সেকথা থাক। অন্য একটা মধুর চিন্তা আমার মাথায় হৃদয়েও বলতে পার ভিনাস্ টিলার প্রজাপতির মতো– সর্বক্ষণ ঘুর ঘুর করছে যদিও আমি কথা বলছি, তোমার কথাও শুনছি। সেটা বলি; এতদিন ধরে যে সবাই আমাকে ক্ষেপাত যে তুমি আমাকে ভালোবাসো, তার সঙ্গে সঙ্গে এটাও জানত, ছাব্বিশ বছরের ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্ট (জর্মনিতে যে যুগে স্টুডেন্টরা উচ্চ সম্মান পেত– ধরে নেওয়া হত এরা সব এরিস্টোক্রেট) দশ বছরের বাচ্চার প্রেমে পড়ে না। সে পীরিত করে মেয়ে-স্টুডেন্টদের সঙ্গে কিংবা বেকার কিন্তু ধনী ঝিয়ারীদের সঙ্গে। কিন্তু ওরা একটা কথা জানত না, আমি তোমাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসতুম যাকে জর্মন বলে লিবে ইংরেজিতে বোধহয় লাভ।
আমি তো অবাক। কিন্তু যেরকম গম্ভীর কণ্ঠে সিরিয়াসলি শব্দ কটি উচ্চারণ করল তাতে ওই নিয়ে পাগলামি করার মতো রুচি বা সাহস আমার ছিল না। সেই চল্লিশ বৎসর পূর্বে আমার বয়স ছিল লটের আড়াই গুণ। এখন তো আর আড়াই গুণ নয়– তা হলে আমার বয়স হত ১২৫ বৎসর। আমাদের বয়স এখন অনেক কাছাকাছি চলে এসেছে। ওর যদি আশি বৎসর হয় আর হবেই না কেন, ওর ঠাকুদ্দার বাপ তো একশো এক বছর অবধি বেঁচে ছিলেন তখন আমার ছিয়ানব্বই আর ওর আশিতে তো কোনও পার্থক্যই থাকবে না।
তুমি ভাবছ, দশ বছরের মেয়ে কি প্রেমে পড়তে পারে? পারে, পারে, পারে! অবশ্য সিচুয়েশনটা খুবই অসাধারণ হওয়া চাই।
আর তোমার যে পাকা একটি বান্ধবী ছিল– বন-এ তোমার সঙ্গে পড়ত, নাম আনামারি–
সর্বনাশ! নামটা পর্যন্ত জানত। এখনও স্মরণে রেখেছে।
.
২২.
গডেসবের্গের সবচেয়ে বড় রাস্তা দিয়ে চলেছি। এ রাস্তা দিয়ে যাবার সময় আগের প্রায় দোকানিকে চিনতুম বলে তারা রোদ পোওয়াবার তরে চৌকাঠে দাঁড়ালে শুট মর্গেন গুট টাখ কিংবা দিনের শেষে ক্লান্ত কণ্ঠে শুট অকেনট বলতুম। সুন্ধুমাত্র ফুলওলার দোকানটির কাছে আসামাত্র পা চালিয়ে দ্রুতবেগে ওটাকে পেরিয়ে যেতুম। কেন? শো-উইন্ডোর বিরাট কাঠের জানালা দিয়ে দেখা যেত কত না সুন্দর তাজা ফুল– এক্কেবারে সাক্ষাৎ শুলস্তান। অনেক কিশোর-কিশোরীই এই শো-উইন্ডোর সামনে ব্লদেভু করত। দ্বিতীয় পক্ষ সময়মতো না এলে প্রথম পক্ষ ফুল দেখতে দেখতে হেসে-খেলে দশ-বিশ মিনিট কাটিয়ে দিতে পারত। তবে কি আমি ফুল ভালোবাসিনে? খুবই ভালোবাসি। বিশেষ করে শীতকালে যখন সবকিছু বরফে ঢাকা পড়ে যায়, গাছের পাতাগুলো পর্যন্ত ঝরে গিয়ে উঁচু উঁচু শাখা ন্যাড়া সঙিনের মতে ভয় দেখায়। শুনেছি, তখন এ দোকানের বেবাক ফুল আসত দক্ষিণ ইতালি, মন্তে কার্লো, কোদাজুর থেকে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল চার্লস ল্যামের রুদ্র রসিকতা। এক শৌখিন ধনী ব্যক্তি তাঁকে শুধিয়েছিল, আপনার ঘরে ফুল নেই যে। আপনি কি ফুল ভালোবাসেন না? তিনি জানতেন যে ওই মব তার অর্থকতা বাবদে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল হয়েও এই বেতমিজ প্রশ্ন শুধিয়েছে। