তাই তো তোমাকে পেয়ে আমার এত আনন্দ। তোমার আজকের দিনের চেহারাতে আর সেদিনকার চেহারাতে আর কতখানি মিল? বার বার মনে হয়, যেন তোমাকে ঘন কুয়াশার ভিতর দিয়ে দেখছি। কী রকম জানো? তুমি যে বাড়িতে থাকতে সেটা প্রায় তিনশো বছরের পুরনো। সে-যুগে আস্তানার ভালো ব্যবস্থা ছিল না বলে আমার বাপ-মার বেডরুম সবকটা ঘর ছিল খুদে খুদে যেন বেদেদের কারাভানের গাড়িতে ক্ষুদে ক্ষুদে বেড-রুম, ডাইনিংরুম, কিংবা হা হা, মনে পড়েছে, ওয়ালট ডিজনির ম্যাজিকল্যান্ডের রাজকন্যা বনের ভিতর কাঠুরের অতি ছোট্ট ঘরে আশ্রয় নিয়ে জানালার পাশে বসে আপন মায়ের কথা ভাবছে।
হুবহু ঠিক ওই রকম একটি ছোট্ট জানালা ছিল তোমার ঘরে। দৈর্ঘ্য-প্রস্থে একহাত হয় কি না হয়। তুমি আসবার আগে ওটাতে একটা সাদা মোটা পর্দা ঝুলত। কিন্তু তোমার এখানে আসা স্থির হয়ে যাওয়ার পরই আনার মা আপন হাতে ক্রুশের কাঁটা দিয়ে একটুকরো নেট বুনল। তার যা বাহার। আর তার মিহিন কাজ ডাচ লেসকেও টিঙ দেয়। আমি যখন মাখম কিনতে গেলুম আনাদের দোকানে তখন আনাকে শুধালুম, অতিথি আসছে নাকি? উত্তর শুনে আমি ভয়ে ভিরমি যাই আর কি! আমাকে একদিন ভয় দেখাবার জন্য বাবা বলছিল, তবে ডাকি একটা ইন্ডারকে! তার মাথায় পাগড়ি, ইয়াব্বড়া দাড়ি আর হাতে বাঁকা ছোরা। (আমি বুঝলুম শিখ আর গুখাতে লটের বাবা ককটেল বানিয়ে ফেলেছিল– লেখক) নাভিকুণ্ডলীর উপর সেঁধিয়ে দিয়ে এক হ্যাঁচকায় পাঁজর অবধি ফাঁসিয়ে দেয়। ওমা! তার পর কোথায় কী? সেই রাত্রে তোমার ছোট্ট জানালার বাহারে লেসের পর্দার ভিতর দিয়ে দেখি, ঠিক তাই, তোমাকে এইমাত্র যা বললুম, তোমাকে যেন তখন ঘন কুয়াশার ভিতর দিয়ে দেখছি, তুমি টেল ল্যাম্পের সামনে বসে কিছু একটা লিখছিলে।
আমি বললুম, কত যুগের কথা! কিন্তু জাস্ট বাই চান্স্ তোমার মনে আছে কি, সেটা কী বার ছিল?
দিব্য মনে আছে। শুক্রবার সন্ধ্যাবেলা।
অ। তাই বল। শুক্রবার রাতদুপুরে ইন্ডিয়ার জন্য লাস্ট মেল ছাড়ে। প্রতি মাসে চিঠি না। পেলে সব বড্ড চিন্তিত হয়। তোমার রাজকন্যা যেরকম বনের ভিতর কাঠুরের কুটিরে ছোট্ট জানালার পাশে বসে তার মায়ের কথা ভাবত, আমার মায়ের মনও তেমনি আমার দিকে উধাও হয়ে চলে আসে।
লটে বললে, আহা! সেই অল্প বয়সে লটে লাজুক ছিল বটে কিন্তু তার দরদি হিয়াটি সে কখনও লুকিয়ে রাখতে পারত না। বললে, একদা যেখানে কাফে স্নাইডার ছিল সেখানে পৌঁছে গিয়েছি।
আমি বললুম, না। টাকার জোরে মার্কিনরা যে প্রতিষ্ঠান আত্মসাৎ করেছে সে পাপালয় তো ব্রথেল। আমি ওখানে যাব না।
লটে যেন খুশি হল। বললে, ওই যে ব্রথেল বললে, সেটা একদম খাঁটি কথা। হয়তো না ভেবে বলেছ, কিন্তু পেরেকের ঠিক মাঝখানে মোক্ষম ঘা-টি মেরেছ। সেদিন একটা বইয়ে পড়ছিলুম, ইহুদিরা ঠিক এমনি ধারা কড়া কড়া টাকা নিয়ে প্যালেস্টাইন গিয়ে সেখানকার গরিব আরব দোকানদারদের দোকানপাট কিনে তো নিলই তার পর কিনল ওদের জমিজমা। আরবরা এখন নাকি ভিটেছাড়া হয়ে সর্বত্র ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরেকটা বইয়ে পড়ছিলুম, কোনও জায়গায় যদি একটা নতুন বন্দর তৈরি করা হয় তবে সঙ্গে সঙ্গে সেখানে এন্তের বার আর বিস্তর ব্রথেল হুশ হুশ করে ব্যাঙের ছাতার মতো গজাতে থাকে।
