আরব জাত গরিব। তাদের রেস্তোরাঁও গরিব। আমিও গরিব।
ঢুকলুম একটা শামিয়ানা-ঢাকা রেস্তোরাঁতে। সেটা ছিল রোজার মাস। ইফতার আসন্ন। সে যুগে বেতারের খুব একটা প্রচলন হয়নি। তাই রেস্তোরাঁর লাউড স্পিকারে কুরান-পাঠ আসছে,
কাইরো বেতার থেকে, মশহুত্র কারী রেফাতের কণ্ঠে। আমরা আপন দেশে আসর-মগরীবের দরমিয়ান ওয়াক্তে সচরাচর কুরান পড়ি না। এরা দেখলুম, চুপ করে বসে আজান না হওয়া পর্যন্ত তিলাওয়াত শোনাটাই পছন্দ করে। দু চার জন ছোকরা গোছের খদ্দের ফিসফিস করে কথা বলছে। একজন দেখলুম উত্তেজিত মুখে দ্রুতবেগে কী যেন বলে যাচ্ছে আর বার বার খবরের কাগজের উপর আঙ্গুল ঠুকে, খুব সম্ভব তারই বরাত দিচ্ছে। অন্যজনের দৃষ্টি উদাস।
ছেঁড়া, তালি-মারা, জোব্বা পরা গোটা চারেক বয় টেবিলে ইফতার সাজাচ্ছে। একজন এসে ফিসফিস করে শুধাল, খাবে কী? ইতোমধ্যে লক্ষ করেছি, কাইরোর মধ্যবিত্ত শ্রেণির হোটেলে যা-খাওয়া হয়, এখানেও টেবিলে টেবিলে সাজানো হচ্ছে তাই। আমি বললুম, যা ভালো বোঝো তাই।
ইতোমধ্যে একজন জোয়ান গোছের লোক আমার সামনের চেয়ারে খপ করে বসে বয়কে দিল ইশারা। বয় আসতেই দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বললে, সব জিনিসের রেট বাড়িয়েছ তো ফের? বয় ধবধবে সাদা দাঁত দেখিয়ে মুচকি হেসে বলে, না, এফেদ্দম। লোকটা তেড়ে শুধোল, কেন বাড়ালে না? ঠেকাচ্ছে কে? তাই সই। যাব নাকি ইহুদি রেস্তোরাঁয়? আমার গলা থেকে বোধহয় অজানতে অস্ফুট শব্দ বেরিয়েছিল। বোঁ করে চক্কর খেয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললে, বাড়বে না দাম নিত্যি নিত্যি! ওই ইহুদি ব্যাটারা মুফতের সোনাদানা ওড়াচ্ছে দু হাতে। ওরা পারে আমাদের সর্বনাশ করতে। আমি ক্ষীণ কণ্ঠে বললুম, ওরা সস্তায় দেয় কী করে?
কী করে? অবাক করলেন এফেদম, ওদের লাভই-বা কী, লোকসানই-বা কী? দোকানি ইহুদি, খদ্দেরও ইহুদি! তার পর যা বললেন সেটা বাংলায় হলে প্রকাশ করতেন একটি প্রবাদ-মারফত : কাকে কাকের মাংস খায় না।
.
ইহুদির দাপট
একাধিকবার পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি ডক্টর হেনরি কিসিংগারের প্রতি। ইনি তখনও যুক্তরাষ্ট্রের ফরেন মিনিস্টারের পদ লাভ করেননি, কিন্তু তৎসত্ত্বেও অভাগা বাংলাদেশের লোক তাকে চট করে চিনে যায়। ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহেই যখন বিশ্বের সর্ব মিলিটারি ওয়াকিফহাল নিঃসন্দেহে বলতে থাকেন, কয়েকদিনের ভিতরেই নিয়াজি পরাজয় স্বীকার করে ফরমানকে ফরমান লেখবার হুকুম দেবেন, তার পূর্বে এবং পরেও ইসলামাবাদের সর্ব প্রভাবশালী বিদেশি ইলচিরা একবাক্যে বিশ্বজন তথা জুন্তাকে জানান যে, শেখ মুজিব সাহেবকে মুক্তি না দিলে কোনও প্রকারের স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা নেই, তখনও এই মহাপ্রভু কিসিংগার গোপন বৈঠকে একাধিকবার বিরক্তির সঙ্গে বলেছেন, না, না, না। শেখকে মুক্তি দাও, ইয়েহিয়াকে এ ধরনের কোনও সুস্পষ্ট স্পেসিফিক নির্দেশ আমরা দিতে পারব না।
