আমি তো অবাক। কবে কোন যুগে, ছেলেবেলায় আপন গাঁয়ে দেখেছি এই দৃশ্য! আর সেই দৃশ্য জর্জিয়ার তিফলিস থেকে এখানে এসে ফের হাজির! হ্যাঁ, ওখানেও একদা আরবি, তুর্কি ও ফারসিরও প্রচুর চর্চা হত। শুধু একটা অনুষ্ঠান ফারাক ছিল; রাব্বিকে বললুম, হল না’ বলার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের তালিব-ই-ইলম চট করে ঘাড় বাঁকিয়ে দেখে নেয়, চাবুক হাতে মৌলবি সাহেব শুনতে পেরে তেড়ে আসছেন কি না। সদানন্দ পণ্ডিত ঠাঠা করে হেসে উঠলেন। হাসি আর থামতেই চায় না।
.
গোপন ইহুদি রেস্তোরাঁ
এ কাহিনী এতখানি বাখানিয়া বলার উদ্দেশ্য আমার আছে। ১৯৩২-এ দেশে ফিরে ফের বন শহরে গেলুম ৩৪-এ। রাব্বির সঙ্গে দেখা হল না। ভাবলুম হয়তো-বা হবু ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েলে চলে গিয়েছেন। এ রকম সুপণ্ডিত রাব্বি পুণ্যভূমিতে যাবেন না তো যাবার হক ধরে কে? তাই ভারি খুশি হলুম, চিন্তিতও হলুম ৩৮-এ তাঁকে ফের বন শহরের স্টেশনের কাছে দেখে। হিটলার তখন এমনিই বেধড়ক দাবড়াতে আরম্ভ করেছে যে ইহুদিরা জর্মনি ছেড়ে পালাতে আরম্ভ করেছে দলে দলে একদা যে-রকম মিসর ছেড়ে তুরি সিনিনে পৌঁছেছিল। ওই সময়েই হের ডক্টর কিসিংগার যিনি তরশু দিন চোখ রাঙিয়ে আরব নেশনকে শাসিয়েছেন, এখন পাঠাচ্ছি স্রেফ অস্ত্র-শস্ত্র (জাতভাইকে), দরকার হলে পাঠাব সেপাই জাঁদরেল,–সেই, তখনকার দিনের চ্যাংড়া হাইনরিষ ডাকনাম হাইনৎস কিসিংগার পড়িমরি হয়ে জর্মনি ছেড়ে অদ্যকার মিলিটারি কণ্ঠটি খামুশ রেখে চড় চড় করে বীরগর্বে পালান মার্কিন মুল্লুকে।…রাব্বি আব্রাহাম আমাকে জাবড়ে ধরে নিয়ে উঠলেন একটা বাড়ির দোতলায়। ফ্ল্যাটে ঢুকে দেখি ইহুদি রেস্তোরাঁ। কারণ সামনেই ছোট্ট একটা টেবিলের উপর গোটা দশেক ছোট কালো কাপড়ের টুপি নিতান্ত কুণ্ডলীসুদু মাথার খাপরিটা ঢাকা যায় মাত্র। ইহুদিরা অনাবৃত মস্তকে ভোজন বা ভজনালয়ে প্রবেশ করেন না। আম্মা একটা পরে নিলুম। সুন্নৎ।
মাখনে ভাজা মাছ এল। ইহুদি শরিয়তে মাছ তেলে ভাজতে নেই। আমি বললুম, বিসমিল্লা করুন। তিনি তাই করলেন। কুশলাদি সমাপনান্তে আমি আশ-কথা পাশ-কথা দু চারটি বলে ধাম, পুণ্যভূমিতে যাবেন না।
তার মাথা আমার কানের কাছে এনে অতি চুপে চুপে বললেন, আমাকে তারা পছন্দ করবে না। কিন্তু এখানে না, রাস্তায় কথা হবে।
আহারাদি ছ বছর আগে ছিল ঢের, ঢের ভালো।
টুপি ফের টেবিলে রেখে রাস্তায়, তার পর সেমিনারে। পূর্ববৎ গুরুশিষ্যের মতো মুখোমুখি হয়ে বসার পর নিজের থেকেই বললেন, আমি রাব্বি। আমি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছি, শাস্ত্র মেনে চলি। ইজরায়েল যারা গড়ে তুলেছে তাদের সঙ্গে আমার বিশেষ কোনও মতভেদ নেই। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বব্যঞ্জক সর্বপ্রথম সমস্যাঁতেই তারা যে পথে চলেছে সেটা ভুল পথ। আমার ব্যক্তিগত মত নয়। খুলে বলছি।