আমি চিরকালই অ্যাডেনাওয়ারকে ভক্তি করেছি। তারই কল্যাণে যুদ্ধে-বন্দি বিস্তর জর্মন মুক্তি পায় রুশ কারাগার থেকে, সাইবেরিয়া থেকে। ওদের মধ্যে ছিল আমার এক মাসতুতো ভাই আমার মা তাকে ভালোবাসত আপন ছেলের মতো। তা হলেই বুঝতে পারছ, আডেনাওয়ারের প্রতি আমাদের কতখানি শ্রদ্ধা। এবং সকলেই জানে এই বন্দিদের মুক্ত করার জন্য তাঁকে তাঁর মাথা অনেকখানি নিচু করতে হয় সে লোক হিটলারের সামনেও কখনও নিজেকে খাটো করেননি।
কিন্তু এই যে তিনি ফুটফুটে সুন্দর ছোট্ট শহর বন-কে জর্মনির রাজধানীরূপে মনোনীত করলেন তাতেই হল বন-এর সর্বনাশ এবং আমাদের গোডেসবের্গের সর্বস্ব নাশ। বন-এর আশপাশে ফাঁকা জায়গা নেই। বিদেশি রাজদূত বাবুরা গোডেনবের্গের চতুর্দিকে গমক্ষেত বরবাদ করে হাঁকলেন বিরাট বিরাট এমারত, তৈরি করলেন আপন আপন কলোনি। অফ কোর্স মার্কিনরাই হলেন পয়লা নম্বরি কলোনাইজারস। তারা চান ঝাঁকে ঝাঁকে বার। রাতারাতি গোডেসবের্গের চেহারা বদলে গেল। এদেশে স্লেভারি নেই। নইলে আমরা সব্বাই ওদের নিগ্রো স্লেভ বনে যেতুম।
তার পর ঝপ করে আমাকে একটা চুমো খেয়ে বললে, একটু দাঁড়াও-না, তুমিও সঙ্গে চল। হেরমানকে ফোন করব, আমার ফিরতে দেরি হবে।
.
২৩.
ভিন্ন ভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন কায়দা-কেতার পাবলিক টেলিফোন বস্, ফোন কিয়ো থাকে। তার কোনও কোনওটাতে আপনি যদি প্রার্থিত নম্বর না পান, বা এনগেজড থাকে তবে B বোতাম টিপলে আপনার প্রদত্ত কড়ি একটা ফুটো দিয়ে ফেরত পাবেন। এখন হয়েছে কী, বেশিরভাগ লোকই আপন বাড়ি থেকে ফোন করে। নম্বর না পেলে বা এনগেজড পেলে বোতাম টেপার কোনও কথাই ওঠে না। তাই পাবলিক ফোন থেকে ওই দুই অবস্থায় B বোতাম টিপতে ভুলে যান। অতএব আপনার মতো শেয়ানা লোকের কর্তব্য, পাবলিক ফোনে ঢুকেই প্রথম B বোতাম টেপা। যদি আপনার পূর্ববর্তী ভোলামন জনের কড়ি সেখানে থাকে তবে ফোকটে সেটি আপনি পেয়ে যাবেন এবং তাই দিয়ে আপনার কলটি মাছের তেলে মাছ ভাজার প্রক্রিয়া অবলম্বনে সেরে নেবেন। এমনকি আপনি কোনও ফোন করবেন না; পথে যেতে যেতে দেখলেন একটি ফোন বাসো। ঢুকে B টিপবেন। কড়ি পেয়ে গেলে ভালো। না পেলে কীই-বা ক্ষতি। কড়িটি পকেটস্থ করে শিস দিতে দিতে এগিয়ে চলবেন যতক্ষণ না আরেকটা ফোন বস্ পান। মার্কিন প্রসাদাৎ গোডেসবের্গের নানাবিধ অধঃপতন হওয়া সত্ত্বেও ঘড়ি ঘড়ি পথপ্রান্তে অর্থোপার্জনের এ ধরনের চিত্তহারিণী প্রতিষ্ঠান ফোন বস্ খুবই কম, কিন্তু হামবুর্গ, বার্লিন, কলোন– মরি! মরি! তিনশো কদম যেতে না যেতেই সেই নয়নাভিরাম প্রতিষ্ঠান। আবার ঢুকবেন আবার টিপবেন। কীই-বা সময় যায় তাতে! এতে আপনার বিবেকদংশন হওয়ার কথা নয়। কারণ কড়িটা তো সরকারের নয়। ওটা আপনার মতোই কোনও নাগরিকের। ওতে আপনার হই বেশি।