কোনও সুচতুর পদ্ধতিতে এই ইহুদিনন্দন শেষটায় শূন্য-মস্তিষ্ক বুদ্বুরাজ মার্কিনের মাথায় সওয়ার হলেন সে-ইতিহাস দীর্ঘ। উপস্থিত সেটা থাক। কিন্তু একটি কথা এখানে বলে রাখা ভালো। ইহুদিরা টাকা ও বিশ্বের ইতিহাসে অদ্বিতীয় ঐক্য-শক্তি দ্বারা মার্কিনের মাথায় কভু যে ডাণ্ডা বুলোয়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আড়াল থেকে অদৃশ্য সুতো টেনে পুতুল-নাচ নাচায়, সে-তত্ত্বটা দুনিয়ার লোক জানেন না; নিরীহ মার্কিন পদচারীরও কূজনে গুঞ্জনে গন্ধে সন্দেহ। হয় মনে, বিশেষ করে বোটকা গন্ধ থেকে ওটা যেন বড় অক্ষত ইহুদি ইহুদি বদবো-র মতো ঠেকছে। কারণ একটি প্রবাদ অনুযায়ী এ সত্য নির্ধারিত হয়েছে, ফরাসি ও ইহুদিরা নৌকাডুবি ভিন্ন জীবনে কখনও গোসল করে না। সুয়েজ কানালের পাড়েও ইহুদিরা বড়ই অস্বস্তি অনুভব করত– পালাতে পেরে বেঁচেছে।
তা সে যাই হোক, মার্কিন ইহুদিদের তাগত কতখানি প্রচণ্ড সেটা উত্তমরূপে অবগত আছেন মার্কিন রাজনীতিকরা। এডওয়ার্ড কেনেডির প্রতি বাংলা-ভারতের অনেকেই শ্রদ্ধা পোষণ করেন, কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি অকুণ্ঠ ভাষায় এ দেশের স্বাধীনতা স্পৃহার সমর্থন জানিয়ে নিক্সনের বিরুদ্ধে মন্তব্য করেছিলেন। পাঠক শুনে বিস্ময় ও বেদনা বোধ করবেন বর্তমান যুদ্ধ আরম্ভ হওয়ার তিন দিন যেতে না যেতেই সেই কেনেডি, আমার জানা মতে, গয়-দের মধ্যে সর্বপ্রথম মার্কিন সরকারকে অনুরোধ জানান, তাঁরা যেন ইজরায়েলকে যুদ্ধের অ্যারোপ্লেন দিয়ে সাহায্য করেন। তার প্রথম কারণ, তিনিই ইজরায়েলের প্লেন নাশের অবস্থাটা তড়িঘড়ি বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় কারণই আসল এবং মোক্ষম। ১৯৭৬-এ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি উমেদার, এবং আমার জানামতে, অন্তত এ শতাব্দীতে, ইহুদি-বৈরী কোনও ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি। কেনেডি বেলাবেলিই ইহুদিদের সন্তুষ্ট করে রাখতে চান।
.
ইজরায়েল! হিসাব দাও!
পাঠক কিন্তু তাই বলে এক লক্ষে হিটলারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে যাবেন না, তামাম মার্কিন মুল্লুক চালাবার কুল্লে কলকাঠি ইহুদিদের হাতে। মোটেই না। ইহুদিকুল শক্তি-উপাসক নয়। তারা করে লক্ষ্মীর উপাসনা। মার্কিন পলিটিকসে তারা শক্তিধর হতে চায় না। যদি কখনও তাদের প্রত্যয় হয়, যে অমুক প্রেসিডেন্ট হলে তাদের টাকা কামাবার পথে কাঁটা হবেন, তবেই তারা কুল্লে ধন-দৌলত দিয়ে সাহায্য করে তার দুশমনকে কিন্তু গোপনে। মাত্র একবার তারা ভুল করে শক্তির পথে নেমেছিল। জাত-ভাইদের জন্য ফলস্তিনে সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র গড়ার কুবুদ্ধি তাদের মাথায় ঢোকে, এবং গত পঞ্চাশটি বছর ধরে তারা যে কী পরিমাণ মাল দরিয়ায় ঢেলেছে সেটা জানে একমাত্র তারা আর জানেন জেহোভা। এইবারে তার হিসাব নেবার পালা এসেছে! ম্যাডাম গোল্ড মেইর, মশে দায়ান, আবা এবানের টুটি চেপে ধরে মার্কিন ইহুদিরা শুধোবে, হিসাব দেখাও, টাকাটা গেল কোথায়! কে মেরেছে কত? এখন কুল্লে ইহুদি রাষ্ট্রটা যে ডকে উঠতে চলল তার জন্য দায়ী কে?
