লটেকে এ কৌশলটি শেখাবার মোকা পূর্ববর্তী যুগে আমি কখনও পাইনি। ইতোমধ্যে আমার মতো জউরি প্রেমিকও সে বোধহয় পায়নি। ফোন বসে ঢুকে যেই না পয়সা ঢালতে যাচ্ছে আমি অমনি লম্ফ দিয়ে তাকে ঠেকালুম কর কী? কর কী? বলে B-তে দিলেম চাপ।
ঈশ্বর পরম দয়ালু
তাহার কৃপায় দাড়ি গজায়
শীতকালে খাই শাঁকালু।
দু-কান ভরে যেন কেষ্টঠাকুরের মুরলিধ্বনি শুনতে পেলুম। যদ্যপি খটাং করে– কাসার থালার পর টাকাটি ফেললে যে রকম কর্কশ ধ্বনি বেরোয়। তিনটি গ্রশেন, আমাদের দিশি হিসাবে সাড়ে ন গণ্ডা পয়সা সুরসুর করে বেরিয়ে এল।
লটে তাজ্জব মেনে শুধাল, এ আবার কী?
ভারতের জন্য প্রথম এটম বানাতে পারলে আমার একাননে সীতালাভে দশাননে যে আত্মপ্রসাদ অহংশ্লাঘা উদ্ভাসিত হয়েছিল তারই আড়াই পেঁচ মেখে নিয়ে হিটলারি কণ্ঠে আদেশ দিলুম, এই কড়ি দিয়ে উপস্থিত সাত পাকের সোয়ামিকে ফোন তো কর; পরে সবিস্তর হবে।
লটে : হেরমান?
অন্য প্রান্ত থেকে কৃচিত জাগরিত বিহঙ্গ কাকলীর মতো শব্দ হল। হায়, কেন যে সেই ফরাসি কৌশল বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ল না– আফসোস করি প্যারিসে একদা পাবলিক কল বক্সে ফোনযন্ত্র থেকে একটি সরু রবারের নল– তার মাথায় ক্ষুদে একটি লাউডস্পিকার, এমপ্লিফায়ার– বোম লাগানো–ঝুলতে থাকে। এখানে সেটা থাকলে আমি সেই বোতামটি কানে লাগিয়ে দিব্য শুনতে পেতুম ওই প্রান্ত থেকে হেরমান কী বলছে।
লটে : আমি লটে বলছি। লিকসটে (ইংরেজিতে এস্থলে হানি = মধু!) আমার ফিরতে দেরি হবে।… আঁ না না! আমার প্রাচীন দিনের এক লাভারের সঙ্গে হঠাৎ দেখা। এখন তার সঙ্গে কফি টার্ট খাব। তার পর সিনেমা। তার পর ছ-পদী ডিনার। সর্বশেষে পার্কের বেঞ্চিতে বসে দু দণ্ড রসালাপ (মৃদু মর্মরগানের মর্মের কথার মধুময় মাখামাখি)। ওদিকে আমি প্রাণপণ হাত ছুঁড়ে ছুঁড়ে সর্বাঙ্গে মৃগী রোগীর কাঁপন তুলে তুলে ওকে বোঝাবার চেষ্টা করছি–কাট আউট, কাট আউট– মা-মেরির দিব্যি, সান্তা মাগদালেনের দিব্যি, সান্তা আনার, সান্তা তেরেসর দিব্যি…।
হেরমান বেশ একটানা কিছুক্ষণ কীসব যেন বললে। লটে বললে, দেখি চেষ্টা করে। কিন্তু তোমার সর্বনাশের জন্য প্রস্তুত থেকো।
আমার বহু বৎসরের নিপীড়িত অভিজ্ঞতা বলে মেয়েছেলে একবার ফোন ধরলে আপনি নিশ্চিন্ত মনে মর্নিং ওয়াক (রবীন্দ্রসরোবর প্রদক্ষিণ তদ অন্তর্ভুক্ত) সেরে ফোন বসে ফিরে দেখবেন তখনও তিনি বলছেন, তা হলে ছাড়ি, ভাই। বাইরে জনা তিনেক ফোন করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে। কেন বাপু, আর ফোন বক্স নেই কাছে পিঠে। এই তো মাত্র দু-মাইল দূরের গোরস্তানে (বাপস্ সেই রাতের ভুতুড়ে অন্ধকারে গোরস্তানের শর্টকাট প্রাশান আর্মি অফিসার পর্যন্ত এড়িয়ে চলে) আরেকটা কল বক্স রয়েছে। তা হলে ছাড়ি ভাই এই ছাড়ি ভাই, ভাই- তার পরও নিদেন দশটি মিনিট ধরে চলবে।
