তওবা, তওবা!
.
২১.
লটে ছেলেবেলায় কথা কইত কমই। এখন দেখি মুখে খই ফুটছে, তবে সেই বাল্য বয়সের শান্ত ভাবটি যায়নি। আমি বললুম, চল না কাফে স্নাইডারে। এক পট কফি আর আপফেল টার্ট (এপল টার্ট)- পঞ্চাশ বছরের কোনও মহিলা যদি বাসস্ট্যান্ডের পেভমেন্টে বসে হঠাৎ হাততালি দেয় তবে সবাই একটু বাঁকা নয়নে তাকায়। লটে বেপরোয়া। হাততালি দিয়ে উল্লাসভরে বললে, তুমি ডিয়ার, সেই প্রাচীন দিনের ডিয়ারই রয়ে গেছ। কাফে স্নাইডার অতি উস্কৃষ্ট আপফেল টার্ট বানাতো সে তোমার এখনও মনে আছে।
আমি বললুম, সোওয়াদটি এখনও জিতে লেগে আছে… অবশ্য তোমাকে যদি নিতান্তই ট্রাম ধরতে হয় তবে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মুফেনডর্ক
মুফ্রিকা বল। ওই অজ পাড়াগাটা এমনই প্রোহিস্টরিষ (প্রাগৈতিহাসিক) যে আমরা ওটাকে আফ্রিকার সঙ্গে এক কাতারে ফেলে মুফ্রিকা নাম দিয়েছিলুম ভুলে গেছ?
আমি তীব্র প্রতিবাদ করে বললুম, আমি এখনও লিজেন্সকে মুফ্রিকানরিন (মুফ্রিকাবাসিনী) ডাকি। সে আমায় ডাকে হালুঙ্কে (গুণ্ডা) তুমি যেরকম এইমাত্র ওই নামে তোমার বেটার-না-ওয়ার্স ৫০%-কে রেফার করলে। তুমিও আমার মতো অপরিবর্তনশীল।
লটে বিষণ্ণ কণ্ঠে বললে, উপায় কী বল। এই ধর না, কাফে স্নাইডারের আপফেল টার্ট। ওটা কেন এত মধুর হত জানো। ওটা বানানো সম্পর্কে আমার এক মাসি। আর তোমার মনে আছে কি আমার ঠাকুদ্দার বাবা যখন একশো বছর বয়সে পা দিলেন তখন মা পরবের দিন আপফেল টার্ট বানিয়েছিল, মাসির চেয়েও ভালো। কার বুদ্ধিতে জান? থাক! আমি বড় লাজুক ছিলুম; তাই তোমাকে কিছু বলিনি। তুমি তো খাও চড়ুইপাখির হাফ রেশন। তাই তুমি যখন পুরো দু পিস খেলে তখন আমার ভারি আনন্দ হয়েছিল। ওমা! তার পর সবাই চলে যাওয়ার পর বাড়ির লোক আমাকে যা খ্যাপাল। এস্তেক ঠাকুন্দার বাবা। ওঁর কথা তখন জড়িয়ে যেত। জন্মদিনের বিশেষ সিগারে দম দিয়ে তার খাস প্যারা ছেলেকে বয়স তখন তাঁর সত্তর– বললেন, আমাদের লটে বাঁচলে হয়। তবে হ্যাঁ, আমার ঠাকুমা লটের চেয়েও মর্ডান ছিলেন। ন বছর বয়সে প্রথম প্রেম করেন। সে হল গে ১৭৫০ কিংবা তারই কাছে-পিঠে। এবং জানো, সেই দজ্জাল হুঁড়ি আখেরে সেই ছোকরাকেই বিয়ে করে।
আমি বাধা দিয়ে বললুম, দ্যৎ! ন-দশ বছরে আবার প্রেম! তবে কি না, দেবতা শ্রীকৃষ্ণ নাকি ওই বয়সেই ভাব-ভালোবাসা করেছিলেন।
আখেরে ঠাকুরমার ঠাকুরমার মতো ওই মেয়েটিকে বিয়ে করেছিলেন?
আমি বললুম, না। উনি বিবাহিত ছিলেন।
তার বয়স কত ছিল?
ঠিক বলতে পারব না। তবে বেশ কিছুটা সিনিয়র ছিলেন। আমাদের কাব্যে আছে :–
নিশাকাল, এ যে ভীরু, তুমি রাধে
লয়ে যাও ঘরে
হেন নন্দাদেশ পেয়ে চলে পথে
যমুনার কূলে
শ্রীরাধামাধব কিবা কুঞ্জে কুঞ্জে
রস কেলি করে।
অপিচ শ্রীরাধার নানা বর্ণনার মধ্যে একটি বর্ণনা আমার মনের গভীরে উজ্জ্বল হীরকের মতো চতুর্দিক উদ্ভাসিত করে রেখেছে। আমাদের দেশের কাব্য নাট্যাদি আরম্ভ করার পূর্বে লেখক-নাট্যকার সরস্বতী বা ঈশ্বরের কোনও অবতারের বন্দনা তথা এবং পাঠক-দর্শক মণ্ডলীর মঙ্গল কামনা করেন। এখন হয়েছে কী, শ্রীকৃষ্ণ বাল্যে বড় দামাল ছেলে ছিলেন। প্রায়ই মায়ের তৈরি ননী–
সে আবার কী? আমার মস্তকে অনুপ্রেরণা এল। প্রিয়াকে প্রীত করার জন্য আমার মতো গণ্ডমূর্থের প্রতিও কন্দর্প সদয় হন। অবশ্য হৃদয়ে ওই অত্যাবশ্যকীয় প্রেমরসটি থাকা চাই-ই। তাই হাফিজ গেয়েছেন,
নেত্র নাই বাঞ্ছা হেরি বিধুর বদন
কর্ণ নাই চাই শুনি ভ্রমর গুঞ্জন ॥
প্রেম নাই প্রিয় লাভ আশা করি মনে।
হাফিজের মতো ভ্রান্ত কে ভব-ভবনে ॥
বললুম, এই যে তোকে কাফে মাইডারে নিয়ে যাবার জন্য এতক্ষণ ধরে ঝুলোঝুলি করছি, সেখানে আপফেল টার্টের উপর যে হুইপট ক্রিম বিছিয়ে দেয় অনেকটা সেই বস্তু।
সঙ্গে সঙ্গে লটে উঠে দাঁড়াল। চল।
আমি বললুম, তুমি না কোথায় যেন যাচ্ছিলে?
