্বয় বিস্তারিয়া
আপনি যদি উদরস্থ বায়ু পাঠান-মুল্লুকের গিরিদরি প্রকম্পিত করে সশব্দে আস্যদেশ থেকে উছুসিত না করেন, সোজা বাঙলায় একটা বিরাট রামবোম্বাই ঢেঁকুর না তোলেন (নাবালেও পাঠান বিচলিত হয়ে স্বীয় উষ্ণীষপুচ্ছ নাসিকারন্ধ্রে স্থাপন করবে না) তবে পাঠান অতিথিসেবক বড়ই মিয়মাণ হয়ে আন্দেশা করে, তার ধর্মপত্নী স্বহস্তে ১২৮ ডিগ্রির উষ্ণতম বাতাবরণে অশেষ ক্লেশ ভুঞ্জিয়া যে খাদ্যাদি প্রস্তুত করলেন সেটি আপনার রসনাপূত হয়নি। পক্ষান্তরে আপনি যদি এই ভদ্ৰস্ততা কোনও ডিউক ডিউক কেন, ডিউকেতরের– বাড়িতেও করেন তবে অনায়াসে ধরে নিতে পারেন যে ও-বাড়িতে প্রভু খ্রিস্টের ন্যায় ওইটেই আপনার লাস্ট সাপার (Suffers) এবং সেইটে অজরামর করে রাখবার জন্য লেওনার্দো দা ভিঞ্চির সন্ধান নিতে পারেন।
ইংল্যান্ডের কায়দা-কেতার সঙ্গে কন্টিনেন্টের কায়দা-কেতার বেশ খানিকটে তফাৎ আছে। ইংল্যান্ডে সবসময়ই লেডিজ ফার্স্ট। এই সুবাদে একটি অতি মনোরম সত্য ঘটনা মনে পড়ল। সেটা বলছি।
ইতোমধ্যে সদর রাস্তা থেকে গলিতে ঢুকে লটে ছোট একটা কাফেতে ঢুকল। আমি পিছন পিছন। সঙ্গে সঙ্গে অন্তত তিনটি কণ্ঠ যেন গির্জের হাল্লেলুইয়া, হে প্রভু! তোমার স্বর্গরাজ্য এই খর-তাপদগ্ধ মরুতে নেবে আসুক, ডমিনুস্ ভবিসকুম শেষ পর্যন্ত শেষ পর্যন্ত, অবশেষে অবশেষে, আখের আখের এলি। দর্শন পেলুম। দিবারাত্তির মিনষেকে জাবড়ে ধরে শুয়ে থাকিস নাকি? না–
লটে রেসেপশন কমিটির গণ্যমান্য সদস্যদের হুলুধ্বনি উপেক্ষা করল মদ্দেশীয় কংগ্রেসি মাইলৰ্ডরা যেরকম সর্বপ্রকারের প্রশস্তি নবমীনিন্দিত আবাহন তাচ্ছিল্য ভরে উপেক্ষা করেন কিন্তু শুনে যাওয়ার ভান করেন। লটে অবশ্য কোনও প্রকারের ছলাকলা কস্মিনকালেও জানত না। তাই শুধাল, হের প্রফেসর ডক্টর সৈয়দকে যে একটা মামুলি গুড মর্নিংও বললিনে! মেয়েগুলো লটের মেয়ের বয়সী; আমাকে চিনবে কী করে? একজন বললে, মাকে ডেকে আনি।
লটে : হ্যাঁ হ্যাঁ, তাই কর। ওর সঙ্গে হয়তো আমাদের কালামানিকের গোপন প্রেম ঘুপসি ভাব-ভালোবাসা ছিল। আমাদের লটবরটি তোদের মায়ের যৌবনে ছিলেন একটি আস্ত পেটিকোট-শিকারি ব্রা-বিজয়ী। আমি বললুম, ছিঃ! পফুই।
লটে বললে, মডার্ন হতে শেখো। নইলে আমার সঙ্গে নাগরালি চতুরালি করবে কী করে? নিরামিষ প্রেমে আমার অরুচি।
আমি কথাটা চাপা দেবার জন্য বললুম, তোমাকে একটা মর্মস্পর্শী সত্য ঘটনা বলছি– এটিকেটের সুবাদে এইমাত্র মনে পড়ল। তোমদের দেশে তো প্রায় কুল্লে মোকা-বেমোকাতে লেডিজ ফার্স্ট। এখন হয়েছে কী, ফরাসি বিদ্রোহের সময় উন্মত্ত জনতা কোনওপ্রকারের বাছবিচার না করে কচুকাটা করছিল ফ্রান্সের ডুক, ব্যারন জমিদার তাবৎ খানদানি অভিজাতদের। প্রথম তাদের জেলে পুরে, পরদিন ভোরবেলা একজনের পিছনে অন্যজনের দীর্ঘ লাইন করে মেয়ে-মন্দ সবাইকে মন্থর গতিতে এগিয়ে নিয়ে যেত গিলোটিনের দিকে কারাগারের বিরাট চত্বর ক্রস করে। সর্বপ্রথম জন এগিয়ে গিয়ে মুণ্ডুটা ঢুকিয়ে দিত গিলোটিনের ফ্রেমের ফুটোটাতে। হুশ করে নেবে আসত দারুণ ভারি সুতীক্ষ্ণ ট্যারচা তিনডবল খড়গের চেয়ে সাইজে বড় একটা কাটার। বিদ্যুৎবেগে মাথাটা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিটকে পড়ত মাপ-মাফিক অদূরে রক্ষিত একটা বাস্কেটের ভিতর (ফরাসি স্ল্যাঞ্জে তাই এখানে বলে বাস্কেটে থুথু ফেলা অর্থাৎ গিলোটিন প্রসাদাৎ পরলোকগমন)। জল্লাদ সেটা সরিয়ে দিয়ে সেখানে নতুন বাস্কেট রাখার পর কিউয়ের দ্বিতীয় উমেদারের দিকে তাকাবার পূর্বেই তিনি এগিয়ে আসতেন। পূর্ববৎ প্রক্রিয়া।