কিন্তু লটে বড় লক্ষ্মী মেয়ে। যেই না দেখেছে একটি মহিলা কিয়োস্কের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন অমনি লটে বললে, আউফ ভিডার হ্যোরেন যতক্ষণ না পুনরায় একে অন্যের কণ্ঠস্বর শুনি (ততক্ষণের জন্য বিদায়- এটা উহ্য থাকে।)*
[*১. সাক্ষাৎ দেখাদেখির পর বিদায় নেবার সময় জর্মন বলে আউফ ভিডার জেন (দেখা) হয়। ফোনে বলে আউফ ভিডার হ্যো রে (শোনা যায়)। ভিয়েনাতে বলে আ দিয়ো (ভগবানের হাতে দিলুম)। নানা দেশে নানা রকমের বিদায়বাণী বলা হয়। জানিনে, এই লক্ষ্মীছাড়া মুল্লুকে এখন পনেরো আনা লোক– এমনকি মেয়েরা পর্যন্ত ঘোর অপয়া এখন তবে যাই বলে। যেন অগস্ত্য যাত্রা করছে! এখন তবে আমি প্রায় উঠে গেছে। আমরা তখন উত্তরে বলতুম এসো। এখন কী উত্তর দেয়।
এই আধুনিক আধুনিকারা যখন কেউ বলে, এখন তবে যাই? তারা কি হ্যাঁ, যাও বলে? সর্বনাশ! এর চেয়ে মারাত্মক বর্বর অপয়া উত্তর কী হতে পারে। যাই শুধু তখনই বলা চলে যখন কেউ আসছে। ডাকলুম, রামা, রামা, এদিকে আয় তো, বাবা। সে উত্তরে বলে, যাই বাবু।]
রাস্তায় নেমে লটে বললে, ফোন বক্স থেকে যে কৌশলে পয়সা বের করলে সেটা বুঝিয়ে বল।
আমি বললুম, হেরমান কী বললে? এবং তার কটা পিস্তল?
খিল খিল করে হেসে বললে, দুটো। হেরমানের রেজিমেন্ট যখন রাশা থেকে ছত্রভঙ্গ হয়ে জর্মনি ফিরল তখন কোনও দফতর পর্যন্ত নেই যে পিস্তলটা জমা দেয়। অন্যটা তার দাদার আপন নিজস্ব ছিল। সে রয়ে গেছে। আমি অন্যদিকে ঘাড় ফেরালুম। সুশিক্ষিত জর্মন জাত পর্যন্ত পয়া-অপয়া মানে। সে রয়ে গেছে অর্থাৎ সে যুদ্ধ থেকে ফেরেনি। খুব সম্ভব মারা গেছে। হয়তো আত্মীয়স্বজন সৈন্যবিভাগ থেকে চিঠি পেয়েছে, অমুক অমুক দিন অমুক স্থলে বীরের মৃত্যু বরণ করেছে। কিন্তু তারা ভাবে, মৃত সৈন্য সনাক্ত করাটা সব সময় নির্ভুল হয় না। হয়তো-বা সে সাইবেরিয়ার কারাগারে বা লেবার ক্যাম্পে আছে। কিংবা হয়তো শেল শক খেয়ে তার স্মৃতিশক্তি সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে (এমনেসিয়া)। নিজের নামধাম পর্যন্ত স্মরণে আনতে পারছে না। হয়তো কোনও হাসপাতালে পড়ে আছে, নয় ইডিয়টের মতো রাশার গ্রামে গ্রামে ভিখারির মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। কত কী হতে পারে। হয়তো একদিন ফিরে আসবে। মারা গেছে এই অপয়া কথা বলি কী করে? সত্যি তো, আমিও তাই বলি।