উত্তরে লটে যা বললে হিন্দিতে সেটা ভালো, মারো গোলি (গুলি)। গোল কর যাও। চুলোয় যাকগে বড্ড রূঢ়।
লটে বললে, রাধার বয়ঃসন্ধিক্ষণ না কী যেন বলছিলে?
আমার বাধো বাধো ঠেকছিল। যদিও তার বয়স এখন পঞ্চাশ তবু ক্ষণে ক্ষণে তার ঠোঁটের কোণের লাজুক হাসি, কথা বলতে বলতে হঠাৎ মাথা নিচু করে পায়ের দিকে তাকানো এসব যেন তাকে চল্লিশ বছরে উজিয়ে নিয়ে দশ বছরের ছোট্ট পরিবর্তিত মেয়েটিকে করে তুলছিল। তবু দুগগা বলে ঝুলে পড়লুম। বললুম, সেই শ্রীকৃষ্ণ পাঠক দর্শককে আশীর্বাদ করুন যিনি ছিলেন ননীচোরা। ধরা পড়ার পর নন্দপত্নী মাতা যশোদা যখন তাকে শুধালেন, তুমি কতখানি ননী চুরি করেছ? তখন তিনি শ্রীরাধার স্তনযুগল দেখিয়ে বললেন, ওই অতটুকু–সেই শ্রীকৃষ্ণ সর্বজনকে আশীর্বাদ করুন।
বলা শেষ হতে না হতেই কেমন যেন লজ্জা পেলুম। অবশ্য মোদ্দা কথাটি এই ওইটুকু আট বছরের বাচ্চা আর কতখানি ননী খেতে পারে। অর্থাৎ ব্রজসুন্দরীর তখন উঠতি বয়স মাত্র।
লটে আমার লজ্জারক্ত ভাব দেখে খিলখিল করে হেসে উঠল। বললে, হায়, হায়, হায়; হাস আমাদের হার ডক্টর। চল্লিশ বৎসর পূর্বে তুমি মেয়েছেলের মতো যেরকম লাজুক ছিলে এখনও তাই আছ। ইতোমধ্যে কত কী হয়ে গেল, মায় একটা বিশ্বযুদ্ধ। এখনও তোমার। চোখে পড়েনি, ছেলেমেয়ে পাশাপাশি ভিড়ে ভর্তি রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে একজন অন্যজনের কোমরে হাত দিয়ে মেয়েটা ছেলেটার কাঁধে হাত দিয়ে নাচের সময় আমরা যে পজিশন নিই– ঘাড় বাঁকিয়ে একে অন্যকে চুমো খেতে খেতে এগিয়ে যাচ্ছে ধীর পদে। তৎসত্ত্বেও মাঝে মাঝে হোঁচট খাচ্ছে। রাস্তার লোক নির্বিকার, পুলিশও তুরীয় ভাব অবলম্বন করেছে। আমার কুড়ি বছর বয়সে নির্জন বনের ভেতরও হেরমান যখন আমাকে আদর করত আমার আড়ষ্টতা তখনও কাটত না। রাস্তায় চলতে চলতে চুম্বন– এ টেকনিক আমি আর কখনওই রপ্ত করতে পারব না।… চল্লিশ বছর! কত পরিবর্তন হয়েছে– বাইরে ভিতরে এবং তোমার-আমার লিজেল আনার পক্ষে সে পরিবর্তন যে কী নিদারুণ ট্র্যাজেডি সেটা বুঝতে তোমার বেশ কিছুদিন কেটে যাবে। তুমি কাফে স্নাইডার স্নাইডার করছিলে। আমি তোমাকে নিরাশ করতে চাইনি, ও কাফে কতকাল উঠে গিয়েছে। ওখানে এখন পঁচিশ গজি লম্বা একটা মার্কিন বার। বারের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে হলে ট্যাক্সি ভাড়া নেয় মার্কিনরা। সেই শান্ত সুন্দর বাড়িটি; ভিতরে বসে শোনা যেত মাসি যে ঘরে টার্ট বানাত সেখান থেকে আসছে আধমুঠো পরিমাণ ক্ষুদে ক্যানারিপাখির কাঁপা কাঁপা হুইসল, আর আসছে বেকিং-এর কেকের মৃদু গন্ধ, আরও সর্বোপরি, ভেসে আসে, মাসির রুমালের ল্যাভেন্ডার গন্ধ।
