(৭) ইহুদি কিসিংগারের পক্ষে কি বাধ্যতামূলক ছিল, বাইবেল স্পর্শ করে, শপথ নেবার? কাল যদি মুসল্লি মুহম্মদ আলী (কেসিয়াস কে) আমেরিকার মন্ত্রী হন, তবে তাকেও কি বাইবেল ছুঁয়ে কসম নিতে হবে?
(৮) তবে কি ড. কিসিংগার ও সম্মানীয়া মাতা সনাতন ইহুদিধর্ম ত্যাগ করেছেন? এটা বিশ্বাস করা আমার পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব কিসিংগার চরিত্র যতখানি বুঝতে পেরেছি তার পর।…এসব বাবদে কিঞ্চিৎ এলেম হাসেল হলে উত্তম আলোচনা করা যাবে। যারা এতখানি পয়সা খর্চা করে মুফতে ফটো বিতরণ করলেন, তারা দু পয়সার কালি-কাগজ মারফত সত্যজ্ঞান বিতরণ করবেন না, এ-ও কি সম্ভব? মুফতে থোড়া বখশিশ দিয়ে বেতটার পয়সা ওনারা দেবেন না?
.
বার্লিনে
১৯২৯-এ আমি বার্লিন যাই। সে যুগে বার্লিন এবং অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা ছিল ইহুদি জগতের প্রবীণতম দুই কেন্দ্র। ইহুদি-বৈরী হিটলার এবং তাঁর গুরুমারা চেলা বৈরী-প্রধান গ্যোবেলস তখনও রাষ্ট্রশক্তি পাননি, এবং তাদের শক্তিকেন্দ্র ছিল বাভারিয়া প্রদেশের মুনিকে। তবু মাঝে মাঝে বার্লিনের রাস্তায়, পাবে, মিটিঙে, নাৎসি আর ক্যুনিস্ট পার্টিতে হাতাহাতি মারামারি হত। তাছাড়া মোকায় পেলে মশহুর কোনও নাসি-বৈরীকে পেলে তাকেও দু ঘা বসিয়ে দিত, খুনও করেছে। এ স্থলে পাঠককে স্মরণ করিয়ে দিই, ফ্রান্স-জর্মনিতে ইহুদিদের এক বৃহৎ অংশ নিজেরা প্রগতিশীল বলে, প্রগতিশীল কম্যুনিস্ট পার্টিতে যোগ দিত। কম্যুনিস্ট প্যাদাতে পারলে নাৎসিদের ছিল ডবল আনন্দ। বহুৎ ক্ষেত্রে ফালতো রিসক না নিয়ে একাধারে ক্যুনিস্ট-ইহুদি দু জনকেই ঘায়েল করা যেত। যে কারণে এ দেশের হিন্দুকে খতম করে ইয়েহিয়া পেতেন ডবল সুখ– একাধারে হিন্দু এবং বাঙালি, দুই দুশমনের জন্য লাগত মাত্র একটা বুলেটের খর্চা।
ইউনিভার্সিটি রেস্তোরাঁর টেবিলে নাৎসিদের কথা বড় একটা উঠত না। ছাত্রদের ভিতর তখন ক্যুনিস্টদের ছিল প্রাধান্য। এবং স্বভাবতই তাঁদের মধ্যে ইহুদিদের ছিল উচ্চাসন। আমি যে ওদের সঙ্গেই গোড়ার থেকে ভিড়ে গিয়েছিলুম তার কারণ ক্যুনিস্টরা আপন ধর্মে দীক্ষা দেবার জন্য নবাগতজনকে অভ্যর্থনা জানায় আর ইহুদিরা শত পরিবর্তন সত্ত্বেও প্রাচ্যদেশীয় মেহমানদারি গুণটি এখনও বাঁচিয়ে রেখেছে। পরবর্তীকালে ইজরায়েল ব্যত্যয়। কিংবা হয়তো যুগ যুগ ধরে খ্রিস্টানদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার সময় অখ্রিস্টান যাকে পেয়েছে তার সাহায্য পাবার আশায় তার সঙ্গে যেচে গিয়ে কথা বলেছে। অবশ্য এটা স্মরণে রাখতে হবে ইহুদি জাত যেখানে গিয়েছে, সেখানেই কিছু না কিছু মিশ্রণের ফলে এখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বলা প্রায় অসম্ভব খ্রিস্টান জর্মন বা কে, আর ইহুদি জর্মনই-বা কে। এবং নাম থেকেও বলা সুকঠিন কে কোন জাত বা ধর্মের।
.
বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইহুদি-শাস্ত্র চর্চা
১৯৩০-এ হিটলার হঠাৎ, কী কারণে কেউ জানে না, পার্লামেন্টে অনেকগুলি সিট পেয়ে গেলেন। ইতোমধ্যে আমি চলে এসেছি বন শহরে। ছোট শহর বন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টাল সেমিনারটি জর্মনির ভিতর-বাইরে সর্বত্র সুপরিচিত। সেখানে আরবি, সংস্কৃত ও হিব্রু চর্চা হত প্রচুর। সেই সূত্রে ডজনখানেক ইহুদি ছাত্র ও পণ্ডিতের সঙ্গে আলাপ হল তো বটেই, দু তিন জনার সঙ্গে রীতিমতো হৃদ্যতাও হয়ে গেল। এদের একজন ছিলেন সেই সুদূর রুশ দেশেরও দূর প্রান্ত জর্জিয়ার লোক। ভারি আমুদে, পরিণত বয়স্ক, ছাত্রসমাজের মুরুব্বি। ওদিকে ইহুদি ধর্মতত্ত্বের সর্বোচ্চ পরীক্ষায় ফার্স্ট হয়ে পাস করেছিলেন বলে (অর্থাৎ তিনি রাব্বি পণ্ডিত-পুরোহিতের সমন্বয়) ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রামাণিক সংস্করণের নতুন প্রকাশ নিয়ে দুনিয়ার যত প্রাচীন পাণ্ডুলিপির মধ্যে দিন-যামিনী আকণ্ঠ নিমজ্জিত থাকতেন। একদিন আরবিতে লেখা আজব উল-কবর (মৃতজনকে গোর দিয়ে চলে আসার পর ফিরিস্তা এসে তার ঈমান সম্বন্ধে যেসব প্রশ্ন করেন তার বিবরণী) পড়ে আমার মনে হল, ইহুদিদের তালমুদ গ্রন্থে এর উল্লেখ থাকাটা অসম্ভব নয়। আমার হিব্রু বিদ্যে মাইনাস ডডনং। জর্জিয়ার রাব্বির কাছে গিয়ে প্যাসেজ দেখাতেই তিনি চোখদুটো বন্ধ করে চেয়ারের হেলানটায় মাথাটা ফেলে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে বিড়বিড় করে হিব্রু শাস্ত্র আবৃত্তি করে যেতে লাগলেন। আমি দাঁড়িয়েই আছি, দাঁড়িয়েই আছি– তালমুদ তিলাওতের পালা আর সাঙ্গ হয় না। কুরান শরীফের শবীনা খত্ম-ই এক ঠায় বসে এ জিন্দেগিতে আদ্যন্ত শোনার সওয়াব হাসিল করতে পারেনি এই বদ-কিসৎ গুনাগার। আর এই তালমুদ গ্রন্থটি ইটের থান মার্কা পাক্কা চল্লিশটি ভলুমের নিরেট মাল। সওয়াব ভি নদারদ, কারণ তালমুদ কেতাব পাক তওরিতের অংশ নয়!… আখেরে জেহোভার রহমত নাজির হল। হঠাৎ থেমে গিয়ে এক লক্ষে পেড়ে আনলেন এক খণ্ড তালমুদ। পাশের চেয়ারটার দিকে ইঙ্গিত দিয়ে হিম্বৎ হা করব (আমার নাম আজ আর মনে নেই) অনুচ্ছেদটি পড়তে আরম্ভ করলেন, আমার হাতে আরবি টেকটটি তুলে দিয়ে। এবং হুবহু এক্কেবারে আমাদের মক্তবের ছাত্রদের মতো ঘন ঘন দুলে দুলে আর সুর করে করে। আর মাঝে মাঝে ঠিক মক্তবের বাচ্চাটার মতো মাথা ডাইনে-বাঁয়ে নাড়িয়ে সুর করেই বলেন হল না, মেরামত করে ফের এগোন দ্রুততর গতিতে।