প্যালেস্টাইন থেকে চিরতরে বিতাড়িত হওয়ার পূর্বে ইহুদিরা পুণ্যভূমিতে তিনবার সশস্ত্র সগ্রাম করে। প্রতিবার তারা নির্মমভাবে পরাজিত হয়। একবার ব্যাবিলনের রাজা তো আক্রোশের চোটে তাদের ছেলে-বুড়ো-কুমারী-সধবাদের বিরাট এক অংশ দাসরূপে টেনে নিয়ে গেলেন প্যালেস্টাইন থেকে সেই দূর ব্যাবিলনে–সমস্ত সিরিয়া মরুভূমির উপর দিয়ে। বার বার জেনেশুনে, কারণে-অকারণে কখনও-বা পরের উস্কানিতে তারা বিদ্রোহ করে শুধু যে নিজেদের পার্থিব সর্বনাশ ডেকে এনেছে তাই নয়, ঐতিহ্যগত ধর্মের মারফত তারা যেটুকু সভ্যতা-সংস্কৃতি গড়েছিল সেটারও পূর্ণ বিকাশ করা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রতিবার গোটা জেরুজালেম শহরটাকে পুড়ে খাক করে দিয়েছে, হাজার হাজার নারী পুত্রহীন, স্বামীহীন করেছে তারা, যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার কোনও প্রয়োজন ছিল না, করার মতো শক্তি তাদের আদৌ ছিল না।
তাই ইহুদিদের প্রফেটরা ধর্মগ্রন্থে বার বার সাবধান করে দিয়েছেন, সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হওয়া তোমাদের পক্ষে পাপ, মহাপাপ!
হোম বানাতে গিয়ে প্যালেস্টাইনে এই নয়া ইহুদিরা আবার ধরেছে অস্ত্র আরবদের বিরুদ্ধে। বার বার আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রাব্বিরা তাদের সম্মুখে শাস্ত্র খুলে তাদের মানা করেছেন। তারা শোনেনি।
এখন বেশিরভাগ আর মুখ খোলেন না।
আমি রাব্বি। আমি বিশ্বাস করি শাস্ত্রের বচন। আরবদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকা ভিন্ন। এদের অন্য কোনও পন্থা নেই। কিন্তু আমার কথা শুনবে কে?
[সমাপ্ত]
বিদেশে
০১.
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে রাতদুপুরেই হোক আর দিনদুপুরেই হোক চট করে বলতে পারবেন না, আপনি যে হোটেলে শুয়ে আছেন সেটা কোন শহরে। টোকিও, ব্যাংকক কলকাতা, কাবুল, রোম, কোপেনহাগেন যে কোনও শহর হতে পারে। আসবাবপত্র, জানালার পর্দা, টেবিলল্যাম্প যাবতীয় বস্তু এমনই এক ছাঁচে ঢালা যে স্বয়ং শার্লক হোমসকে পর্যন্ত তাঁর সব-কটা পুরু পুরু অতসি কাঁচ মায় তার জোরদার মাইক্রোস্কোপটি বের করে, ওয়াটসনকে কার্পেটের উপর ঘোড়া বানিয়ে, নিজে তার পিঠে দাঁড়িয়ে, ছাতের উপর তার স্বহস্তে নির্মিত আ লা হোমস স্প্রে ছড়িয়ে বাকিটা থাক, ব্যোমকেশ ফেলুদার কল্যাণে আজ স্কুলবয়ও সেগুলো জানে– তবে বলবেন, হয় মন্তে কার্লোর রেজিনা হোটেল নয় য়োহানেসবের্গের অল হোয়াইট হোটেল। দূরপাল্লার অ্যারোপ্লেনের বেলাও আজকের দিনে তাই। একবার তার গর্ভে ঢুকলে ঠাহর করতে পারবেন না, এটা সুইস অ্যার, লুফট হানজা, অ্যার ইন্ডিয়া না কে এল এম। তিমির পেটে ঢুকে নোয়া কি আর আমেজ-আন্দেশা করতে পেরেছিলেন এটা কোন জাতের কোন মুল্লুকের তিমি?