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, স্যার! আমি ছোট্ট বাচ্চাদের খুবই ভালোবাসি কিন্তু তাই বলে তাদের মুণ্ডুগুলো কেটে নিয়ে ফুলদানিতে সাজাই না। আমি দাঁড়াতুম না অন্য কারণে। সেই প্রাচীন যুগে আমি এখানে আসার দু-তিন দিন পর যখন মুগ্ধ নয়নে ফুলগুলো দেখছি, এমন সময় দরজা খুলে দোকানি একগুচ্ছ ফুল হাতে দিয়ে মৃদু হেসে আমার দিকে এগিয়ে এসে বললে, শুটন্ টাখ ঝুঙার হার (ইয়াং জেন্টলম্যান)! এই সামান্য কটি ফুল গ্রহণ করে আমাকে। আপ্যায়িত করবেন কি? আমার ভাইঝি লিসবেতের কাছে শুনলুম আপনি আমাদের এই ক্ষুদে গোডেসবের্গে ডেরা পেতেছেন। আমাদের এখানে যে কজন বিদেশি আছেন, তাঁদের সংখ্যা গোনবার জন্য হাতের একটা আঙুলই যথেষ্ট। কিন্তু জানেন, এর চেয়ে ক্ষুদ্রতর পরিবেশে–সে শতাধিক বত্সরের কথা এখানে বাস করতেন রাজদরবারের এক সম্মানিত আমির*[* অধুনা বাঙলায় একাধিক লেখক একবচনে ওমরাহ লিখে থাকেন। বস্তুত ওমরাহ শব্দটি বহুবচন। একবচন আমির শব্দের বহুবচন ওমরাহ। এবং আমির-ওমরাহ সমাস কলেক্টিভ নাউন রূপে ফারসি, উর্দু, বাঙলাতে ব্যবহার হয়।]তারাই জলসাঘরে বন শহরের বেটোফেন তখনকার দিনের গ্রামেত্র (গ্রান্ড মাস্টার) ওস্তাদস্য ওস্তাদ হ্যান্ডেলকে বাজনা বাজিয়ে শোনান–
বলা বাহুল্য আমি দাম দেবার চেষ্টা করে নাস্তানাবুদ হয়েছিলুম।
ফুস করে একটি ক্ষুদ্রতম দীর্ঘশ্বাস বেরুল কিন্তু লটের কান যেন বন্দুক। শুধাল, কী হল? এরই মধ্যে আমার সঙ্গসুখ তোমার কাছে একঘেয়ে হয়ে উঠল? আমি সজোরে মাথা নেড়ে বললুম, না, না, না। তার পর ওমর খৈয়াম থেকে আবৃত্তি করলুম–
তব সাথী হয়ে দগ্ধ মরুতে
পথ ভুলে তবু মরি,
তোমাদের ছাড়িয়া মসজিদে গিয়ে
কী হবে মন্ত্র স্মরি!
তার পর সেই ফুলওলার কাহিনী বয়ান করে বললুম, ডার্লিং লটে! আমি এসব দোকানপাট তো বিলকুল চিনতে পারছিনে। কিন্তু সেই ফুলের দোকান নিশ্চয়ই সামনে এবং নিশ্চয়ই ফের চেষ্টা দেবে আমাকে মুফতে ফুল দেবার। চল অন্য পেভমেন্টে।
লটে পুনরায় ডুকরে কেঁদে বললে, হায়, হায়, হায়! কোন ভবে আছ তুমি! সে দোকান আর নেই। তার মালিক ওটাকে বেচে দিয়ে মাইল সাতেক দূরে আলু–আলু গো, আলু ফলাচ্ছেন। প্রাচীন দিনের আর কজন দোকানি আপন আপন দোকান বাঁচাতে পেরেছে। এই ছোট্ট জায়গাটিতে যারা বংশপরম্পরায় বাস করেছে তারা হয় পালিয়েছে, নয় আপন আপন বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। রাস্তায় পর্যন্ত বেরুতে চায় না। এই তোমার লিজেল– অন্তত চার মাইল না হাঁটলে অর্থাৎ মুফেনডর্ফ-গোডেসবের্গ দুবার না চষলে যার পেটের চকলেট হজম হত না (মনে পড়ল অত্যুকৃষ্ট ব্রান্ডি ভর্তি মোটা মোটা লাল আঙুরের চকলেট খেত লিজেল) সে তো এখন আর একদম বাড়ি থেকে বেরোয় না। তোমার ল্যান্ডলেডির মেয়ে আনা বেরোয় না, আমাদের যে একটি ক্ষুদ্র বিউটি সেলুন ছিল তার মালিক কাটেরিনা সৌন্দর্য আর যৌবন বাঁচিয়ে রাখবার জন্য বিস্তর সন্ধিসুড়ক জানত বলে এবং বাঁচিয়ে রেখেছেও এখনও তাকে দেখলে মার্কিন চ্যাংড়াদের মুণ্ডগুলো বাই বাই করে ঘুরতে থাকে, সে পর্যন্ত বাড়ি থেকে বেরোয় না।
